শুধু রোনালদোর দলকে পেলেই জেতে তারা

রোনালদো গোল পেলেও তাঁর দল কাল জেতেনিছবি: রয়টার্স

কী ভেবে যে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর ব্রুনো ফার্নান্দেজকে উঠিয়ে নিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ উলে গুনার সুলশার!

ম্যান ইউনাইটেডের সমর্থকেরা হয়তো গতকাল রাত থেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। হোক না প্রতিপক্ষের নাম ইয়াং বয়েজ, কিন্তু সুইজারল্যান্ডের ক্লাবটির মাঠে কাল যখন রোনালদো-ফার্নান্দেজ দুজনকেই তুলে নিচ্ছেন সুলশার, তখনো তো ইউনাইটেড পয়েন্ট হারানোর শঙ্কায়!

শেষ পর্যন্ত জেতা তো হয়ইনি, উল্টো রোনালদোর বদলে নামা জেসি লিনগার্ডের অবিশ্বাস্য ভুল পাসে যোগ করা সময়ে গোল করে ২-১ গোলে ম্যাচটা জিতে যায় ইয়াং বয়েজ, ইউনাইটেডের জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে নতুন শুরুর ম্যাচে গোল পেলেও রোনালদো ম্যাচটা আর জয়ে রাঙাতে পারলেন না।

আর এই হারে একটা অস্বস্তিকর ধারাতেও জড়িয়ে গেল রোনালদোর নাম!

ম্যান ইউনাইটেডকে হারানোর পর ইয়াং বয়েজের উচ্ছ্বাস
ছবি: রয়টার্স

সুইজারল্যান্ডের ক্লাবের মধ্যে চ্যাম্পিয়নস লিগে এফসি বাসেলের নামই বেশি নিয়মিত। ইয়াং বয়েজ সুযোগ পায় মাঝেমধ্যে। উয়েফার সূচকে পিছিয়ে থাকায় সুইজারল্যান্ডের ঘরোয়া লিগে চ্যাম্পিয়ন দলকেও যে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সুযোগ পেতে বাছাইপর্বের চ্যালেঞ্জ জিতে আসতে হয়! ইয়াং বয়েজই যেমন চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে, অর্থাৎ ১৯৯২ সাল থেকে টুর্নামেন্টটার নাম ইউরোপিয়ান কাপ থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগ হওয়ার পর এ নিয়ে মূল পর্বে খেলছে মাত্র দ্বিতীয়বার!

নামটা ইউরোপিয়ান কাপ থাকার সময় অবশ্য ইয়াং বয়েজের দাপট একটুখানি বেশি ছিল, তা-ও পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। ১৯৫৯ সালে সেমিফাইনালেও খেলেছিল ইয়াং বয়েজ! সে সময় মূল পর্বে খেলেছিল ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১—টানা চার মৌসুম। সেই থেকে ১৯৯২ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ নাম পাওয়ার আগপর্যন্ত সময়ে ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বসূচক টুর্নামেন্টটির মূল পর্বে ইয়াং বয়েজ খেলতে পেরেছিল শুধু ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে।

এরপর? চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে সুযোগ মিলছিলই না ক্লাবটার! ২০১৮ সালের আগে পাঁচবার বাছাইপর্বে খেলেও গ্রুপ পর্বে আর ওঠা হয়নি। অবশেষে ষষ্ঠবারে এসে ভাগ্যের শিকে ছেড়ে ২০১৮-১৯ মৌসুমে। সেবারের পর এই মৌসুম—এ নিয়ে দুবার গ্রুপ পর্বে খেলেছে ইয়াং বয়েজ, আর এ দুবারই তাদের ইতিহাসে জড়িয়ে গেল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম।

রোনালদোর গোলে কাল ম্যাচে শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল ইউনাইটেড
ছবি: রয়টার্স

রোনালদোর অবশ্য এ গল্পে কিছু যাওয়া-আসার কথা নয়, কিন্তু ইয়াং বয়েজের জন্য গল্পটা গর্বের।

কী গর্ব? এ নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল পর্বে যে দুই মৌসুম খেলছে ইয়াং বয়েজ, দুবারই গ্রুপ পর্বে তাদের সঙ্গী হয়েছে রোনালদোর দল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো সময়ের সেরাদের একজনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়াই বড় গর্বের, সেখানে ইয়াং বয়েজ গর্বটা বাড়িয়ে নিয়েছে আরেকটু। এ নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে দুটি মাত্র ম্যাচেই জিতেছে সুইস ক্লাবটি, দুবারই তাদের প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন রোনালদো!

