এক খ্যাপাটে খেলোয়াড়ের গল্প

মিউরেল গোমেজ। সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে l ছবি: শামসুল হক
মিউরেল গোমেজ। সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে l ছবি: শামসুল হক

মাঠের প্রতি অদ্ভুত রকমের খ্যাপাটে ভালোবাসা মিউরেল গোমেজের। খেলার মাঠ সারাক্ষণ টানে। নইলে কি আর জীবনের সোনালি দিনগুলো মাঠেই কাটিয়ে দেন!

কোনো একটা নির্দিষ্ট খেলার পরিচয়ে আটকে থাকেননি গোমেজ। অ্যাথলেটিকস দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। ডিসকাস থ্রো, শটপুট, হাইজাম্প, লংজাম্প, ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট—প্রতিটি ইভেন্টে রয়েছে একাধিক পদক। জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিকসে জিতেছেন ৪০টি সোনা। খেলেছেন ভলিবল, কাবাডি, ফুটবল, হ্যান্ডবল, হকি, বাস্কেটবল ও ক্রিকেট। পদকে ভরে উঠেছে শোকেস। কিন্তু জোটেনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার! জীবিকার জন্য এই বয়সেও কোচিং করাচ্ছেন, বিভিন্ন স্কুলে করতে হচ্ছে খণ্ডকালীন ক্রীড়া শিক্ষকতার কাজ। ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনের এক তুখোড় খেলোয়াড়ের নাম মিউরেল গোমেজ।

বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। কিন্তু দিব্যি কিশোরীদের মতোই চরে বেড়ান রাজধানীর অলিগলি। পায়ে কেডস, পরনে ট্র্যাকস্যুট, গায়ে জার্সি, মাথায় ক্যাপ। সাইকেল চালিয়ে চলে যান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে, ধানমন্ডির সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে।

নবাবগঞ্জের বড়গোল্লা গ্রামে জন্ম মিউরেল গোমেজের। বাবা ডমিনিক গোমেজকে হারিয়েছেন ছোটবেলায়। মা নিমফা গোমেজ মারা যান স্বাধীনতার পরই। ছোটবেলায় দুরন্তপনায় জুড়ি মেলা ভার ছিল গোমেজের। দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, নদীর ঘাটে স্লিপারের খেলা, ডাইভ দেওয়াসহ নানা খেলাধুলায় মেতে থাকতেন কাকাতো ভাইদের সঙ্গে। তাঁর এই দুরন্তপনা চোখে পড়ে প্রধান শিক্ষিকা মাদার এলিজিয়ার। তিনিই ঢাকায় নিয়ে আসেন গোমেজকে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থানা পর্যায়ের অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ২০০ মিটারে ও লংজাম্পে সোনা জেতেন নবাবগঞ্জে।

১৯৭৭ সালে ফিজিক্যাল কলেজে ক্রীড়াশিক্ষার ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। কলেজের শিক্ষক প্রয়াত কাজী আবদুল আলীম উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগাতেন তাঁকে। এত দিন পরও তাই গোমেজের মুখ কৃতজ্ঞতায় আনত, ‘আমার জীবনের দর্শনই বদলে দেন স্যার।’

গোমেজ ভলিবল খেলেন ঢাকা বিভাগের হয়ে। ১৯৭৮ সালে কাবাডি খেলা শুরু। রংপুরে গিয়ে জাতীয় মহিলা কাবাডিতে হন সেরা। হ্যান্ডবলের প্রথম মহিলা দলের খেলোয়াড় গোমেজ। ১৯৮৬ এশিয়ান মহিলা কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে কলকাতায় গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা হকি দলের সদস্যও তিনি। ১৯৭৯-৮৩ পর্যন্ত হকিতে একচেটিয়া ঢাকাকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় অবদান ছিল গোমেজের। ১৯৮৯ সালে হ্যান্ডবল খেলতে গিয়ে পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তবে অস্ত্রোপচারের পর আবারও মাঠে ফেরেন। বাস্কেটবলে ১৯৯৯ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মেরিনার্স দলের সদস্য। ২০০২ সালে অবসরে যান গোমেজ।

এত এত পদক জিতলেও আজ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের কোনো পুরস্কার জোটেনি। আক্ষেপটা গোপন করলেন না। বললেন, ‘খেলাধুলার জন্য এত কষ্ট করেও কিছু পাইনি। কিন্তু এটুকু ভেবে সন্তুষ্ট যে খেলার মধ্যেই আছি। মাঠে এলে কষ্টগুলো ভুলে যাই।’

বিয়ে করেননি। একা থাকেন বলে মোটেও খারাপ লাগে না তাঁর, ‘ভালোই হয়েছে, বিয়ে করলে পুরোপুরি সংসারী হয়ে যেতাম। খেলাধুলায় বাধা পড়ত।’

বর্তমানে খণ্ডকালীন ক্রীড়া শিক্ষকতা করছেন গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, হলিক্রস, সামারফিল্ড, সেন্টপল মিশন স্কুলে। সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে শারীরিক কসরত ও যোগব্যায়ামও করান মেয়েদের।

সময়টা ছিল সত্তরের দশক। চাইলেই মেয়েরা বাড়ির বাইরে এসে খেলাধুলা করতে পারত না। তারপরও সমাজের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে এত দূর এসেছেন গোমেজ। সবচেয়ে বড় কথা, লড়াই করে টিকে রয়েছেন। স্বাবলম্বী হয়ে পথ চলছেন।

গোমেজের জীবনের আনন্দ-বেদনার কাব্য খেলার মাঠ ঘিরেই। খেলাধুলাকে ভালোবেসে বাকি জীবনটাও কাটিয়ে দিতে চান। খেলাপাগল বাঙালি মেয়েদের জন্য গোমেজ যেন উজ্জ্বল এক বাতিঘর।