প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক
‘আমার গোড়ালি ভেঙে গেলেও মেসি কার্ড পেত না’—আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার এমন কথা কি আসলেই বলেছিলেন
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার তারকা লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার আইসা মান্দির একটি মন্তব্য ঘুরছে; যেখানে দাবি করা হচ্ছে, আইসা মান্দি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের পর বলেছেন, ‘আমার গোড়ালি ভেঙে গেলেও মেসি কার্ড পেত না।’
এই দাবিকে কেন্দ্র করে অনলাইনভিত্তিক কিছু নিউজ পোর্টাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের একাধিক মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ ফটোকার্ড ও সংবাদ প্রকাশ করে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় ডেইলি স্পোর্টস নামের একটি অনলাইন স্পোর্টস পোর্টালকে।
কীভাবে ছড়াল দাবি
ভাইরাল দাবিটির মূল উৎস হিসেবে পাওয়া যায় ১৭ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ লিজিয়ঁ নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্টকে। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, আর্জেন্টিনা–আলজেরিয়া ম্যাচে একটি বিতর্কিত ট্যাকলের পর আইসা মান্দি ইনস্টাগ্রামে রেফারিদের সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন।
একই দিনে ডেইলি স্পোর্টসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যাচে লিওনেল মেসির একটি ফাউলের ঘটনায় রেফারি সাইমন মার্সিনিয়াক ভিএআর পর্যালোচনা করেও কোনো কার্ড দেননি। এরপর আলজেরিয়ার অধিনায়ক মান্দি ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘If I’d fractured my ankle last night, the guy who did it would've walked away with no card. Refs need to do better. The whole world is watching them.’ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘গত রাতে যদি আমার গোড়ালি ভেঙেও যেত, তবু যে খেলোয়াড় এটা করেছে, সে কোনো কার্ড পেত না। রেফারিদের আরও ভালো করতে হবে। পুরো বিশ্ব তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।’
লিংক: এখানে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক্স প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো লিংক:
এই ভাইরাল স্ক্রিনশট ও উদ্ধৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের একাধিক অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ সংবাদ ও ফটোকার্ড প্রকাশ করে। অনেক ক্ষেত্রে ডেইলি স্পোর্টসের প্রতিবেদনকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যদিও সেখানে মূল ইনস্টাগ্রাম পোস্ট বা কোনো ভেরিফায়েড সোর্স সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
ডেইলি স্পোর্টসের প্রতিবেদনের ভিত্তি
ডেইলি স্পোর্টসের প্রকাশিত প্রতিবেদনটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিকে ভিত্তি করে তৈরি। সেখানে লিজিয়ঁ নামের এক্স অ্যাকাউন্টটিকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিংক: এখানে
এক্সে ছড়ানো ওই পোস্টটি শুধু এই অ্যাকাউন্টে ৩৮ লাখের বেশিবার দেখা হয়, যা দাবিটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
তবে প্রতিবেদনে আইসা মান্দির ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম পোস্টের কোনো সরাসরি লিংক, আর্কাইভ বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে এটি মূল উৎসনির্ভর প্রতিবেদন নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক দাবির পুনঃপ্রচার হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
ডেইলি স্পোর্টস কী ধরনের মাধ্যম
পর্যালোচনায় দেখা যায়, Dailysports.net একটি আন্তর্জাতিক স্পোর্টস-ভিত্তিক অনলাইন নিউজ ও কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা বিভিন্ন খেলার খবর, বিশ্লেষণ ও ফিচার প্রকাশ করে থাকে। তবে এটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম নয় এবং প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখা যায়।
কী পাওয়া গেছে যাচাইয়ে
ভাইরাল স্ক্রিনশটের সত্যতা যাচাই করতে আইসা মান্দির ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দাবি করা কোনো পোস্ট বা স্টোরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
আইসা মান্দির ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রামের লিংক।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম, ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে তাঁর ওই মন্তব্যের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ এই দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন বা যাচাইকৃত উৎস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ম্যাচের সময়কার ঘটনা ও বিতর্ক
১৭ জুন বিশ্বকাপ ম্যাচটির প্রথমার্ধের প্রায় ৩১তম মিনিটে লিওনেল মেসি ও আইসা মান্দির মধ্যে একটি বল দখলের লড়াইয়ের সময় ট্যাকলের ঘটনা ঘটে। ওই মুহূর্তে মেসির স্টাডস (বুটের নিচের অংশ) মান্দির পায়ে লাগে।
রেফারি সাইমন মার্সিনিয়াকের ফাউলের বাঁশি বাজালেও কোনো কার্ড দেখাননি এবং ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একাংশ মনে করে, মেসির লাল কার্ড পাওয়া উচিত ছিল, অন্যদিকে অনেকে মনে করেন এটি লাল কার্ডের পর্যায়ে পড়ে না।
আসলে মান্দি কী বলেছিলেন
ভাইরাল স্ক্রিনশটের বিপরীতে ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে আইসা মান্দির যাচাইকৃত মন্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফিফার সঙ্গে আলাপে মান্দি বলেন, ‘পার্থক্য গড়ে দিয়েছে তাদের এমন একজন খেলোয়াড়, যে সুযোগ পেলেই গোল করে।’
মান্দি আরও বলেন, ‘সে হয়তো সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। তার খেলা অসাধারণ। আমরা জানতাম, সে কতটা বিপজ্জনক। তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হইনি।’
এদিকে আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ম্যাচের রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে ‘রেফারিংয়ে অবিচার’ হয়েছে বলে অভিযোগ করে ফেডারেশনটি।
লিংক: এখানে
অভিযোগের বিষয়টি সত্য হলেও মান্দি ব্যক্তিগতভাবে ‘আমার গোড়ালি ভেঙে গেলেও মেসি কার্ড পেত না’—এমন মন্তব্য করেছেন বলে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।