শুভ জন্মদিন প্রিয় রবার্তো কার্লোস

প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের বেড়ে ওঠার গল্পগুলো এক রকমই। দারিদ্র্য, শূন্যতা, অভাব—এর মাঝেই গোবরে পদ্মফুলের মতো অদ্ভুত ভালোবাসা। ভালোবাসাটা একটা গোলকের প্রতি, যে গোলকটা পৃথিবীটাকে বদলে দিতে পারে। তাঁদের জীবনযাপন কিংবা ভালোবাসা—সবকিছুই এর জন্য। একই ছকে ছিল তাঁর গল্পটাও।
তাঁর অবস্থাও অন্যদের মতো। দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর সংগ্রাম। নয় বছর বয়সে তাঁকে যোগ দিতে হয়েছিল কফির বাগানে। কাজ কফি সংগ্রহ করা। এর মাঝেই সুযোগ চলে আসে। কথায় আছে না গোয়েন্দাদের পেছনে পেছনে রহস্য ঘোরে; যেন তাঁকে বের করার জন্যই খেলার আয়োজন। এক ম্যাচে তাঁর দুরন্ত ফ্রি কিক চোখে পড়ে এজেন্টদের। এই ফ্রি কিকের জন্যই এক স্থানীয় ক্লাব নিয়ে নেয়। আজীবন এই ফ্রি কিক দিয়েই মানুষের মনে টিকে আছেন, থাকবেন টেকো মাথার লোকটা—রবার্তো কার্লোস।
পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গতি আর বল। কিছু ফুটবলার এই ফুটবল পায়ে গতি আর বল কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক গোলরক্ষককে তটস্থ করেছেন। তাঁদেরই একজন কার্লোস। বল রেখে টানা ৫-৬ হাত পিছিয়ে পড়া। তারপর দৌড়ে এসে শট। গোলরক্ষকদের কোনো সুযোগ না দিয়েই চলে যেত সে বল—তাঁর ট্রেডমার্ক ফ্রি কিক।
সাও পাওলোতে সাও জোয়াও ক্লাবের চোখে পড়েন প্রথমে। গোল করার থেকে ডিফেন্সটাই প্রিয়। ১৯ বছর বয়সে তাঁকে চোখে পড়ে অ্যাথলেটিকো মিনেইরোর। মিনেইরো তাদের ‘বি’ দলের সঙ্গে তাঁকে কোপা কনমেবোল কাপে পাঠায়। কোপা কনমেবোল কাপে যাওয়াই তাঁর জীবনের সেরা সময় হিসেবে বিবেচিত। এই কনমেবোল কাপ দিয়েই ব্রাজিলের হলুদ জার্সিটাও তাঁর গায়ে ওঠে।
পরের বছর নতুন দল পালমেইরাসে পা দেন কার্লোস। পালমেইরাসে মাত্র দুই বছর সময় নিলেন ইউরোপিয়ানদের অবাক করতে। ইন্টার মিলান দলে ভেড়ায় এই অ্যাটাকিং লেফট ব্যাককে। অভিষেকে গোলও তাঁর ইতালি ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে পারেনি। ইন্টার মিলানে অসাধারণ একটা মৌসুম কাটানোর পরেও দল হিসেবে ব্যর্থ হয় দল। কোচ রয় হজসন চাচ্ছিলেন তাঁকে পাকাপাকিভাবে লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলাতে। কিন্তু পাকাপাকিভাবে লেফট উইংয়ে খেলার ইচ্ছে ছিল না তাঁর। ডিফেন্স থেকে দ্রুত উঠে যাওয়া, আবার ট্র্যাক ব্যাক করা তাঁর নিজ পছন্দ হলেও কোচ চাইতেন হয় ডিফেন্সে থাকবেন, নয়তো পাকাপাকি উইংয়ে। ইন্টারের প্রেসিডেন্ট মোরাত্তির সঙ্গে কথা বলেও কোনো ফল পাননি।

