default-image

সোহাগ স্বপ্নধরা স্কুলের দাবাড়ুরা সম্প্রতি অংশ নিয়েছে জাতীয় নারী দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ, বেগম লায়লা আলম ১২তম ফিদে রেটিং টুর্নামেন্ট, এলিগেন্ট দাবা ও মানহাস ক্যাসল রেটিং টুর্নামেন্টে। মেয়েদের দাবা লিগে দ্বিতীয় বিভাগের দল আগামী চেস গিল্ড ক্লাবের হয়ে খেলেছে শাহিনুর খাতুন, পলি খাতুন ও জাকিয়া আক্তার। লিগে হারিয়েছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো দলকেও।

দুয়ারীপাড়া বস্তির ঘিঞ্জি গলি পেরিয়ে যেতে হয় সোহাগ স্বপ্নধরা পাঠশালায়। কিছুদিন আগে সেই স্কুলে গিয়ে দেখা গেল প্রচণ্ড গরমের মধ্যে একটি ছোট শ্রেণিকক্ষে চলছে দাবার ক্লাস। ডিসপ্লে বোর্ডে ঘুঁটি বসিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবা শেখাচ্ছেন ফরহাদুর রহমান। অভাব, ক্ষুধা আর সংগ্রামের মধ্যে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা যেন দাবার বোর্ডে খুঁজে নিচ্ছে জীবনের যত আনন্দ। স্বপ্নধরা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দাবার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আগামী ফাউন্ডেশন। সংগঠনটি এর আগে সমাজের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করলেও কোনো খেলা শেখানোর উদ্যোগ এই প্রথম।

আগামী ফাউন্ডেশনের অন্যতম পরিচালক তাহসিন রউফ সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের দাবা শেখাতে সহযোগিতা চেয়েছিলেন স্কুলের বন্ধু গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তারের কাছে। কিন্তু পেশাগত কাজে ব্যস্ততার কারণে রিফাত দায়িত্বটা দেন আন্তর্জাতিক মাস্টার আবু সুফিয়ানকে। বর্তমানে আবু সুফিয়ান ও ফরহাদুর রহমান সপ্তাহে তিন দিন দাবা শেখাচ্ছেন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের।

শুরুতে দাবা শেখানোর কর্মসূচি তিন মাসের মধ্যে শেষ করতে চেয়েছিল আগামী ফাউন্ডেশন। কিন্তু দাবা শেখার জন্য তিন মাস খুবই কম সময় বলে আবু সুফিয়ান দীর্ঘমেয়াদি কিছু করার প্রস্তাব দেন, ‘তাহসিন ভাই আমাকে তিন মাসের কর্মসূচি নিতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি বলেছি, ভালো দাবাড়ু বের করতে হলে কমপক্ষে দুই বছর সময় দিতেই হবে। এরপর আমার কাছে পরিকল্পনা, বাজেট, সিলেবাস, কোচের বেতনসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু জানতে চাওয়া হয়। আমি আমার পরিকল্পনা উপস্থাপন করলে সেই অনুযায়ী কাজ শুরু হয়।’

default-image

বস্তির ছেলেমেয়েদের দাবা শেখানোটা সহজ ছিল না দুই কোচের জন্য। সেসব চ্যালেঞ্জের কথাই বলছিলেন ফরহাদুর রহমান, ‘আর্থিকভাবে অসচ্ছল অভিভাবকেরা চিন্তা করে ছেলেমেয়েরা বড় হলেই পোশাক কারখানায় দিতে হবে। পরিবহনশ্রমিক বা অন্যের বাসায় কাজ করবে। তাদের বুঝিয়ে স্কুলে এনে দাবা শেখাতে হয়েছে।’

সোহাগ স্বপ্নধরা পাঠশালার খুদে দাবাড়ুদের একজন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ইব্রাহিমের বাবা ইলিয়াস মাঝি দারোয়ানের কাজ করেন, মা গৃহকর্মী। বছরখানেক আগে ইব্রাহিমকে পোশাক কারখানায় কাজ করতে পাঠিয়ে দেন বাবা।

default-image

কিন্তু খেলার নেশায় আবারও স্কুলে ফিরে আসে ইব্রাহিম, ‘শুরুতে দাবা খেলা বুঝতাম না। কিন্তু এখন দাবা খেলতে ভীষণ ভালো লাগে। দাবার টানেই স্কুলে ফিরেছি।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাগরিকা দাস বলছিলেন, ‘দুয়ারীপাড়ায় দাবার নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে। এখন অনেক অভিভাবক ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায় শুধু দাবা শেখার জন্য।’

উগান্ডার বস্তিতে জন্ম নেওয়া দাবাড়ু ফিওনা মুতেসিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে হলিউডের সিনেমা কুইন অব কাটওয়ে। বস্তি থেকে উঠে এসে ফিওনা খেলেছেন বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে। কে জানে, সোহাগ স্বপ্নধরা পাঠশালা থেকেও উঠে আসে কি না বাংলার কোনো ফিওনা! পলি, মিমদের স্বপ্নটা কিন্তু সে রকমই।

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন