'পেরেজ অভিশাপ' কাটাতে পারবেন লোপেতেগি?

লোপেতেগি কি পারবেন পেরেজ-কুফা কাটাতে? ছবি: টুইটার
লোপেতেগি কি পারবেন পেরেজ-কুফা কাটাতে? ছবি: টুইটার
সাফল্য ছাড়া রিয়াল মাদ্রিদে কারও কোনো মূল্য নেই, অন্তত ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের সময়ে। অথচ পেরেজের নিয়োগ দেওয়া কোনো কোচই প্রথম মৌসুমে লা লিগা জিততে পারেননি। লোপেতেগি কি পারবেন?


রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হওয়া খুবই কষ্টের একটা কাজ। যে দলের সভাপতির নাম ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ সেই দলের কোচিং করানো কষ্টের ব্যাপারই বটে। পেরেজ তাঁর মনের খেয়াল-খুশি মতো চলেন, যখন যেভাবে তাঁর চলা দরকার মনে হয় সেভাবে। তাঁর অধীনে কেউ শিরোপাহীন থাকলে পরের মৌসুমে চাকরি থাকবে, এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। সে অনুযায়ী হুলেন লোপেতেগির সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এর দায় কিন্তু কিছুটা হলেও পেরেজের।

রিয়ালের সভাপতি হিসেবে পেরেজের ১২তম কোচ লোপেতেগি। রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই সংযুক্ত থাকায় এ ক্লাব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন লোপেতেগি। এবং এটাও তাঁর জানা আছে পেরেজের অধীনে সাফল্য ছাড়া কোনো কথা নেই। এর বিপরীতেই লুকিয়ে আছে আরেকটি ভয়ংকর তথ্য। পেরেজের নিয়োগ দেওয়া আগের এগারো কোচের একজনও তাঁদের প্রথম মৌসুমে দলকে লিগ জেতাতে পারেননি!

পেরেজ রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি হয়ে এসেছেন ২০০০ সালে। এসেই কোচ হিসেবে পান ভিসেন্তে দেল বস্ককে। পেরেজের প্রথম মৌসুমেই রিয়াল মাদ্রিদকে এনে দেন চ্যাম্পিয়নস লিগ, পরের বছর লিগ শিরোপা, তাঁর পরের বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ, এরপর আবার লিগ। চ্যাম্পিয়নস লিগ-লা লিগা-চ্যাম্পিয়নস লিগ-লা লিগা, এ চক্র শেষ করে বাড়ি এসে দেল বস্ক দেখেন তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পেরেজের প্রথম খামখেয়ালির বলি দেল বস্ক।

এরপর সভাপতি পেরেজ নিজে প্রথম কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন কার্লোস কুইরোজকে। এক বছরের মাথায় বরখাস্ত হন তিনি। এরপরে পেরেজের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত আড়াই বছরে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হয়ে আসেন চারজন। বলাবাহুল্য এর মাঝে কেউই লিগ শিরোপা উপহার দিতে পারেননি। এমনকি চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত নিতে পারেননি কেউ।

দ্বিতীয়বারের মতো পেরেজ রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি হন ২০০৯ সালে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সেবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদেও কোচ নিয়ে খামখেয়ালিপনা চলতেই থাকে। প্রথম দিনেই আগের কোচ হুয়ান্দে রামোসকে বিদেয় করে কোচ করে আনেন ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনিকে। প্রথম বছর পেলেগ্রিনি কোনো শিরোপা উপহার দিতে পারেননি। ফলাফল মৌসুম শেষেই বিদায়।

এরপর কোচ হিসেবে আসেন হোসে মরিনহো। প্রথম মৌসুমেই প্রায় নয় বছর পর রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমি ফাইনালে তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে ১৮ বছর পর এনে দেন প্রথম কোপা দেল রে শিরোপা। কিন্তু সেবারও লিগ জেতা হয়নি রিয়ালের। পরের মৌসুমে ১০০ পয়েন্টসহ লা লিগা শিরোপা জেতেন মরিনহো। তিন মৌসুম পর চুক্তি শেষে চাকরি ছেড়ে দেন মরিনহো। নতুন কোচ হিসেবে আসেন কার্লো আনচেলত্তি।

কার্লো আনচেলত্তিকে আনার মূল কারণ ছিল স্পেনের পর আবার ইউরোপে সাফল্য আনা। সে ক্ষেত্রেও সফলতা পান আনচেলত্তি। প্রথম মৌসুমেই ১২ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয় করেন। কিন্তু নিয়োগের প্রথম মৌসুমে আনচেলত্তিও পারেননি ‘পেরেজ অভিশাপ’ কাটাতে। সেবার লিগ জেতে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। পরের মৌসুমে তিনটি শিরোপাই বার্সেলোনার কাছে যাওয়ার বলি হন ইতালিয়ান কিংবদন্তি। আনচেলত্তিকে বরখাস্ত করেন পেরেজ।

সভাপতি হিসেবে পেরেজের সেরা কাজ জিনেদিন জিদানকে দলে আনতে পারা। ছবি: টুইটার
সভাপতি হিসেবে পেরেজের সেরা কাজ জিনেদিন জিদানকে দলে আনতে পারা। ছবি: টুইটার

রাফায়েল বেনিতেজ এসে ছয় মাস টিকতে পেরেছেন। অথচ রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে আগে থেকে সম্পর্ক থাকায় ভাবা হয়েছিল লিভারপুলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো এই কোচ ভালো করবেন। বেনিতেজকে সরিয়ে কোচ হিসেবে আনা হয় রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক খেলোয়াড় এবং তর্কাতীতভাবে পেরেজের সেরা সাইনিং জিনেদিন জিদানকে। ভঙ্গুর দলকে নিয়ে প্রথম মৌসুমেই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতান। কিন্তু লা লিগা শিরোপা হাতছাড়া করেন মাত্র ১ পয়েন্টের জন্য। আগেই ১২ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়া এক দল নিয়ে জিদানের এতটুকু আসাও কম ছিল না। কিন্তু পেরেজ-অভিশাপ জিদানের হাত ধরেও কাটেনি।

পরের মৌসুমে ৫৮ বছর পর এক সঙ্গে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দেন জিদান। নিজের তৃতীয় মৌসুমে এসে টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ইতিহাস জন্ম দিয়েই বিদায় বলে দিয়েছেন।

১৩তম চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার তিন দিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন জিদান। এর পর বিদায় নিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। টালমাটাল রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হয়ে এসেছেন লোপেতেগি। এমনিতেই জিদান তার উত্তরসূরিদের কাজ কঠিন করে ফেলেছেন টানা সাফল্য এনে দিয়ে। এর ওপর লোপেতেগি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রিয়ালের কোচ হয়েছেন সেটাও সৃষ্টি করছে বাড়তি চাপ। এখন লিগে পেরেজের কোচদের প্রথম মৌসুমে এমন হতাশাজনক পরিস্থিতি নিশ্চয় ভয় পাইয়ে দিচ্ছে লোপেতেগিকে।

লোপেতেগি কি পারবেন অভিশাপ কাটাতে?