ইন্টারের সঙ্গে যখন সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হওয়ার পথে, তখনই এক প্রীতি ম্যাচে চমক দেখালেন কার্লোস। ৩৫ মিটার দূর থেকে নেওয়া ফ্রি কিক, বিশ্বের প্রত্যেক ফুটবল দর্শককে হতভম্ব করে দিয়ে দুর্দান্ত গতির শটে সবাইকে বোকা বানান কার্লোস। গোল দেখে বোকা বনে যান ফ্যাবিও ক্যাপেলোও। যখন জানতে পারলেন, এই খেলোয়াড়কেই ইন্টার ছেড়ে দিচ্ছে নামমাত্র মূল্যে, দেরি করেননি। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান লেফট ব্যাককে রিয়াল মাদ্রিদে টেনে আনেন ক্যাপেলো। বিশ্ব নতুন করে চিনতে শুরু করে ফুলব্যাকের সংজ্ঞা।
রিয়াল মাদ্রিদে আসার পর ফ্যাবিও ক্যাপেলো তাঁকে স্বাধীনতা দেন যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে খেলার। শুধু ডিফেন্স ঠিক রাখলেই হবে। ৩ নম্বর জার্সি নিয়ে সারা পৃথিবী শাসন করার প্রস্তুতিও নেন ভালোভাবেই। প্রথম বছরেই ফ্যাবিও ক্যাপেলোর অধীনে লা লিগা জয় করেছেন নেন। পরের বছর কোচ ইয়ুপ হেইকেন্সের অধীনে চ্যাম্পিয়নস লিগ। ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা দল নিয়ে বিশ্বকাপে যান রবার্তো কার্লোস। পরাক্রমশালী ব্রাজিলের হয়েও নিজের স্বভাবসুলভ খেলা চালিয়ে যান, কিন্তু ফাইনালে এক জিদানের কাছে হার আনতে হয় ব্রাজিলকে।
রিয়ালে তাঁর সময়ে প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে, পুরো দলকে ঢেলে সাজিয়েছে, একমাত্র দুটি জায়গাতেই হাত দেওয়া হয়নি। গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস আর বাঁ পাশে রবার্তো কার্লোস। দল যখন তারকাপুঞ্জ, তখনো নিভে যাননি। বরং ২০০২ সালের ফাইনালে জিদানের সেই অসাধারণ ভলির পেছনের কারিগর কিন্তু এই কার্লোসই। জিদানের উদ্দেশে বাতাসে বল ভাসিয়ে ছিলেন এই রবার্তো কার্লোসই। সেবারের বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের সেরা বিশ্বকাপ। চীনের বিরুদ্ধে করা ফ্রি কিকে গোল পুরোনো রবার্তোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
২০০৩ সালে ডেভিড বেকহাম দলে আসার পর ফ্রি কিকে ভাগ বসাতে হয় বটে, কিন্তু এ নিয়ে কখনোই তাঁর অভিযোগ ছিল না। ভালোবাসতেন সাদা জার্সিটাকে, এ কারণে অনেক কিছুতে ছাড় দিয়েছেন। কিন্তু ফিগো, জিদান, বেকহাম আর রবার্তো যখন একসঙ্গে ফ্রি কিক নেওয়ার জন্য দাঁড়াতেন, তখন গোলরক্ষকের কেমন লাগত কে জানে!
