চুরি হয়নি অদম্য স্বপ্ন, ৮৪ বছর বয়সেও ভারোত্তোলনে জীবন উৎসর্গ মজিবুরের

৮৪ বছর বয়সী ভারোত্তোলক মজিবুর রহমানছবি: মজিবুর রহমানের সৌজন্যে

গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগরে পিচঢালা মূল রাস্তার পাশে ৪ নম্বর ব্লকে এক চিলতে টিনের ঘর। জীর্ণ মেঝের ওপর টিনের বেড়া টানা ২৫ ফুট বাই ১৬ ফুটের সেই ছোট্ট ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অভাবনীয় কর্মযজ্ঞ। সম্প্রতি ঘরের ভাঙাচোরা বেড়ার ফাঁকফোকর গলে চোর এসে ভারোত্তোলনের চারটি লক, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াইফাই রাউটার নিয়ে গেছে। তবে ৮৪ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমানের অদম্য স্বপ্ন ও আত্মত্যাগকে স্পর্শ করার সাধ্য চোরের হয়নি। বয়সের ভারে যেখানে মানুষের জীবনের গতি কমে আসে, সেখানে এই বয়সেও তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে লোহার বারবেল তোলেন।

২০২২ সালের মার্চে প্রথম আলোর অনলাইনে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছিল, ‘৮০ পেরিয়েও ভারোত্তোলনেই জীবন উৎসর্গ মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান’। তখন তাঁর প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ছিল টঙ্গীর এরশাদনগরে আদর্শ ছাত্র কল্যাণ সমিতির পুকুরপাড়ের এক ভাড়া করা স্যাঁতসেঁতে ঘরে। পুরোনো জিমনেসিয়ামের ২০০ গজ দূরে এখন তাঁর নতুন ঠিকানা। জায়গা বদলালেও বদলাননি মজিবুর রহমান। ৬২ বছর ধরে দেশের ভারোত্তোলনে তিনি যেমন এক খেলাপাগল মানুষ, তেমনই মানবসেবায় অনন্য।

প্রশিক্ষণকেন্দ্রের চিত্র

১৯৮৮ সালে টঙ্গীর এরশাদনগর বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রথম ‘ভাইবন্ধু’ নামে এবং ২০০৫ সালে ‘এরশাদনগর ভারোত্তোলন ও শরীরচর্চা ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন মজিবুর রহমান। বছর চারেক আগে তিনি গড়ে তোলেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ভারোত্তোলন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। সরকারি খাস জায়গায় নির্মিত এই ঘরের জন্য কোনো ভাড়া দিতে হয় না। স্থানীয় কাউন্সিলের সহায়তায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ঘরটি করে দিয়েছিলেন।

টঙ্গীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ভারোত্তোলন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
প্রথম আলো

প্রথমে ওপরে ত্রিপল টাঙিয়ে প্রশিক্ষণ চলত, কিন্তু বাতাসে ত্রিপল উড়ে যেত বলে পরে জেলা প্রশাসকের দেওয়া টিন দিয়ে ছাদ ও বেড়া দেওয়া হয়। তবে পুরোনো টিনের বেড়া ভেঙে যাওয়ায় সম্প্রতি সেখানে চুরি হয়।

গত মঙ্গলবার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আগের কেন্দ্রের মতো দেওয়ালজুড়ে মজিবুর রহমানের ছবি নেই। জায়গা কম, তার ওপর বৃষ্টি হলে ভেতরে পানি ঢোকে এবং অনুশীলনে সমস্যা হয়। কিছু ট্রফি আলমারির ওপর শোভা পাচ্ছে।

বর্তমানে এলাকার ২১ জন শিক্ষার্থী এখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, যার মধ্যে ৫ জন ছেলে এবং ১৬ জন মেয়ে। সকালে ও বিকেলে চলে অনুশীলন। মঙ্গলবার বিকেলে জনাদশেক প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। তাঁদেরই একজন, জাতীয় ভারোত্তোলনে ৬৯ কেজিতে সোনা জেতা শায়েলা আক্তার বলেন, ‘এই ভারোত্তোলন কেন্দ্রটি আমাদের বাড়ির মতো হয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন

অগণিত সাফল্য ও জীবন বদলের গল্প

ক্ষুদ্র এই ক্লাবটির ঝুলিতে রয়েছে অনেক সাফল্য। জাতীয় ক্লাবভিত্তিক জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব-১৭ ও ২০ মিলিয়ে মোট ১১ বার চ্যাম্পিয়ন ও ৪ বার রানার্সআপ হয়েছে ক্লাবটি। জাতীয় সিনিয়র প্রতিযোগিতায় হয়েছে ৩ বার রানার্সআপ।

