অর্থকষ্টে টেন্ডুলকারের বন্ধু, কাজ খুঁজছেন দ্বারে দ্বারে
তিনি শচীন টেন্ডুলকারের ছেলেবেলার বন্ধু, স্কুল ক্রিকেটে বিশ্ব রেকর্ড জুটির সঙ্গী—বিনোদ কাম্বলির এই পরিচয় এক পাশে সরিয়ে রাখুন। স্রেফ তাঁর খেলোয়াড়ি দিনগুলোর চেহারাটাই মনে করে দেখুন না!
গলায় সোনার হার, হাতে ব্রেসলেট আর কানে ঝুলতে থাকা গোলাকার দুল, হাসি হাসি মুখ…। বাইরে থেকে দেখে যাঁকে বেশ বিলাসী ও শৌখিন মনে হতো, সেই মানুষটিকে এখন প্রথম দেখায় চেনা ভার। মুখভর্তি শুভ্র দাড়ি আর মাথায় চাপানো সাদা-কালো হ্যাটের সঙ্গে যেন আজন্ম দুঃখমিশ্রিত মুখে অসহায়ত্বের চাহনি।
চোখের ভাষা যদি আসল পরিস্থিতি বোঝাতে না পারে, তাহলে হাতের ফোন কিছুটা আভাস দেবে—এক পাশ ভাঙা! একসময় পানশালায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া মানুষটিকে এখন আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিতেও ভাবতে হয়! এটুকু অপচয়ের সামর্থ্যও যে এখন নেই তাঁর!
এমনই কষ্টের দিনাতিপাত এখন ৫০ বছর বয়সী বিনোদ কাম্বলির। এ নিয়ে বিশেষ রাখঢাকের সুযোগও নেই তাঁর; ক্ষুধা পেটে আবার লজ্জা কিসের! ভারতের হয়ে ১৭টি টেস্ট ও ১০৪টি ওয়ানডে খেলা কাম্বলি তাই অর্থকষ্ট কাটিয়ে উঠতে কাজ খুঁজছেন সবার কাছে। তাঁর সকরুণ আকুতি গণমাধ্যমের সামনে, ‘আমি একটা কাজ চাই।’
কাম্বলি সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ২০০০ সালে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে গেছেন অবশ্য আরও ১১ বছর। বলা হয়, লাগামহীন জীবনযাপনই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়াটা দীর্ঘ হতে দেয়নি। ৫৪.২০ গড়ে ১০৮৪ রান করার পরও ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টটা খেলেছেন মাত্র ২৪ বছর বয়সে। ওয়ানডেতে ৩২.৫৯ গড়ে করেছেন ২৪৭৭ রান। আনুষ্ঠানিক অবসরের পর মনোযোগ দেন কোচিংয়ে।
কিন্তু জুত করতে পারেননি খুব একটা। এক সময় ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ভবিষ্যতের নায়ক’ তকমার পর যেভাবে ‘দ্য লস্ট হিরো’তে পরিণত হয়েছেন, তেমনি কোচিংয়েও পা পিছলেছেন। সর্বশেষ কোচিং করিয়েছেন ২০১৯ সালে, মুম্বাই টি-টোয়েন্টি লিগের একটি দলকে।
করোনার পর টুর্নামেন্টটি আর না হওয়ায় একরকম বেকার হয়ে আছেন এখন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসারজীবন চলছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড থেকে পাওয়া মাসিক ভাতায় ভর করে, ‘এখন আমি পুরোপুরি বিসিসিআইয়ের ওপর নির্ভরশীল। অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটার হিসেবে মাসে ৩০ হাজার রুপি করে দেয় ওরা। এটাই আয়ের একমাত্র উৎস। বোর্ডের বদান্যতায় পরিবার টিকে আছে। তাদের ওপর আমি কৃতজ্ঞ।’
ক্রিকেট বিশ্ব কাম্বলিকে প্রথম চেনে স্কুল ক্রিকেটে শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ৬৬৪ রানের বিশ্ব রেকর্ড জুটি গড়ার পর। যে জুটিতে কাম্বলি করেছিলেন অপরাজিত ৩৪৯ রান। ছেলেবেলার সেই বন্ধুও একবার কোচিংয়ের সুযোগ দিয়েছিলেন কাম্বলিকে। দায়িত্ব দিয়েছিলেন নেরুলে টেন্ডুলকার মিডলসেক্স গ্লোবাল ক্রিকেট একাডেমির তরুণদের শেখানোর।
তবে বান্দ্রা পশ্চিম আবাসিকে বসবাসরত কাম্বলি যাতায়াতের সমস্যার কারণে সেই চাকরিটা করতে পারেননি, ‘ওটা আমার বাসা থেকে বেশ দূরে। ভোর পাঁচটায় উঠে একটা ক্যাব নিয়ে চলে যেতাম। ফিরে এসে সন্ধ্যায় বিকেসি মাঠেও কোচিং করাতাম। সারা দিনে খুবই ধকল যেত।’ এখন তাঁর কাজ নেই কোথাও। কিছু একটা যদি জোটে—এই আশায় ঘুরঘুর করেন মুম্বাই ক্রিকেট একাডেমি প্রাঙ্গণে।
মঙ্গলবার সেই একাডেমির কফিশপেই তাঁর সঙ্গে কথা হয় ভারতীয় দৈনিক মিড ডের। সংবাদমাধ্যমটির কাছে নিজের অসহায়ত্ব আর কাজের আকুতি জানিয়ে কাম্বলি বলেন, ‘আমি কাজ চাই। তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। আমাকে কাজে লাগালেই আমি করব। আমি মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কাছে কাজ চেয়েছিলাম। ওরা আমাকে ক্রিকেট ইমপ্রুভমেন্ট কমিটিতে রেখেছে, তবে এটা আসলে সাম্মানিক পদ। আমি অন্য ধরনের কাজ চেয়েছি, যাতে পরিবার চালাতে পারি। বলেছি, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম হোক বা বিকেসি (বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্স গ্রাউন্ড), আমাকে কাজ দিন।’
কাম্বলিকে নিয়ে একটা বদনাম আশপাশে শোনা যায়, এখনো পানশালায় গিয়ে মাতাল হয়ে থাকেন বলে তাঁকে কাজ দেওয়া হয় না। অভিযোগ অস্বীকারই করেছেন ওয়ানডেতে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে জন্মদিনে সেঞ্চুরি করা সাবেক এই বাঁহাতি। তবে ‘যা রটেছে’ তার সত্যতার আভাস আছে তাঁর জবাবে, ‘যদি এমন কোনো নিয়মকানুন থাকে যে কাজ করতে হলে ড্রিংক করা যাবে না, আমি সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দেব, কোনো সমস্যা নেই।’
একটা কাজ পাওয়ার জন্য নিজের প্রাত্যহিক অভ্যাস বদলাতেও যখন মরিয়া, তখন কী বন্ধু শচীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভালো হতো না? শচীন কি জানেন কাম্বলির এই দুরবস্থার কথা? কাম্বলির উত্তর, ‘সে সবই জানে। তবে ওর কাছ থেকে আমি কিছু আশা করি না। সে আমাকে তার একাডেমিতে কাজ দিয়েছিল। ওতেই আমি আনন্দিত ছিলাম। সে আমার ভালো বন্ধু। সব সময় আমার পাশেই আছে।’