রিয়ালের হারে দোষটা এবার আসলেই জিদানের

জিদান কাল কৌশলে মার খেয়েছেন।ছবি: রয়টার্স

জিনেদিন জিদান সব সময় হারের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে নেন। খেলোয়াড়দের আগলে রাখেন। রিয়াল মাদ্রিদ কোচের অভ্যাস এটা। কিন্তু কাল চেলসির মাঠে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে হারের বিশ্লেষণ যখন করতে বসবেন রিয়াল কোচ, এ বেলায় হয়তো তাঁর মনে হবে, দায়টা আসলেই তাঁর!

চেলসির মাঠে কাল ২-০ গোলে হেরেছে রিয়াল। গত সপ্তাহে সেমিফাইনালের প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে ১-১ গোলে ড্র করেছিল, এরপর গতকালের হারে দুই লেগ মিলিয়ে ৩-১ গোলে হেরে গেল জিদানের রিয়াল। দুই লেগেই চেলসি দাপট দেখিয়েছে রিয়ালের ওপর, জিদান সেটা কাল ম্যাচ শেষে মেনেও নিয়েছেন। বলেছেন, চেলসিরই ফাইনালে যাওয়া প্রাপ্য ছিল।

কিন্তু সেসব একপাশে রেখে যখন পেছন ফিরে তাকাবেন, হয়তো নিজের দোষগুলোই বারবার বিঁধবে জিদানকে। চোট থেকে ফিরে আসা অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার সের্হিও রামোসকে খেলানোর ক্ষেত্রে ৩-৫-২ ছক কতটা কার্যকর, তিন ডিফেন্ডার খেলাতে গিয়ে লেফট উইঙ্গার ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে মূলত রাইটব্যাক হিসেবে খেলানো, দল চেলসির কৌশলের কাছে মার খাচ্ছে দেখেও ছকে-কৌশলে-খেলোয়াড়ে বদল না আনা...জিদানকে ব্যাপারগুলো ভাবাবেই।

ফুটবলে কোচরা অবশ্য এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত। বাইরে থেকে সব সমালোচনা তো ম্যাচের পর, আর তাঁকে কৌশল সাজাতে হয় ম্যাচের আগে অনেক কিছু হবে ধরে নিয়ে। ঝুঁকি নিতে হয় তাঁকে, কখনো সেগুলো কাজে লাগে, কখনো লাগে না। যাঁর ঝুঁকি যত বেশি কাজে লাগে, তিনি তত ভালো কোচ। রিয়ালকে টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানোর সময়ে জিদানের ঝুঁকি কাজে লেগেছে, এখন সেভাবে লাগছে না। না লাগার পেছনে হাতে খেলোয়াড় থাকা, নির্দিষ্ট দিনে তাঁদের ফর্ম...এসব দিকও তো দেখতে হয়।

কিন্তু মোটাদাগের বিশ্লেষণ বলছে, কাল দোষটা জিদানেরই। টমাস টুখেলের অধীনে চেলসি ৩-১-৪-২ ছকে খেলে, তাদের টেক্কা দিতেই কিনা জিদান কাল দল সাজালেন ৩-৫-২ ছকে। কাগজে-কলমে ম্যাচের আগে সেটিকে ৪-৩-৩ ছক দেখালেও ম্যাচে আসলে মিলিতাও-রামোস-নাচোকে তিন সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলিয়েছেন জিদান, দুই উইংব্যাকের মধ্যে বাঁ পাশে ছিলেন মেন্দি। ডান পাশের উইংব্যাক নিয়েই যত ঝামেলা।

ফুটবলবিষয়ক ওয়েবসাইট হুস্কোরডের বিশ্লেষণে দুই দলের ছক ও খেলোয়াড়েরা কে কেমন খেলেছেন, সেটির রেটিং (১০-এর মধ্যে)।
ছবি: সংগৃহীত

