ক্রীড়া সংগঠক এম এ লতিফ আর নেই
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শোকের ছায়া যেন দীর্ঘ হচ্ছে। গত রোববার ভোরে অনন্তলোকে পাড়ি জমান ষাটের দশকের নামী ফুটবলার ও ভলিবল খেলোয়াড় মোস্তফা কামাল। সেই দুঃখের মধ্যেই গত সোমবার আরেকটি দুঃসংবাদ—চলে গেলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল ও হকি দলের কিংবদন্তি গোলকিপার রণজিৎ দাস। মৃত্যুর মিছিলে আজ যুক্ত হলো আরও একটি নাম। দেশের বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও প্রশাসক লে. কর্নেল (অব.) এম এ লতিফ খান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার বদলের পর ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন ফেডারেশনে সংস্কারের অংশ হিসেবে তাঁকে বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন এম এ লতিফ।
বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ কুদ্দুস খান জানিয়েছেন, ‘কিছুদিন আগে নওগাঁয় নিজের বাড়িতে স্যার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বগুড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১০-১২ দিন আগে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়।’
এম এ লতিফের মরদেহ বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে রাখা আছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বারিধারায় জানাযা হওয়ার কথা।
একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে এম এ লতিফের সুখ্যাতি ছিল। ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময় বিভিন্ন বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, পরবর্তী জীবনে আন্তর্জাতিক বক্সিং রেফারি ও জাজ হিসেবে পেয়েছেন সেরার স্বীকৃতি।
লে. কর্নেল এম এ লতিফ ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য থাকাকালে বিভিন্ন সময় তিনি গেম ডেভেলপমেন্ট, শৃঙ্খলা এবং টেন্ডার ও পারচেজ কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
এম এ লতিফ ম্যানেজার থাকাকালে জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার। তাঁকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতি হাতড়ে হাবিবুল বলেন, ‘ওই সময় আমাদের দলটাকে সুশৃঙ্খল করতে কোচ ডেভ হোয়াটমোরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন লতিফ ভাই। ম্যানেজার হিসেবে তাঁর প্রতি দলের সবারই একটা শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় কাজ করত। খুব সুশৃঙ্খল ও এককথার মানুষ ছিলেন। তাঁর দেশপ্রেম ছিল অসাধারণ।’
প্রয়াত এম এ লতিফের দেশপ্রেমের দুটি উদাহরণও দিলেন হাবিবুল, ‘২০০৩ সালে পাকিস্তান সফরে অলকের ক্যাচ নিয়ে রশীদ লতিফের ঘটনাটার জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন ম্যানেজার লতিফ ভাই। তাঁর শক্ত অবস্থানের কারণেই ঘটনাটা অত দূর গিয়েছিল এবং রশীদ লতিফকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল।’
অন্য উদাহরণটি সে বছরেরই অস্ট্রেলিয়া সফরের। ওই সফরে তখন নবীন এক আম্পায়ার বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমে সেটি দেখে ম্যাচ রেফারি মাইক প্রক্টরের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানান বাংলাদেশ দলের এম এ লতিফ। হাবিবুল বলেন, ‘ম্যাচ রেফারি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং আমাদের বলেন, “ওর (আম্পায়ার) ক্যারিয়ার মাত্রই শুরু হয়েছে। ও একটা ভুল করেছে। এখন তোমাদের ওপর ওর ভবিষ্যত নির্ভর করছে।” পরে ওই আম্পায়ার আমাদের কাছে এসে তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে গিয়েছিলেন।’
এম এ লতিফের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বক্সিং ফেডারেশন।