সালাহর হৃদয় ভেঙে সেনেগালকে নিয়ে বিশ্বকাপে মানে

কাতার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিতের পর সেনেগালের খেলোয়াড়দের উদযাপনছবি: টুইটার

মোহাম্মদ সালাহ না সাদিও মানে? কাতার বিশ্বকাপে দেখা যাবে কাকে? সেনেগালের রাজধানী ডাকারে উত্তর মিলল আজ রাতে।

আফ্রিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব প্লে অফ ফিরতি লেগে আজ মিশরকে ১-০ গোলে হারিয়ে দুই লেগ মিলিয়ে ১-১ ব্যবধানে সমতা আনে সেনেগাল। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও নিষ্পত্তি না হওয়ায় দিতে হয় টাইব্রেকার নামের স্নায়ুচাপ সামলানোর পরীক্ষা। ফিরে আসে সর্বশেষ আফ্রিকান কাপ অব নেশনস ফাইনালের স্মৃতি। সেখানেও তো দুই দলকে দিতে হয়েছিল টাইব্রেকার-পরীক্ষা!

মোহাম্মদ সালাহ সে পরীক্ষায় শট নেওয়ার সুযোগ পাননি। তার আগেই হার নিশ্চিত হয়ে যায় মিশরের। আজ দেশের হয়ে টাইব্রেকারে প্রথম শট নিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি লিভারপুল তারকা। পরে চড়া মূল্যই দিতে হয়।

মিশরকে টাইব্রেকার-পরীক্ষায় ৩-১ গোলে 'ফেল' করিয়ে কাতার বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে সেনেগাল।

কায়রোয় প্রথম লেগ ১-০ গোলে জিতে এগিয়ে ছিল মিশর। ডাকারে ফিরতি লেগে প্রস্তুত ছিলেন সেনেগালের সমর্থকেরা। লেজার রশ্মি নিয়ে এসেছিলেন গ্যালারিতে। মাঠে শুরু থেকেই আক্রমণে ওঠেন সাদিও মানে-ইসমাইল সাররা। যত দ্রুত সম্ভব গোল আদায় করে সমতায় ফিরতে হবে।

লম্বা পাস এবং দুই উইংয়ের ব্যবহারে চাপে পড়ে মিশরের রক্ষণভাগ। ৪ মিনিটে বাঁ প্রান্তে ফ্রিকিক পায় সেনেগাল। মিশরের রক্ষণ বল ঠিকমতো 'ক্লিয়ার' করতে না পারার সুযোগ নেন ভিয়ারিয়াল ফরোয়ার্ড বৌলায়ে দিয়া। তাঁর শট জালে ঢুকতেই আনন্দে ফেটে পড়ে এস্তাদে আবদৌলায়ে স্টেডিয়াম।

সেনেগালই এগিয়ে যায় ম্যাচে
ছবি: টুইটার

সেনেগালিজদের নিভু নিভু আশাও দপ করে জ্বলে ওঠে। প্রথম লেগে আত্মঘাতী গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ার পর ফিরতি লেগের এই গোলে ১-১ ব্যবধানে সমতায় ফেরে সেনেগাল।

ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর আগেই কাতার বিশ্বকাপের টিকিট কেটে ফেলতে পারত আলিউ সিসের দল। ৮২ মিনিটে বক্সের ঠিক সামনে থেকে দারুণ থ্রু পাস দেন মানে। পাসটা ধরে মিশর গোলকিপার মোহাম্মদ এল শেনওয়েকে একা পেয়ে যান ওয়াটফোর্ডের সেনেগালিজ উইঙ্গার ইসমাইল সার। কিন্তু বলটা তিনি কীভাবে পোষ্টের বাইরে মারলেন তা গবেষণার বিষয়!

গবেষণার বিষয় হতে পারে প্রথমার্ধে সালাহর নিষ্প্রভ থাকাও। তিন থেকে চারবার বল পেলেও হারিয়েছেন দ্রুতই। সে তুলনায় তাঁর লিভারপুল সতীর্থ সাদিও মানে ছিলেন সেনেগালের আক্রমণভাগের কান্ডারি। দ্রুত ও লম্বা পাসে ওপরে উঠেছেন মানে, সার ও ইদ্রিস গুয়েরা। মানে দুটি ভালো সুযোগ তৈরি করলেও কাজে লাগাতে পারেননি তাঁর সতীর্থরা।

প্রথমার্ধে ৬২ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে ৮টি শট নিয়েছে সেনেগাল। পোস্টে ছিল ৩টি শট। এই তিনটি শটই ছিল দুরপাল্লার, প্রতিবারই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে মিশর গোলকিপারকে। আসলে মিশরের সব খেলোয়াড়কেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। মাঠে ছিলেন মানে-সাররা, প্রথমার্ধের শেষ দিকে একটু শরীর নির্ভর খেলে মিশরের দুই ডিফেন্ডারকে মাঠের বাইরে পাঠায় সেনেগাল। বদলি নামালেও মিশরের পর্তুগিজ কোচ কার্লোস কুইরোজেজর সাজানো রক্ষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

সেনেগালিজ সমর্থকদের লেজার রশ্মিতে খেলতে সমস্যা হয়েছে মিশরের খেলোয়াড়দের
ছবি: টুইটার

গ্যালারি থেকে লেজার রশ্মি ও বোতল মেরেছেন সেনেগালিজ সমর্থকেরা। প্রথমার্ধে মিশরের একটি শট নেওয়া এবং গোলপোস্টে রাখতে না পারাই বোঝায় সালাহরা কতটা চাপে ছিলেন।


সালাহ-মোহাম্মদ এলনেনিরা বল পেলেই তাঁদের শরীরে লেজার রশ্মি মেরে খেলায় অসুবিধা সৃষ্টি করেছেন সমর্থকেরা। মিশর গোলকিপারকে মাথায় বোতলের আঘাতও সইতে হয়। সালাহরা রেফারির কাছে বলেও লাভ হয়নি। মানে করজোরে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেছেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা!