জিদানের দলের প্রথম পছন্দের রাইটব্যাক দানি কারভাহাল চোটে। আরেক রাইটব্যাক আলভারো অদ্রিওসোলা সুস্থ আছেন বটে, কিন্তু তাঁর ওপরে জিদান অতটা ভরসা করেন না। যে কারণে মৌসুমজুড়ে কারভাহালের চোটের সময়ে রাইট উইঙ্গার লুকাস ভাসকেজকেই রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে দেখা গেছে। কিন্তু এই ম্যাচে ভাসকেজও চোটে। জিদান তাই করলেন কি, অদ্রিওসোলাকে তবু না খেলিয়ে লেফট উইঙ্গার ভিনিসিয়ুসকে টেনে নিয়ে এলেন রাইট উইংব্যাক পজিশনে!

ভিনিসিয়ুস এমনিতেই লেফট উইংয়ে খেলার সময়ে বল পায়ে দারুণ হলেও গোল করায় তেমন দক্ষ নন বলে তাঁকে নিয়ে কিছুটা হতাশা আছে রিয়াল মাদ্রিদ–সমর্থকদের, কিন্তু বয়স ২০ বছর বলে, আর বল পায়ে গতিতে-চাতুর্যে দারুণ বলে ব্রাজিলিয়ান সেনসেশনকে আপাতত ছাড় দেন রিয়াল–সমর্থকেরা। কিন্তু তাই বলে আক্রমণাত্মক মানসিকতার ভিনিসিয়ুসকে রাইট উইংব্যাক হিসেবে খেলানোর ব্যাখ্যা কী!

রিয়ালের দুই উইংব্যাক ভিনিসিয়ুস ও মেন্দি ম্যাচে মূলত কোন জায়গায় বেশি ছিলেন, সেটি দেখানো হিটম্যাপ। বাঁয়ে মেন্দি ঠিকঠাকই ছিলেন, ডানে ভিনিসিয়ুসের অবস্থান নিয়ে ছিল ঝামেলা।
ছবি: সংগৃহীত।

ম্যাচজুড়ে যাঁর সঙ্গে ভিনিসিয়ুসকে লড়তে হয়েছে, সেই চেলসি লেফট উইংব্যাক বেন চিলওয়েলকে ভিনিসিয়ুস যতবার ফাউল করেছেন, চিলওয়েল ভিনিসিয়ুসকে ততবার ফাউল করেননি—করার দরকার পড়েনি। চিলওয়েল মূলত একজন লেফটব্যাক, ভিনিসিয়ুস মূলত উইঙ্গার...কে কাকে ফাউল বেশি করছেন—সেই চিত্রটা উল্টো হলেই বরং তা হতো স্বাভাবিক। সংখ্যাটা তখন বোঝাত, মাঠে নিজেদের ডান দিকের সেই লড়াইয়ে রিয়ালই এগিয়ে ছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে লিভারপুলকে নাচিয়ে ছাড়া ভিনিসিয়ুসকে খুঁজে ফিরেছে রিয়াল।

তারওপর তিনজনের রক্ষণে সের্হিও রামোসের খেলা নিয়েও উঠতে পারে প্রশ্ন। সাদা চোখে ব্যাপারটা অনেক সময় চোখে না পড়লেও ডিফেন্ডারদের মধ্যে অনেকে দুই ডিফেন্ডার (দুই সেন্টারব্যাক) কৌশলে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কেউবা তিন সেন্টারব্যাক কৌশলে। রামোস প্রথম ভাগেই পড়েন। আবার এখন আর্সেনালে খেলা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দাভিদ লুইজের মতো অনেকে যেমন তিন সেন্টারব্যাক কৌশলে খেলতে স্বচ্ছন্দ্য। সে জায়গায় কাল জিদান রামোসকে খেলালেন তিন সেন্টারব্যাকের মাঝে, যেখানে রামোস কিনা মাত্রই চোট কাটিয়ে ফিরেছেন। ৩৫ বছর বয়সী রিয়াল অধিনায়ক কাল প্রথম মাঠে নেমেছেন ৯ জানুয়ারির পর।

