বাংলাদেশে রেটিংধারী দাবাড়ু এখন ১৯৬৬ জন। অন্যদিকে ভারতে সংখ্যাটা ৩০ হাজারের বেশি। ভারতে ২৪০০ রেটিংধারী দাবাড়ু কয়েক শ। বাংলাদেশে ২৪০০ রেটিংধারী এক–দুজন।

মূল সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত খেতাবধারীর অভাব। গত চার–পাঁচ বছরে ফিদে মাস্টার হয়েছেন মাত্র দুজন, গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার ও সুব্রত বিশ্বাস। দেশে ফিদে মাস্টারের সংখ্যা এখন ১৫। খেলায় সক্রিয় তাহসিন, সুব্রত বিশ্বাস, মেহেদি হাসান পরাগ, দেবরাজ চ্যাটার্জিসহ পাঁচ–ছয়জন। ফিদে মাস্টার তাহমিদুর রহমান, জামিলুর রহমান, ইউসুফ হাসান, রেজাউল হক, সাইফুদ্দিন লাভলুরা অনেক বছর ধরেই খেলার বাইরে। কয়েকজনের বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে।

ফিদে মাস্টারের পরের ধাপ আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) ভারতে আছেন ১৩০ জন, বাংলাদেশে মাত্র ৪। এত কম আইএম দেখে হতাশ গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব বলেন, ‘আমাদের পাইপলাইনে দাবাড়ু সেভাবে আসছে না। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ খুব কম। আমরা নিজেদের মধ্যেই বেশি খেলি। আর খেলি ভারতে। আমাদের ইউরোপে যেতেই হবে। নইলে প্রত্যাশিত জায়গায় যেতে পারব না।’

ভারতের তরুণেরা লম্বা সময় ইউরোপে পড়ে থাকেন নর্ম করার আশায়। বাংলাদেশের দাবাড়ুদের কাছে সেটা যেন স্বপ্ন। ফিদে মাস্টার শেখ নাসির ২০১৭ সালে স্পেন গিয়ে একটা আইএম নর্ম করেন। ২০২০ সালে রাজীব জার্মানিতে খেলতে গিয়ে করোনায় আটকা পড়েছিলেন। এ ছাড়া আর কারও ইউরোপে যাওয়া হয়নি গত পাঁচ বছরে। বড় বাধা অর্থাভাব। ফেডারেশনও পারে না নিয়মিত জিএম টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে। ২০২১ সালে তিনটি জিএম টুর্নামেন্ট হয়েছে, গত বছর একটিও না। ভারতীয় দাবাড়ুদের পৃষ্ঠপোষকের অভাব নেই। দেশটির বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে খেলোয়াড় কোটা আছে। বাংলাদেশে সেটাও নেই। বাংলাদেশে ২০১৩–১৫ পর্যন্ত ৯ জন দাবাড়ুকে চাকরি দিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। আর কোনো প্রতিষ্ঠান দাবাড়ুদের জন্য কিছু করেনি।

এমন অপর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধার মধ্যেই নিজেদের চেষ্টায় ফাহাদ, সুব্রত, তাহসিন, মনন রেজারা বেরিয়ে আসছেন। নওশিন আনজুম, ওয়ালিজা আহমেদ, ওয়ারিশা খুশবু, জান্নাতুলসহ কয়েকজন তরুণীও ভালো করছেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক পাচ্ছেন না কেউ।

দাবা ফেডারেশন সরকারের কাছ থেকে বছরে পায় ১১-১২ লাখ টাকা। ফেডারেশনের স্টাফদের মাসিক বেতনই ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অন্য সব খরচসহ ফেডারেশনের বছরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ই ১৭-১৮ লাখ টাকা। গত চারটি অলিম্পিয়াডে যেতে কোটি টাকার ওপর লেগেছে তাদের। এ সময় সরকার একবার দিয়েছে ৫ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২ লাখ টাকা দিয়েছেন অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। সরকার অবশ্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তৃতীয় তলায় দাবা ফেডারেশনের অফিসের ফ্লোরেই খেলোয়াড়দের থাকার জন্য চারটি বাড়তি রুম দিয়েছে ফেডারেশনকে।