বিরতির পর জেগে ওঠার চেষ্টা করে মিশর। দলীয় সমন্বয়ে দুটি ভালো আক্রমণ করেও গোল পায়নি দলটি। বিরতির পর একটি শট রাখতে পেরেছে গোলপোস্টে। সেনেগাল চারটি শট নিয়েও কাক্ষিত গোলের দেখা পায়নি।

কায়রোয় সালাহদের লড়াই দেখছেন মিশরের সমর্থকেরা
ছবি: রয়টার্স

নির্ধারিত সময়ের বাঁশি বাজার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। গত মাসে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস ফাইনালেও দুই দল অতিরিক্ত সময়ে গোল না পাওয়ায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে এবং ৪-২ গোলের হারে স্বপ্নভঙ্গ হয় সালাহদের।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেই গোলের তিনটি দারুণ সুযোগ পেয়েছে সেনেগাল। তিনটি আক্রমণেই ভূমিকা ছিল মানের। বক্সের মধ্যে জটলা থেকে গোল আদায় করতে পারেনি সেনেগাল। বিরতির পরও গোলের ভালো সুযোগ পেয়েছেন মানেরা। মিশর বেশির ভাগ সময় রক্ষণ সামলেছে।

টাইব্রেকারে প্রথম শটটি নিতে আসেন সেনেগালের সেন্টারব্যাক কালিদু কৌলিবালি। তাঁর শট পোস্টে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরের শটটি গোলপোষ্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন মিশর তারকা সালাহ! অবিশ্বাস্য, এর পর দুটি শটেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি দুই দল!

শেষ পর্যন্ত নিজেদের তৃতীয় শটে গিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন সেনেগালের ইসমাইল সার। কিন্তু মিশরকে পরের শটে সমতায় ফেরান আমির এল সোলেয়া। বাম্বা দিয়েং চতুর্থ শটে লক্ষ্যভেদ করার পর ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সেনেগাল। কিন্তু মিশরের হয়ে মুস্তফা মোহাম্মদের নেওয়া চতুর্থ শটটি রুখে দেন সেনেগালের তারকা গোলকিপার এদুয়ার্দো মেন্দি। সাদিও মানে নিজেদের শেষ শটে লক্ষ্যভেদ করে বিশ্বকাপের টিকিট পাইয়ে দেন সেনেগালকে।

‘সুপার ঈগল’রা নেই , ঘানা, মরক্কো ও তিউনিসিয়ার টিকিট:

আবুজায় প্লে অফের ফিরতি লেগে ঘানার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করায় কাতার বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না নাইজেরিয়ার। প্রথম লেগে ঘানার মাঠে গোলশুন্য ড্র করে আফ্রিকার ‘সুপার ঈগল’রা। দুই লেগ মিলিয়ে প্রতিপক্ষের মাঠে গোল করার সুবিধা নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে নাম লেখায় ঘানা। ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত টানা তিন বিশ্বকাপে খেলা ঘানা কাতারে চতুর্থ বিশ্বকাপে খেলবে।

ম্যাচের পর ক্ষিপ্ত নাইজেরিয়ার সমর্থকেরা মাঠে ঢুকে পড়েন। ঘানার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের প্রতি বোতল ছুড়ে মারা হয়। পুলিশ সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে মাঠে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

কাসাব্লাঙ্কায় প্লে অফের ফিরতি লেগে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোকে ৪-১ গোলে হারায় মরক্কো। কিনশাসায় প্রথম লেগে ১-১ গোলে ড্র হয়। দুই লেগ মিলিয়ে ৫-২ গোলের জয়ে কাতার বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে মরক্কো।

তিউনিসে ঘরের মাঠে প্লে অফ ফিরতি লেগে গোলশুন্য ড্র করে তিউনিসিয়া। বামাকোয় প্রথম লেগ ১-০ গোলে জেতায় দুই লেগ মিলিয়ে ১-০ গোলের জয়ে ষষ্টবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পেয়েছে তিউনিসিয়া।

ব্লাইদায় প্লে অফ ফিরতি লেগে স্বাগতিক আলজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারায় ক্যামেরুন। ক্যামেরুনের মাঠে প্রথম লেগ ১-০ গোলে জিতেছিল আলজেরিয়া। দুই লেগ মিলিয়ে ২-২ গোলে ড্র হলেও প্রতিপক্ষের মাঠে বেশি গোল করায় কাতার বিশ্বকাপের টিকিট কাটে ক্যামেরুন।

অতিরিক্ত সময়ের তিন মিনিট বাকি থাকতে আহমেদ তৌবার গোলে দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ গোলে আলজেরিয়াই এগিয়ে ছিল। কিন্তু ১২৪ মিনিটে কার্ল তোকো একাম্বির গোলে কপাল পুড়েছে রিয়াদ মাহরেজের আলজেরিয়ার।