রামোস ভালো করতে পারেননি।
ছবি: রয়টার্স

একদিক থেকে জিদানের হাত বাঁধাও ছিল। এত দিন রামোস চোটে থাকার সময়ে তিন ডিফেন্ডারের কৌশল খুব কাজে দিয়েছে, কিন্তু সেখানে মিলিতাও আর নাচোর সঙ্গে জুটি বাঁধা রাফায়েল ভারান আবার পড়েছেন চোটে! সে কারণেই তড়িঘড়ি করে রামোসকে নামিয়ে দেওয়া, কিন্তু মিলিতাও আর নাচোর সঙ্গে সমন্বয়টা জমেনি রিয়াল অধিনায়কের।

তিন ডিফেন্ডারের ছকে স্বাভাবিক খেলার বাইরে গিয়ে মিলিতাও আর নাচো একটু বেশি ডান ও বাঁ দিকে ঘেঁষেছেন। হয়তো সেটি করা হয়েছে ভিনিসিয়ুস ও মেন্দিকে আরও ওপরে ওঠার সুযোগ দেওয়ার জন্য, তাতে তাঁরা দুজন ওপরে উঠলে চেলসির দুই উইংব্যাক অত স্বাধীনতা নিয়ে ওপরে উঠতে পারতেন না, চেলসির আক্রমণ জমত না...এ-ই হয়তো ছিল জিদানের পরিকল্পনা। কিন্তু ফাটকাটা কাজে লাগেনি।

তিন ডিফেন্ডারের ছকে মিলিতাও ও নাচোর অবস্থান। দুজন যথাক্রমে ডানে ও বাঁয়ে চেপে খেলেছেন, তাতে রামোস হয়ে পড়েছেন একা।
ছবি: সংগৃহীত

মিলিতাও আর নাচো দুদিকে ঘেঁষে যাওয়ায় রক্ষণের মাঝে রামোস একা হয়ে গেছেন বারবার। কাসেমিরো বা লুকা মদরিচের কেউ নিচে নামলেই শুধু রামোস পাশে সঙ্গী পাচ্ছিলেন। কিন্তু কাসেমিরো কাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে ভরসা জোগাতে পারেননি। রামোসের পাশে নেমে রক্ষণ জমাট রাখতে পারেননি। ফলে চেলসির ভের্নার-মাউন্ট-হাভার্টজরা বারবার রামোসের দুই পাশে মিলিতাও-নাচোর ফেলে যাওয়া জায়গা দিয়ে ঢুকেছেন।

চেলসির প্রথম গোলে রামোসের একা হয়ে পড়ারই দায়, টিমো ভের্নারকে সামলাতে পারেননি রামোস। কাই হাভার্টজের শট বারে লেগে ফিরে এলে পোস্টের সামনে থেকে সেটি জালে জড়াতে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি ভের্নারকে। এর কিছুক্ষণ আগেও আগেও ভের্নার একবার বল জালে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু সেটি তখন বাতিল হয়েছিল অফসাইডে।

কাসেমিরোর হিটম্যাপ। তিনি ভরসা হতে পারেননি কাল।
ছবি: সংগৃহীত।

জিদানের ফাটকা কাজে লাগেনি পুরোনো ক্লাব চেলসির স্টেডিয়ামে ফেরার ম্যাচে হ্যাজার্ড অদৃশ্য হয়ে থাকায়ও। আক্রমণে করিম বেনজেমা যে দু-একবার পরীক্ষা নিয়েছেন চেলসি গোলকিপার এদুয়ার্দ মেন্দির, এর বাইরে রিয়াল তেমন সুযোগ তৈরি করতে পারল কই!