এমন অপর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধার মধ্যেই নিজেদের চেষ্টায় ফাহাদ, সুব্রত, তাহসিন, মনন রেজারা বেরিয়ে আসছেন। নওশিন আনজুম, ওয়ালিজা আহমেদ, ওয়ারিশা খুশবু, জান্নাতুলসহ কয়েকজন তরুণীও ভালো করছেন। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক পাচ্ছেন না কেউ। দাবা ফেডারেশন পৃষ্ঠপোষক পেলেও ব্যক্তিগতভাবে খেলোয়াড়দের পাশে কেউ দাঁড়াচ্ছে না। আগে অনেকে ভারতে খেলতে যেতেন নিজ খরচে। সেটাও কমে গেছে এখন। গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান এখানেই বড় ঘাটতি দেখেন, ‘দেশের বাইরে গিয়ে খেলা অনেক খরচের ব্যাপার। বাচ্চাদের আবার অভিভাবকসহ যেতে হয়। বেশির ভাগই এত খরচ বহন করতে পারে না।’

বাংলাদেশ বিমান আগে বিমানের টিকিট দিত দাবাড়ুদের। সেটাও নেই অনেক বছর। ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্স গ্র্যান্ডমাস্টার দাবা হয় না। বেসরকারি উদ্যোগের লিওনাইন চেস টুর্নামেন্টও অনিয়মিত। সাবেক দাবাড়ু মাহমুদা চৌধুরী একাডেমি খুলে শিশু–কিশোরদের দাবা শেখাচ্ছেন। সে কারণেই উঠতি দাবাড়ুদের সরবরাহ এখনো কিছুটা আছে।

দাবায় সুবাতাস কখন আসবে আপনি জানেন না। কিন্তু দরজাটা খোলা রাখতে হবে। দাবাড়ু তৈরির উদ্যোগ চালু রাখা জরুরি।
আবদুল্লাহ আল রাকিব, গ্র্যান্ডমাস্টার, বাংলাদেশ

২০০৯ সালে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদে মোকাদ্দেস হোসেনকে মানতে না পেরে আবদুল্লাহ আল রাকিব, এনামুল হোসেন রাজীবসহ অনেকেই খেলা থেকে নির্বাসনে যান। দাবার সম্ভাবনার রেলগাড়িটা তখনই লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে সেটি কিছুটা উঠে দাঁড়িয়েছে, দাবায় অর্থপ্রবাহও বেড়েছে। বড় পরিসরে স্কুল ও জেলা লিগ হচ্ছে। কিন্তু খেতাবধারী দাবাড়ু সেভাবে আসছে না। এর কারণ হিসেবে দাবার আন্তর্জাতিক বিচারক হারুনুর রশিদ বলছেন, ‘নিয়াজ–জিয়ারা দাবায় অনেক সময় দিতে পেরেছে। কিন্তু এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা এমন যে ছেলেমেয়েদের ১৪–১৫ ঘণ্টা পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। সে খেলবে কখন?’

গ্র্যান্ডমাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিবও তা মানছেন। তাঁর মতে, আগে দরকার খেলোয়াড় তৈরি করা, ‘দাবায় সুবাতাস কখন আসবে আপনি জানেন না। কিন্তু দরজাটা খোলা রাখতে হবে। দাবাড়ু তৈরির উদ্যোগ চালু রাখা জরুরি।’

উদ্যোগটা নিতে হবে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনকেই। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম সেই প্রতিশ্রুতিই দিলেন, ‘বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা তিন–চারজন গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়ে যাব আশা করি।’

সত্যিই তা পাওয়া যাবে কি না, সময়ই দেবে সে উত্তর।

নারী গ্র্যান্ডমাস্টার নেই আজও

সেই ১৯৮৫ সালে রানী হামিদ বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার হয়েছেন, ৩৭ বছর পার হলেও গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারেননি তিনি। শামীমা আক্তার আন্তর্জাতিক মাস্টার হন ২০১১ সালে, শারমিন শিরিন ২০১৯ সালে। কিন্তু তাঁরাও আটকে আছেন একই বৃত্তে।

পর্যাপ্ত টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ নেই। রানী হামিদের আক্ষেপ, ‘আমি অনেকবার নর্মের সম্ভাবনা তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত পারিনি। একটা আফসোস তো আমার রয়েই গেছে।’