২০০৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিল দলের হারের পেছনে অনেকেই দাবি করেন তাঁকে। থিয়াগো অঁরিকে মার্ক করার দায়িত্ব থাকলেও ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ান অঁরি। ব্রাজিলিয়ানদের দাবির মুখে সেদিনই ব্রাজিল দল থেকে চিরবিদায় নেন। অসাধারণ লেফট ব্যাকের বিদায়টা অনেকটা আক্ষেপ নিয়েই শেষ হয়। ব্রাজিলের হলুদ জার্সিটা তুলে রাখার পরই ফর্ম নেমে যেতে থাকে।
ফ্যাবিও ক্যাপেলো থেকে আবারও ফ্যাবিও ক্যাপেলো। এর মাঝে তারকাপুঞ্জ তৈরি হয়েছে, তারকাপুঞ্জ ভেঙেও গিয়েছে। কোচ হিসেবে এসেছেন মোট ৯ জন। ১০ বছরের ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন দেখেছেন প্রতিবারই। রিয়ালের হয়ে তিনি ৩৭০ ম্যাচে করেছেন ৪৭টি গোল, জিতেছেন ৪টি লিগ শিরোপা, ৩টি করে চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং স্প্যানিশ কাপ। ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে, ১৯৯৭ সালে জিতেছেন ফিফা প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের রুপা, ২০০২ সালে হয়েছেন ব্যালন ডি’অর রানারআপ এবং দুবার করে জিতেছেন উয়েফা ক্লাব ডিফেন্ডার অব দ্য ইয়ার।
তাঁর মতোই এক তরুণ মার্সেলো ভিয়েরার আগমনে জায়গা ছেড়ে দেন। ক্লাব ছাড়ার আগে ইতিহাসের অন্যতম সেরা কামব্যাকের ইতিহাস গড়ে দিয়ে যান কার্লোস।
২০০৬-০৭ মৌসুমের ৩৫তম ম্যাচ। রিয়াল বার্সার পয়েন্ট তখন সমান, পা হড়কালেই লিগ হারানোর ভয়। সেই সময় ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা রিয়াল খায় টানা ২ গোল। শেষ মুহূর্তে যখন ম্যাচ ড্র হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা, তখনই কার্লোসের পা দলকে এনে দেয় জয়। দলকে লিগ শিরোপা জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় আরেক ধাপ।
শেষ ম্যাচে যখন জিতলেই শিরোপা জয়ের সমীকরণ, তখন আরেক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে দল। রবার্তো কার্লোস, ডেভিড বেকহাম—দুজনই এই ম্যাচ খেলেই বিদায় নেবেন দল থেকে। শুরুতেই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে মাদ্রিদ। হাফ টাইমের কিছুক্ষণ পর চোটে পড়েন ডেভিড বেকহাম। অন্যদিকে জিমনেস্টিকের মাঠে ৪-০ গোলে এগিয়ে বার্সেলোনা। অনেকেই মাদ্রিদের লিগ শিরোপার শেষ দেখে ফেলেছিলেন। বেকহামের বদলি নামলেন আর্সেনাল থেকে লোনে আসা রেয়েস। নেমেই রবার্তোর পাস থেকে গোল। ৮০ মিনিটে গোল মুহাম্মদ দিয়ারার, আর ৮৩ মিনিটে দলের শিরোপা নিশ্চিত করেন রেয়েস।
রবার্তোর পরবর্তী গন্তব্য হয় ফেরেনবাচ। সেখানে দুই বছরের চুক্তিতে খেলেছেন পুরোটা সময়ই। ১৫ বছর পর ব্রাজিলে ফেরেন কার্লোস। যদিও এক মৌসুম খেলেই করিন্থিয়ানস ছেড়ে দেন রবার্তো। তারপর রাশিয়ান লিগে এক মৌসুম খেলে ছুটি নেন ফুটবলের দুনিয়া থেকে। গাস হিডিঙ্ক তাঁর বিদায় নিয়ে বলেছেন, ‘রবার্তো একজন ওয়ার্ল্ড ক্লাস খেলোয়াড়, কিন্তু সব মাস্টারেরই ছুটির সময় হয়। রবার্তোও বিদায় নিচ্ছে।’
ডিফেন্স থেকে উঠে আক্রমণ সাজানোর গল্পটাকে নতুন করে সাজানোর নায়ক রবার্তো কার্লোস তাইয়াজো। শুভ জন্মদিন রবার্তো কার্লোস দ্য সিলভা রোচা, ‘দ্য বুলেট ম্যান’।