হকিতে কোটি টাকার ক্যাম্প, কোচিং প্যানেলে দুই সাবেক অধিনায়ক
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে জমছে ছায়া। অথচ আমিরুল ইসলাম, ওবায়দুল হোসেন, পুষ্কর খীসা মিমোদের দৌড় থামছে না। দ্রুত পাস, বল কেড়ে নেওয়া, আক্রমণে ওঠা, গোলের মহড়া—শেষ বিকেল পর্যন্ত থামেনি তাঁদের প্রস্তুতি।
এই প্রস্তুতির পরের গন্তব্য জার্মানি। আর জার্মানির পর জাপান। গতকালই জার্মানির উদ্দেশে উড়াল দেওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ হকি দলের। কিন্তু ভিসা জটিলতায় সেটা আর হয়নি। ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, দুই-তিন দিনের মধ্যে জটিলতা কেটে গেলে জার্মানির উদ্দেশে রওনা দেবে দল।
জার্মানিতে প্রায় এক মাসের কন্ডিশনিং ক্যাম্প করবে দল। সেখানে অনুশীলনের পাশাপাশি জার্মানির শীর্ষ ও দ্বিতীয় সারির একাধিক ক্লাবের বিপক্ষে খেলবে ১৬টি ম্যাচ। এশিয়ান গেমসের আগে নিজেদের যতটা সম্ভব শাণিয়ে নেওয়ার এই প্রস্তুতিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
এক মাসের ক্যাম্প, ১৬টি ম্যাচ আর বিদেশ সফর—হিসাবটা কাগজে এতটুকুই। কিন্তু আমিরুলদের কাছে জার্মানি সফর নিজেদের সীমা, আন্তর্জাতিক হকির গতি ও ঘাটতিগুলো বোঝারও সুযোগ।
আমিরুলের কথাতেও উঠে এসেছে সেই লক্ষ্য, ‘আসলে জার্মানিতে বিভিন্ন ক্লাবের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর বুঝতে পারব, আমরা কোথায় আছি। আমাদের লক্ষ্য শীর্ষ ছয়ে থাকা। এই লক্ষ্যটা পূরণের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণও দরকার।’
ওবায়দুলের কাছে জার্মানি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ম্যাচ খেলার সুযোগ, ‘অনুশীলন থেকে অনেক কিছু শেখা যায়, কিন্তু ম্যাচের চাপ আলাদা। সেখানে টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ পাব। গতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে এই ম্যাচগুলো আমাদের অনেক বেশি পরিণত করবে।’
জাতীয় দলে মিমোর অভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিনের। তিনি জানেন, বড় মঞ্চে ভালো করতে হলে প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই, ‘এশিয়ান গেমসে আমাদের সামনে শক্তিশালী দল থাকবে। তাই শুধু দেশে অনুশীলন করলেই হবে না। জার্মানিতে ভালো মানের প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে পারলে নিজেদের ভুলগুলো আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পারব। যে অভিজ্ঞতা জাপানেও কাজে লাগবে।’
পিটার গেরহার্ডের চোখে ইউরোপে নিয়মিত ক্যাম্প ও ম্যাচ খেলা বাংলাদেশের হকির উন্নতির দীর্ঘমেয়াদি পথ। জার্মানিতে আগে ক্যাম্প করা রাকিবুল হাসান, আশরাফুল ইসলাম ও রেজাউল করিমের খেলায় দৃশ্যমান উন্নতিও দেখেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার উদাহরণ দিয়ে গেরহার্ড বোঝান, পরিবর্তন এক দিনে আসে না। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে সোনা জয়ের আগে আর্জেন্টিনা চার বছর ধরে ইউরোপে নিয়মিত প্রস্তুতি ও ম্যাচ খেলেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি, ‘আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো বিশ্বমানের দলগুলো বছরের পর বছর ইউরোপে থেকে অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার সুযোগ কাজে লাগিয়েই নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে।’
বাংলাদেশের জন্য ইউরোপ সফরের ব্যবস্থা করতে গিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও বলেন গেরহার্ড, ‘এর আগে দুইবার বাংলাদেশের ইউরোপ সফরের আয়োজন করেছি আমি, কোনো পেমেন্ট ছাড়াই! আর তারা আমাকে বলল, ইউরোপ ভ্রমণ নাকি কোনো কাজের নয়! তারা এসব বুঝতেই চায় না।’
গেরহার্ডের কাছে ইউরোপ সফর ভ্রমণ নয়। উন্নত অনুশীলন সুবিধা, নিয়মিত ম্যাচ, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ও প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে নিজেদের মেলানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের হকিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
এবার সেই পথেই পা রাখছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে কোচিং প্যানেলেও যুক্ত হয়েছে নতুন নাম। সাবেক তারকা খেলোয়াড় মামুনুর রহমান চয়ন পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট এবং ইমরান হাসান পিন্টু ভিডিও অ্যানালিস্টের দায়িত্ব পেয়েছেন। আজ নিয়োগ পাওয়ার পরই দলের সঙ্গে কাজ করেছেন দুজন।
সব মিলিয়ে জার্মানির এই এক মাস শুধু একটি কন্ডিশনিং ক্যাম্প নয়। ১৬টি ম্যাচও শুধু ম্যাচ খেলার সংখ্যা নয়। প্রতিটি অনুশীলন ও প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা।
আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত হবে এবারের এশিয়ান গেমস। ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একই গ্রুপে বাংলাদেশ। শীর্ষ ছয়ে থাকাই দলের লক্ষ্য। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পুরুষ হকি দলের সেরা সাফল্যও ষষ্ঠ স্থান—১৯৭৮ সালের ব্যাংকক ও ২০১৮ সালের জাকার্তা-পালেমবাং আসরে।