চেলসির দ্বিতীয় গোলের মুহূর্ত।
ছবি: রয়টার্স

জিদানের ভুল হয়ে চোখে বিঁধছে কৌশলে বদল না আনাও। রিয়ালকে এত এত শিরোপা জেতানোর পেছনে জিদানের যে ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি এত দিন চোখে পড়েছে, সেই খেলার ছকে পাল্টে দেওয়া বা গেম ম্যানেজমেন্ট কাল যেন চোখেই পড়ল না! ভের্নারের গোলের পর যখন রিয়াল ১-০ গোলে পিছিয়ে, তখনো তো রিয়ালের সুযোগ ছিল ম্যাচে ফেরার। এক গোল করলেই হিসাব পাল্টে যেত। কিন্তু জিদান ছকে তেমন বদলই আনলেন না।

খেলোয়াড় বদলগুলো হলো মূলত ‘লাইক ফর লাইক!’ ঘড়িতে ঘণ্টা পার হওয়ার পর মেন্দি-ভিনিসিয়ুসের বদলে ফেদেরিকো ভালভার্দে ও মার্কো আসেনসিওকে নামিয়েছিলেন, কিন্তু তখনো ছকটা ৩-৫-২ ছিল। ৭৬ মিনিটে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কাসেমিরোর বদলে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রদ্রিগোকে নামানোর পরই যা বদল আসে ছকে। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

ততক্ষণে চেলসি পেয়ে বসে রিয়ালকে। আর মাঝমাঠে এনগোলো কান্তেকে আটকানোর মতো কেউ ছিলেন না রিয়ালের। প্রথম গোল গড়ে দেওয়ায় অবদান রাখা চেলসির ফরাসি মিডফিল্ডার ৮৫ মিনিটে ম্যাসন মাউন্টের গোলেও রেখেছেন দারুণ অবদান। সব মিলিয়েই ফল, প্রথম লেগে ভাগ্যের জোরে ১-১ গোলে ড্র পাওয়া রিয়াল কাল যে পাঁচ-ছয় গোল খায়নি, তা-ও শুধু ভাগ্য আর চেলসির ফরোয়ার্ডদের ভুলের কারণে।

চেলসির প্রথম গোলের পর হতাশ রামোস ও কাসেমিরো।
ছবি: রয়টার্স

জিদান সব সময়ই বলে এসেছেন, এই মৌসুমে তাঁর খেলোয়াড়দের দম কমে এসেছে। খেলোয়াড়দের এত শতসহস্র চোটে পড়তে দেখা মৌসুমে জিদানের দাবিটা অমূলক নয়। রিয়াল যে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত তবু লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগের দৌড়ে ছিল, তা-ও শুধু জিদানের কৌশলের জোরেই। কিন্তু চেলসির বিপক্ষে এই দুই লেগে টুখেলের কৌশলের কাছে মার খেয়ে গেলেন ‘জিজু’।

চেলসির শ্রেষ্ঠত্ব ফরাসি কিংবদন্তি মেনেও নিয়েছেন। কাল ম্যাচের পর বললেন, ‘ওরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে। জয়টা ওদের প্রাপ্য ছিল। ম্যাচজুড়ে ওরা অনেক বেশি কার্যকর ছিল আমাদের চেয়ে, অনেক সুযোগও তৈরি করেছে। দুই লেগ মিলিয়ে বললে ফাইনালে যাওয়াটা ওদের প্রাপ্য।’ নিজের খেলোয়াড়দেরও মৌসুমে এত চোট সামলে এত দূর পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য প্রশংসা করেছেন জিদান। এরপর আবার বললেন, ‘আমরা (চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের) এক ম্যাচ দূরে চলে এসেছিলাম। কিন্তু আজ ওরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।’

এখন জিদান চোখ ফেরাচ্ছেন লিগে। সেখানে বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদের সঙ্গে রিয়ালের শিরোপা লড়াইয়ে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। আতলেতিকো (৭৬ পয়েন্ট), রিয়াল (৭৪) ও বার্সা (৭৪)—তিন দলের মধ্যে ব্যবধান ২ পয়েন্টের, লিগে ম্যাচ বাকি আর ৪টি করে। জিদানের চোখ এখন সেদিকে, ‘লা লিগায় আমাদের চারটি ম্যাচ বাকি আছে। আমরা আজ বিশ্রাম নেব, তারপর সেখানে কিছু একটা পাওয়ার জন্য ঝাঁপাব।’