মাঠটা ছিল ছোট্ট, ধুলোমাখা। কারও কাছে সেটা পাড়ার এক টুকরা জমি, কারও কাছে জেলা শহরের এক চিলতে স্টেডিয়াম। সেখানেই একদিন হাতে স্টিক তুলে নিয়েছিলেন কয়েকজন কিশোর—তখনো জানতেন না, কয়েক বছর পর সেই স্টিক হাতেই এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়াযজ্ঞের মাঠে দাঁড়ানোর সুযোগ আসবে।
আশরাফুল হক, সাহিদুর রহমান, ওবায়দুল হোসেন, দ্বীন ইসলাম, খালেদ মাহমুদ ও মাহবুব হোসেন—১৮ জনের স্কোয়াডে এই ৬ জনের জন্য এবারের এশিয়ান গেমস একেবারেই নতুন এক মিশন। এত দিন টিভির পর্দায় যে আসর দেখে বড় হয়েছেন, এবার সেখানে নিজেরাই নামবেন। গায়ে থাকবে বাংলাদেশের জার্সি, বুকে জ্বলবে লাল-সবুজ পতাকা।
গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফুলের চোখে আজও ভাসে ফেলে আসা দিনগুলো, ‘টিভিতে যখন এশিয়ান গেমস দেখতাম, মনে হতো একদিন যদি বাংলাদেশের হয়ে এখানে খেলতে পারতাম! এখন সত্যিই যাচ্ছি (এশিয়ান গেমস)—এটা ভাবতেই অন্য রকম লাগে। মা–বাবাকে যখন জানিয়েছি, তাঁরাও অনেক খুশি।’
ওবায়দুলের কাছে তো সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটা এখনো আসেইনি। আসবে যখন মাঠে দাঁড়িয়ে বাজবে জাতীয় সংগীত। তাঁর ভাষায়, ‘মাঠে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় হয়তো অনেক কিছুই মনে পড়বে। পরিবার, কোচ, ছোটবেলায় হকি খেলার কথা।’
প্রতিপক্ষ কঠিন, এটা আমরা জানি। কিন্তু মাঠে নামার পর এসব ভাবলে হবে না। নিজেদের খেলাটা খেলতে হবে। প্রথমবার যাচ্ছি, তাই ভালোভাবে উপভোগও করতে চাই, আবার দলের জন্য অবদানও রাখতে চাই।বাংলাদেশ হকি দলের খেলোয়াড় ওবায়দুল হোসেন
ছয়জনের কারও পথই ফুল বিছানো ছিল না। প্রতিদিনের কঠোর অনুশীলন, চোট, দল থেকে বাদ পড়ার হতাশা—সবকিছু পেরিয়েই আজকের এই জায়গায় তাঁরা। তাই তো কারও গল্পে সেই হতাশা আরও গাঢ়। হকির পরিচিত মুখ রাসেল মাহমুদ জিমির ছোট ভাই খালেদ মাহমুদের কথাতেই যেন ফুটে উঠল সেই সংগ্রামের ছবি। ভাইয়ের সঙ্গে একই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে তাঁর, কিন্তু সেই আনন্দের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু ব্যর্থতার গল্পও। খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘জিমি ভাইয়ের সঙ্গে জাতীয় দলে খেলব, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে। অনেকবার ক্যাম্পে ডাক পেয়েও বাদ পড়েছি। মাঝেমধ্যে মনে হতো খেলাটাই ছেড়ে দিই। সেই সময় জিমি ভাই বারবার বলতেন, “ধৈর্য ধর, একদিন ঠিকই সুযোগ পাবি।”’
প্রথমবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রোমাঞ্চ যেমন আছে, তেমনি আছে চাপও। কারণ, প্রতিপক্ষ তালিকায় থাকছে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো শক্তিশালী দল। তারপরও তারুণ্যের সাহস তো আছে। ওবায়দুল তাই বলেন, ‘প্রতিপক্ষ কঠিন, এটা আমরা জানি। কিন্তু মাঠে নামার পর এসব ভাবলে হবে না। নিজেদের খেলাটা খেলতে হবে। প্রথমবার যাচ্ছি, তাই ভালোভাবে উপভোগও করতে চাই, আবার দলের জন্য অবদানও রাখতে চাই।’
জাপানের আইচি-নাগোয়ায় আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত এবারের এশিয়ান গেমস। হকিতে বাংলাদেশের গ্রুপে আছে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। লড়াই যখন কঠিন, প্রস্তুতিও তাই নিতে হচ্ছে সেভাবেই। ২ সেপ্টেম্বর চীনের উদ্দেশে রওনা দেবে বাংলাদেশ পুরুষ হকি দল। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহের কন্ডিশনিং ক্যাম্পে ঘাম ঝরাবেন জিমি-আমিরুলরা। এই সময়ের মধ্যে চীন জাতীয় দলের বিপক্ষে তিনটি এবং বেইজিংয়ের একটি স্থানীয় ক্লাবের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা আছে ফেডারেশনের। নতুন ছয়জনের জন্য এই পাঁচ ম্যাচ হয়ে উঠবে নিজেদের যাচাই করার এক বড় সুযোগও।
মাহবুবের কণ্ঠে সেই প্রত্যাশারই প্রতিধ্বনি, ‘চীনের ক্যাম্পটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেললে নিজেদের দুর্বলতা বোঝা যাবে। প্রথমবার এশিয়ান গেমসে যাচ্ছি, তাই যত বেশি ম্যাচ খেলব, তত আত্মবিশ্বাস বাড়বে।’
ইতিহাস বলছে, এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ পুরুষ হকি দলের সেরা সাফল্য ষষ্ঠ স্থান—১৯৭৮ সালে প্রথমবার অংশ নিয়েই যা অর্জন করেছিল দলটি, পরে ২০১৮ সালের জাকার্তা আসরেও পুনরাবৃত্তি হয়েছিল সেই ফল। এবারের লক্ষ্যও সেই ষষ্ঠ স্থান ধরে রাখা।
ছয়জন, ছয়টি আলাদা ইচ্ছা। কারও প্রথমবার মাঠে নামার রোমাঞ্চ, কারও গোল করার ক্ষুধা, কারও আবার দলের জয়ে অবদান রাখার তাগিদ। কিন্তু সব ইচ্ছার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একটাই নাম—বাংলাদেশ।