২০১৮-১৯ মৌসুমের কথা। গ্রুপে ইয়াং বয়েজ সঙ্গী হিসেবে পেল জুভেন্টাস, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ভ্যালেন্সিয়াকে। সেবারই মাত্র রিয়াল মাদ্রিদ থেকে জুভেন্টাসে গেছেন রোনালদো। গ্রুপে ৬ ম্যাচে ১ জয় ও ১ ড্র নিয়ে গ্রুপের তলানি থেকেই চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযান সেবার শেষ করেছে ইয়াং বয়েজ, কিন্তু যে একটা জয় পেয়েছে, সেটিই অনেক বছর গল্প করার মতো।

গ্রুপের শেষ ম্যাচ ছিল সেটি। ইয়াং বয়েজের মাঠে জুভেন্টাস। ইতালিয়ান ক্লাবটির একাদশে রোনালদো, মানজুকিচ, দগলাস কস্তা, পিয়ানিচ, বের্নারদেস্কি...তারকার কমতি ছিল না, বদলি হিসেবে নেমেছেন দিবালাও। কিন্তু ম্যাচটা সেদিন ২-১ গোলে জিতে যায় ইয়াং বয়েজ! হোয়ারাউয়ের জোড়া গোলে ৬৮ মিনিটে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইয়াং বয়েজ, বদলি নামা দিবালা ব্যবধান কমান ৮০ মিনিটে।

৭২ মিনিটে রোনালদো ও ফার্নান্দেজ দুজনকেই উঠিয়ে নেন ম্যান ইউনাইটেড কোচ সুলশার
ছবি: রয়টার্স

সেবারের পর এই মৌসুমে আবার গ্রুপ পর্বে ইয়াং বয়েজ। এবার জুভেন্টাস নয়, তবে গ্রুপ–সঙ্গী হিসেবে ম্যান ইউনাইটেড আছেই। গ্রুপে অন্য দুই দল আতালান্তা ও ভিয়ারিয়াল। দল যা-ই হোক, এবারও ইয়াং বয়েজের গ্রুপে রোনালদো! অনেক নাটকের পর এবার জুভেন্টাস ছেড়ে পুরোনো ক্লাব ম্যান ইউনাইটেডে ফিরেছেন রোনালদো, কালই চ্যাম্পিয়নস লিগে ইউনাইটেডের জার্সিতে তাঁর পুনরাভিষেক। ১৩ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের দারুণ পাসে গোল করে মুহূর্তটা রাঙিয়েও রাখেন রোনালদো!

কিন্তু এরপরই ইউনাইটেডের কী যেন হলো! তার চেয়েও বড় কথা, ইউনাইটেড কোচ সুলশারের কী যেন হলো! ৬৬ মিনিটে সমতা ফেরায় ইয়াং বয়েজ। এরপর সুলশার কী করলেন? এমন মুহূর্তে দলকে জেতাতে যাঁর পা থেকে গোল আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেই রোনালদোকেই উঠিয়ে নিলেন ৭২ মিনিটে। একই সঙ্গে উঠিয়ে নিলেন ফার্নান্দেজকেও! যোগ করা সময়ে রোনালদোরই বদলে নামা লিনগার্ডের অবিশ্বাস্য ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে গোল করে ইয়াং বয়েজ, ম্যাচ জিতে যায় ২-১ ব্যবধানে।

তাতে ইয়াং বয়েজের গল্পের ভান্ডার হলো আরও সমৃদ্ধ। চ্যাম্পিয়নস লিগে দুই জয়, দুটিই রোনালদোর দলের বিপক্ষে, দুটিই ২-১ গোলে...ইয়াং বয়েজের মতো ক্লাবের জন্য এই-বা কম কী!