বিজ্ঞাপন

জাপানের দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাকসিমোভিচ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি রাইফেল ছুঁতে পারি না। শুধু পরিকল্পনাটা বলতে পারি। সর্বোচ্চ কীভাবে দাঁড়াতে হবে, সেটা দেখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু ট্রিগার চেপে কিছু করা শেখানো কিংবা এ ধরনের কিছু করতে পারি না।’

২৩ জুলাই পর্দা উঠবে টোকিও অলিম্পিকের। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’খ্যাত অলিম্পিকের শুটিংয়ে ছয় স্বর্ণপদকজয়ী জাপান এবার নিজেদের আঙিনায় আরও ভালো করতে চায়। কিন্তু কোচকে অস্ত্র ছুঁতে না দেওয়ার বিধিনিষেধ কোনোভাবেই এই চাওয়ার পক্ষে কথা বলে না। বরং পাল্টা একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে, জাপানের শুটিং দল এভাবে টোকিং অলিম্পিকে সাফল্য পাবে?

default-image

অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া তো দূরের কথা, অস্ত্র ছুঁতে পর্যন্ত পারবেন না, মাকসিমোভিচ এ বিষয় জেনেছেন জাপানে পা রাখার পর। সিউলে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে স্বর্ণপদকজয়ী এই কোচের ভাষ্য, ‘শুরুতে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। কোচদের জন্য এটা খুব কঠিন হয়ে যায়। কারণ, কখনো কখনো (অস্ত্রের) ট্রিগার পরীক্ষা করতে হয়, ট্রিগারের ওজন ঠিক আছে কি না, দেখতে হয় কিংবা (অস্ত্রের) কোনো কোনো অংশ ঠিক করে দিতে শুটারকে সাহায্য করতে হয়।’

মাকসিমোভিচের সমস্যাটা খুবই স্বাভাবিক। যে খেলা শেখাবেন, সেই খেলার সরঞ্জাম ছুঁতে না পারলে শেখাবেন কীভাবে?

সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জাপানে মাত্র ৫০০ জনকে এয়ার পিস্তলের মালিক হওয়ার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র আইনের অধীন শত বছরের বেশি সময় ধরে দেশটিতে অস্ত্রধারীর সংখ্যা এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে কড়া অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরোপ করা দেশগুলোর একটি জাপান। ১২৫ মিলিয়ন জনবসতির এই দেশে প্রতিবছর অস্ত্রের কারণে মৃত্যুসংখ্যা এক অঙ্কেই থেকেছে। জাপানের নাগরিকদের জন্যই অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া অনেক কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া।

default-image

সবার আগে শুটিং অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদন লাগবে এবং তারপর যেতে হবে কঠোর পুলিশি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। মাকসিমোভিচের মতো বিদেশি হলে তো কথাই নেই, শুধু এটুকু জেনে রাখুন, স্থানীয় এক সহকারীর উপস্থিতিতে তাঁকে কোচিং করাতে হয়। তবে মাকসিমোভিচের জন্য খানিকটা আশার আলো আছে।

অলিম্পিক চলাকালীন অস্ত্রের ‘ছোটখাটো সমস্যা’ ঠিক করে দিতে পারবেন কোচরা, সে ক্ষেত্রে শুটারকে অবশ্যই অস্ত্রটি হাতে ধরে রাখতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের আইনের অধীন টেকনিক্যাল অফিশিয়ালরা যেন অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে পারেন, আইন শিথিলের মাধ্যমে অন্তত এটুকু করা হয়েছে।

তবে প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল। জাপানের জাতীয় রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কিচিরো মাতসুমারু এএফপিকে বলেন, ‘বাইরের দলগুলো এখানে এসে যেন কোনো সমস্যায় না পড়ে, সে জন্য আমরা সরকার ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি।’

কিন্তু মাতসুমারুর শঙ্কা, সরকারের সঙ্গে কথা বলে রাখার পরও দলগুলো সমস্যায় পড়তে পারে এবং অভিযোগও জানাতে পারে। সমস্যা আরও আছে। জাপানে কোনো শুটার একবারে সর্বোচ্চ ৮০০ রাউন্ড গোলাবারুদ পেয়ে থাকেন। অতীতের যেকোনো অলিম্পিক কিংবা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এর চেয়ে বেশি গোলাবারুদ পেয়েছেন শুটাররা।

default-image

সমাধানের অন্য পথ আছে, কিন্তু সেটাও জটিল প্রক্রিয়া। স্বীকৃত ঠিকাদারের মাধ্যমে গোলাবারুদ জাপানে নিয়ে আসতে পারবেন শুটার, কিন্তু সেসব রাখতে হবে ভেন্যুর বাইরে। ফুরিয়ে গেলে সেখান থেকে আনা-নেওয়া করা যাবে। অলিম্পিক শুটিং রেঞ্জে গোলাবারুদ কিনতে পাওয়া যাবে।

কিন্তু সেটি অনেকটাই ‘ঠেকা কাজ চালানো’র মতো, যে বুলেট দিয়ে এত দিন অনুশীলন করেছেন, সেখানে তা না–ও পাওয়া যেতে পারে। যা পাবেন, সেটা দিয়েই কাজ চালাতে হবে।

ভারতের রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী অজয় সিং অবশ্য জানিয়েছেন, শুটারদের কোনো সমস্যাই হচ্ছে না, ‘গোলাবারুদগুলো খুব ভালো। সবকিছু ঠিকই আছে।’

শুটিংয়ের দলগুলোকে ১৬ পৃষ্ঠার ‘অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন’ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাপানকে শুটিংয়ে উদীয়মান দেশ ধরা হলেও সেখানে এয়ারগান ব্যবহার করতে খুদেদের অন্তত ১০ বছর বয়সী হতে হয়।

default-image

তবে কম বয়সীদের শুটিংয়ে নিয়ে আসার সমস্যাটা জানালেন মাতসুমারু, ‘একটি বাচ্চাকে অনুমতি দেওয়ার আগে একজন গোয়েন্দা সেই বাচ্চার এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর নেবেন তার ব্যাপারে। এরপর প্রতিবেশীরা সেই বাচ্চার মা–বাবাকে গিয়ে বলবেন, গোয়েন্দা এসে বাচ্চাটার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। এরপরই বাচ্চাকে রাইফেল ক্লাব ছাড়তে বলে দেন বাবা-মায়েরা। এটা খুবই কঠোর আইন।’

এই আইন শিথিল করতে হলে টোকিও অলিম্পিকে জাপানকে ভালো করতে হবে। মাতসুমারু সে কথাই বললেন, ‘জাপানিরা শুটিং স্পোর্টসের সঙ্গে তেমন একটা পরিচিত নয়। তাই অলিম্পিকে জাপান ভালো করলে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে।’

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন