সাফের বার্তা, ফুটবল উন্নয়নে নেই শর্টকাট রাস্তা

নেপালের বিপক্ষে হারের পর হতাশায় ভেঙে পড়া বাংলাদেশ দল। ছবিঃ প্রথম আলো
নেপালের বিপক্ষে হারের পর হতাশায় ভেঙে পড়া বাংলাদেশ দল। ছবিঃ প্রথম আলো
>টানা চতুর্থবারের মতো সাফ ফুটবলের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিল বাংলাদেশ। ফুটবলের এই ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে আমাদের অবস্থানটা। এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আবারও বার্তা দিয়ে গেল ফুটবল উন্নয়নে শর্টকাটের কোনো স্থান নেই।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম চত্বরে মানুষের আর ভিড় নেই। থেমে গেছে চায়ের দোকানের আড্ডায় তপু বর্মণের ‘সার্জিও রামোস’ হয়ে ওঠার গল্প। হওয়ারই তো কথা। ঘরের উঠোনের সাফ উৎসবে বাংলাদেশ এখন যে শুধুই দর্শক। ভাবা যায় ২০০৩ সালের চ্যাম্পিয়নরা এ নিয়ে টানা চতুর্থবার বিদায় নিল গ্রুপ পর্ব থেকেই।

প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ২-০ গোলে হারিয়ে সুন্দর সূচনার পর দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় নিয়ে সেমিফাইনালের সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে ড্র করতে পারলেই সেমিতে স্থান করে নিতে পারত জেমি ডের শিষ্যরা। কিন্তু উল্টো পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে নেপালই সেমিতে উঠে গেল বাংলাদেশকে ২-০ গোলে হারিয়ে।

ব্যর্থতার পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বেজায় ক্ষুব্ধ। তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এত প্রস্তুতির পরেও দল কীভাবে ব্যর্থ হয়। তিনি বলছেন, জাতীয় দলকে কাতার আর দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুশীলনে পাঠিয়েছেন। আর কী করতে পারতেন তিনি!

কাতার আর দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুশীলন ক্যাম্প বাংলাদেশ দলকে উপকৃত করেছে অবশ্যই। বাফুফের এই উদ্যোগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হচ্ছে বিদেশের মাটিতে জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্প উপমহাদেশের মতো ফুটবলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলেও এখন আর বিশেষ কিছু নয়। এবারের সাফ টুর্নামেন্টের আগে নেপাল ক্যাম্প করেছে থাইল্যান্ডে, পাকিস্তান বাহরাইনে, মালদ্বীপ কাতারে, শ্রীলঙ্কা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। পড়শি ভারত ক্যাম্প করে এসেছে অস্ট্রেলিয়ায়।

আসলে বাংলাদেশের ফুটবলের মূল সমস্যাটা হচ্ছে ভালো মানের ফুটবলারের অভাব। সাফ অঞ্চলের অন্য সব দেশ যেখানে তৃণমূল থেকে ফুটবলার তুলে আনার কাজ করে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে আছে। যেখানে ফুটবল প্রতিভাই নেই, সেখানে কাতারে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে অনুশীলন করে তো আর রাতারাতি ভালো ফুটবলার তৈরি করা যায় না।

নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের গোলরক্ষক শহীদুল আলম সোহেলের বড় ভুল ছিল। আর বাকি সময়ে পুরো বাংলাদেশকে তারা ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে। ৩২ মিনিটে সোহেলের ভুলে গোল খাওয়ার পর আরও ৬০ মিনিটের মতো সময় হাতে পেয়েছেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। কিন্তু গোটা ম্যাচে বলার মতো কোনো গোলের সুযোগই সৃষ্টি করতে পারেননি তাঁরা। উল্টো নেপাল দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে কতটা এগিয়ে গেছে তারা।

কীভাবে এগিয়ে গেল নেপাল? ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি স্টেডিয়ামই তাদের সম্বল। তবে তাদের আছে ফুটবল নিয়ে দারুণ একটা পরিকল্পনা। ফুটবল একাডেমি তৈরি করে তারা তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর সুফলও পাচ্ছে তারা।

২০১৬ সালে যে বাংলাদেশ থেকেই বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ জিতে গিয়েছিল নেপাল। সেখান থেকেই নেপাল ফুটবলের জাগরণ শুরু। ম্যাচ গড়াপেটার দায়ে দলের সেরা খেলোয়াড়েরা নিষিদ্ধ হওয়ায় বঙ্গবন্ধু কাপে এসেছিল তরুণ একটি দল নিয়ে। এরপর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এএফসি সলিডিরাটি কাপেও চ্যাম্পিয়ন হয় নেপাল। নেপালে ঘরোয়া ফুটবল যে খুব শক্তিশালী, সেটি বলা যাবে না। পাহাড়ি দেশটির শক্তি একটি একাডেমি। নেপাল ফুটবল ফেডারেশনের যে একাডেমিতে সারা বছর অনুশীলন করে তৈরি হন ফুটবলাররা।

বাংলাদেশের ফুটবল যে একেবারেই লক্ষ্যহীন রাস্তায় চলছে, এ কথা চায়ের দোকানেও আলোচনা হয়। ফেডারেশনের নিজস্ব একটি ফুটবল একাডেমি নেই, একটি তথ্যই তো সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া খেলোয়াড় উঠে আসার সব রাস্তাই বন্ধ। ক্লাবগুলোর অনীহা খেলোয়াড় তৈরিতে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে লিগ হচ্ছে না, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্যাম্প নেই। তাহলে কোথা থেকে উঠে আসবে ফুটবলার, কারা দেখাবে ভবিষ্যতের আলো?

যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় ফুটবলার তৈরির দায়িত্ব ক্লাবগুলো নিচ্ছে না, তাই ফেডারেশনের নিজস্ব একাডেমিই ভরসা। এই একাডেমিভিত্তিক ফুটবলের ওপর দাঁড়িয়েই তরতর করে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো। বাংলাদেশের যেখানে একটি ফুটবল একাডেমিও নেই, সেখানে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের নিজস্ব বড় একাডেমি আছে ২৭টি, মালদ্বীপের আছে ৬টি, ভুটানের আছে ২টি এবং নেপালের আছে একটি (২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী)।

২০১৩ সালের কাঠমান্ডু সাফের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়। সংগৃহীত ছবি
২০১৩ সালের কাঠমান্ডু সাফের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়। সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ দলে একজন গোল করার মতো স্ট্রাইকার নেই। এটা এখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বাইরে ব্যবসা করা স্বল্পশিক্ষিত চায়ের দোকানিও জানেন। ভুটানের মতো দেশও এখন চোনচো গেইলশেনের মতো স্ট্রাইকার তৈরি করেছে। নেপালের আনফা একাডেমিতে তৈরি হয়েছে বিমল ঘাত্রীর মতো আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার। এই বিমল বেলজিয়ামের আন্ডারলেখট ক্লাবের জুনিয়র দলেও জায়গা করে নিয়েছে। আনফা একাডেমির গড়া মিডফিল্ডার রোহিত চাঁদ খেলছে ইন্দোনেশিয়ান লিগে। নেপাল জাতীয় দলের ৯০ ভাগ ফুটবলারই এই আনফা একাডেমির ছাত্র।

বাফুফের কর্তাদের ভাবভঙ্গিতে মনে হয়, বাংলাদেশের মাটিতে ভালো ফুটবলার যেন এমনিতেই জন্মাবে। একাডেমির আবার কী দরকার। অতীতে সিলেটে খুব ঘটা করে একটা একাডেমির যাত্রা শুরু করেও সেটি বন্ধ হয়ে গেছে অর্থাভাবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার বিবেচনায় ধরলে অর্থাভাবে একটা ফুটবল একাডেমি বন্ধ হয়ে থাকার অজুহাত খুবই হাস্যকর শোনায়। অর্থাভাব যদি হয়েই থাকে, সেটি যে বাফুফে কর্তাদের ব্যর্থতায়, সেটি এখানে না বললেও চলছে।

বাফুফে একাডেমি তৈরি করতে পারুক বা না পারুক, প্রকৃতি-প্রদত্ত প্রতিভাদের ধ্বংস করে দিতে সিদ্ধহস্ত। গত তিন-চার বছরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় প্রতিভার ঝলক দেখালেও বাফুফে তাদের পরিচর্যার কোনো প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেনি। নিপু, ফাহিমরাই উদাহরণ। ২০১৫ সালে ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করা দলটির সাদউদ্দীন ছাড়া এখন পাইপলাইনে কোনো ফুটবলারই নেই। সেবার টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় ও স্ট্রাইকার নিপুর দ্রুতগতি ও গোল করার সহজাত ক্ষমতা দেখে বাফুফে কর্তারা নিশ্চিত হয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্ট্রাইকার সমস্যা কেটে গেছে।’ অথচ সে নিপুই বাফুফে কর্তাদের অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছেন।

জাতীয় দল গঠন করতে গেলে ঘুরেফিরে সে মুখগুলোই ডাকতে হয়। বাংলাদেশের সাবেক অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটান আবাহনীর কোচ থাকতে বলেছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশের ফুটবলকে ১৮ বছর আগে যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, এখনো সেখানেই আছে। আমি আলফাজ, আরমান, আমিনুল, হাসান আল মামুনদের মতো ফুটবলার পেয়েছিলাম। এখন তো ওই মানের ফুটবলারদের দেখা যায় না।’

আসলে আলফাজ, আরমানরা একাডেমির ফসল না হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পের ফসল। ঠিক যেমন মামুনুল, মিশু, জাহিদ, মিঠুন, নাসিরুলরা ২০০৫ সালে সাবেক তারকা ফুটবলার শহিদুর রহমান সান্টুর অধীনে প্রায় এক বছরের অনুশীলন ক্যাম্প থেকেই উঠে এসে টানা ১০ বছর জাতীয় দলকে সেবা দিলেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কোনো ব্যাচই তৈরি হয়নি তাঁদের জায়গা নেওয়ার জন্য।

আমাদের সম্ভাবনাময় কিছু তরুণ আছেন। যাঁরা এশিয়াডে কাতারকে হারিয়ে দিয়েছেন। সাফে হারিয়েছেন ভুটান-পাকিস্তানকে। কিন্তু জয় আর সাফল্যের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমরা জয় পেয়েছি, সাফল্য নয়। কারণ, সাফল্যের জন্য কোনো পেছনের দরজা নেই। নেই কোনো শর্টকাট রাস্তাও।