মজিবুর রহমানের হাত ধরে অনুশীলন করে এ পর্যন্ত ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, আনসার ও কারারক্ষী বাহিনীতে চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর ছাত্র খোরশেদ আলম জিমনেসিয়ামে বসে বললেন, ‘স্যারের কারণে এলাকার অনেক ছেলেমেয়ের জীবন বদলে গেছে।’

৮৪ বছর বয়সেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে

গত বছর কাতারের দোহায় এশিয়া মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় ৮৩ বছর বয়সে ৭০ কেজি বিভাগে অংশ নিয়ে সোনা জেতেন তিনি
সৌজন্য ছবি

খেলোয়াড়ি জীবনে ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান গেমসে ভারোত্তোলনে ব্রোঞ্জ জেতেন মজিবুর রহমান। ১৯৬৮ সালে অংশ নেন পাকিস্তান গেমসে। ১৯৭০ সালে পল্টন সাংস্কৃতিক ক্লাবের হয়ে ২ মাস ১৬ দিনে সাইকেলে পূর্ব পাকিস্তানের ১৯টি জেলা ভ্রমণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে বডিবিল্ডিং ফেডারেশনের সম্মাননা এবং ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘আনসার সেবা পদক’ লাভ করেন।

গত বছরের মার্চে কাতারের দোহায় এশিয়া মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় ৮৩ বছর বয়সে ৭০ কেজি বিভাগে অংশ নিয়ে সোনা জেতেন তিনি। একই বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে বিশ্ব মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় ৭০ কেজি বিভাগে রুপা পান। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় খেলার কথা রয়েছে তাঁর। বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ উজ্জীবিত।

আরও পড়ুন

নিঃস্বার্থ সমাজসেবক

সরকার থেকে প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা (২০ হাজার টাকা) এবং আনসারের সম্মানী (১৩ হাজার টাকা) দিয়েই চলে তাঁর সংসার ও জিমনেসিয়াম। ২০০১ সাল থেকে তিনি আনসার নারী ভারোত্তোলন দলের কোচের দায়িত্বে আছেন। দোহা ও লস অ্যাঞ্জেলেসে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় আনসারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ফি বাবদ এক টাকাও নেন না তিনি। উল্টো তাঁদের যাতায়াত খরচ ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। পাশে বসা এক শিক্ষার্থী জানান, স্যার নিজের পকেট থেকেই সব খরচ করেন।

মজিবুর রহমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুশীলে এক প্রশিক্ষণার্থী
প্রথম আলো

এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ও অনাথ শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো, প্রতিবন্ধী তিন শিশুকে হুইলচেয়ার দেওয়া এবং ষষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া অনাথ মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোসহ নানা সামাজিক কাজ করেন তিনি। দোকানে গিয়ে একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫টি খাতা কিনে বিতরণও করেন। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেছিলেন তিনি।

২০১৪ সালে ৩৫ বছর বয়সে বড় ছেলেকে অকালে হারান মজিবুর রহমান। বর্তমানে স্ত্রী পেয়ারা বেগম, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। তিনি বলেন, ‘অতীত নিয়ে আফসোস করি না, কাল কী খাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না। বর্তমানটাই আমার সব। ভারোত্তোলনের এই ছেলেমেয়েরাই আমার পরিবার।’

তিনি বাউল, লালনগীতি ও ভাওয়াইয়া গান পছন্দ করেন। প্রয়াত পপ সম্রাট আজম খান ও ফকির আলমগীর ছিলেন তাঁর বন্ধু। পুরোনো দিনের উত্তম কুমার, দিলীপ কুমার ও দেব আনন্দের সিনেমার ভক্ত মজিবুর রহমান একসময় এফডিসিতে গিয়ে শুটিং দেখতেন।

আরও পড়ুন

দেশের নারী ভারোত্তোলনের পথপ্রদর্শক

বাংলাদেশে নারী ভারোত্তোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৯৮ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তৎকালীন পরিচালক ও ভারোত্তোলক সংগঠক মহিউদ্দিন আহমেদের কক্ষে বসে টিভিতে বুলগেরিয়ার এক নারী ভারোত্তোলকের প্রতিযোগিতা দেখছিলেন তিনি। মহিউদ্দিনকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমরা কি এটা পারি না?’ জবাবে মহিউদ্দিন বলেছিলেন, ‘তুমি পারলে করো, খরচের ব্যবস্থা আমি করব।’

এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সামনে একদিন আড্ডার ফাঁকে চারজন মেয়েকে ভারোত্তোলন করতে রাজি করান মজিবুর—নার্গিস আক্তার, পারুল আক্তার, লিলি আক্তার ও মরিয়ম বেগম। ১৯৯৮ সালের ২৮ জুন শুরু হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীদের প্রথম ভারোত্তোলন প্রশিক্ষণ। সেই চারজন থেকে শুরু হয়ে আজ বাংলাদেশ নারী ভারোত্তোলন দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সাফল্য পেয়েছে, এসএ গেমসে সোনা জিতেছে। মাবিয়া আক্তারের মতো তারকাদের প্রেরণা তিনি।

২০২৩ সালের এশিয়ান মাস্টার্স ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন মজিবুর রহমান
সৌজন্য ছবি

পিরোজপুর থেকে ঢাকার দিনগুলো

১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার দক্ষিণ ভান্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মজিবুর রহমান। ষাটের দশকের শুরুতে এক মামার হাত ধরে ভাগ্যের অন্বেষণে ঢাকায় আসেন তিনি। সিনেমা জগতের খলনায়ক কাবিলার (নজরুল ইসলাম) বাবা হাতেম আলী খলিফা তখন টিঅ্যান্ডটির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে মায়ের অনুরোধে তিনি মজিবুরকে টিঅ্যান্ডটিতে ‘ডেসপাস রাইডার’ পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন।

ঢাকা শহরের নানা প্রান্তে টেলিগ্রাম পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। আরামবাগ থেকে গুলিস্তানের ক্লাবপাড়া হয়ে অফিসে যাতায়াতের পথেই ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। সেখানে তখন মোখলেসুর রহমান ভূঁইয়া, কর্নেল আমিন ও আনোয়ার হোসেনরা ভারোত্তোলন করতেন। মোখলেসুর রহমান ভূঁইয়াই মূলত ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তরুণ মজিবুর ও সাবেক ভারোত্তোলক মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারোত্তোলনের পাঠ দেন। প্রয়াত নায়ক ওয়াসিম বডিবিল্ডিং করতেন, তাঁর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ছিল মজিবুরের। নায়ক খসরু ও জাফর ইকবালের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

আরও পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা

১৯৭১ সালে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার হাসনাবাদ আমলানি ক্যাম্পে ৫০ দিন নিবিড় সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তিনি খুলনার ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন সুন্দরবন এলাকায় সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের সময় ৫২ জন যুবকের দল নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়ার সময় হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়েন তাঁরা। জোয়ারের তোড়ে তাঁদের একমাত্র আশ্রয়ের নৌকাটি মাঝনদী দিয়ে সাগরের দিকে ভেসে যেতে থাকে।

শীতের রাত একটার দিকে অন্ধকার নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তরুণ মজিবুর। প্রায় ৪০ মিনিট কুমির ও প্রবল স্রোতের সঙ্গে সাঁতার কেটে ভাসমান নৌকাটিকে ডাঙায় ফিরিয়ে আনেন তিনি। উদ্ধার করেন ৫২ জন সহযোদ্ধাকে। এরপর শিবসা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের হাসনাবাদে গিয়ে পৌঁছান।

প্রশিক্ষণ বেন্দ্রের বাইরের দৃশ্য
প্রথম আলো

জীবনের শেষ চাওয়া

কোনো দামি বাড়ি বা জায়গাজমির মোহ নেই তাঁর। ৮৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে দেশ ও সরকারের কাছে একটিই দাবি জানান তিনি, ‘টঙ্গীর এরশাদনগরের সুবিধাবঞ্চিত হাজারো শিশুর জন্য একটি স্থায়ী ও আধুনিক জিমনেসিয়াম বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে দিন। আমার জীবনে এটাই এখন একমাত্র চাওয়া। আমৃত্যু ভারোত্তোলনেই থাকতে চাই আমি।’

জীর্ণ টিনের ঘর থেকে বিদায় নেওয়ার সময় উপলব্ধি হয়—জিমনেসিয়ামের চোরেরা হয়তো সিসিটিভি ক্যামেরা বা কয়েকটি লোহার প্লেট চুরি করতে পেরেছে, কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমানের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অদম্য স্পৃহাকে চুরি করার সাধ্য কারও নেই।

আরও পড়ুন