বাবার কোচিং, বোনদের সাহস, বর্ণার গল্প অনেকের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণা
জীবন অনেক সময় এমন এক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখান থেকে সামনে এগোনোর সব পথ বন্ধ মনে হয়! কিন্তু কেউ কেউ থাকেন, যাঁরা হার মানতে শেখেননি। তেমনি একজন কারাতেকা মাউনজেরা বর্ণা। সম্প্রতি মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোরে অনুষ্ঠিত ৩০তম জাতীয় কারাতে প্রতিযোগিতার অনূর্ধ্ব–৫৫ কেজি শ্রেণিতে সোনার পদক জিতেছেন তিনি। এমন অনেক পদকই আছে বর্ণার, তবু এবারেরটা তাঁর কাছে বিশেষ কিছু। কারণ, এই প্রাপ্তির সঙ্গে মিশে আছে বর্ণার রক্ত, ঘাম আর অশ্রু দিয়ে লেখা এক প্রত্যাবর্তনের গল্প।
প্রতিযোগিতামূলক কারাতেতে বর্ণার যাত্রা শুরু ২০১১ সালে। ওই বছরই জাতীয় জুনিয়রে সোনা জেতেন। এরপর ২০১৩ সালে বাংলাদেশ গেমসে সোনা জিতে সিনিয়র পর্যায়ে পথচলা শুরু। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এখন তাঁর শোকেসে আছে ৪৩টি পদক, যার ২৯টিই সোনা। ২০১৪ থেকে পাঁচটি জাতীয় কারাতে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সব কটিতেই সোনা জিতেছেন। কিন্তু ২০২২ সালে ২৮তম জাতীয় কারাতেতে অংশ নিতে গিয়ে পাওয়া এক চোট তাঁর ক্যারিয়ার ওলট–পালট করে দেয়। ছিঁড়ে যায় লিগামেন্ট, সেই ব্যথা শুধু শরীরে নয়, আঘাত হানে তাঁর আত্মবিশ্বাসেও।
শুরু হয় এক দুঃসহ অধ্যায়। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা ‘তুমি শেষ’, ‘তোমাকে দিয়ে আর হবে না’—এমন সব নেতিবাচক কথাগুলো তাঁকে গ্রাস করতে শুরু করে। একসময় হতাশার সঙ্গে বাড়তে থাকে শরীরের ওজন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অচেনা প্রতিচ্ছবি দেখে বর্ণা নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন; হয়তো সত্যিই তিনি শেষ।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল তাঁর বাবা বাবলু জামানের কাছ থেকে, যিনি আবার বর্ণার কোচ। মেয়ের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাবা যখন বললেন, ‘সংসারে মন দাও, ভালো স্ত্রী–মা হও।’ তখন বর্ণার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গিয়েছিল। কিন্তু এই হতাশার ভেতরেই ছিল এক নীরব বিদ্রোহ। বর্ণা যখন খেলা ছাড়ার কথা তাঁর স্বামী গোলাম সাইয়েদুলকে জানান, তখন তাঁর চোখের জলহীন ভাঙাচোরা দৃষ্টি বর্ণাকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। বর্ণা বুঝতে পারেন, তাঁর হেরে যাওয়া মানে শুধু নিজের হার নয়, তাঁর ওপর ভরসা করা মানুষগুলোর স্বপ্নের মৃত্যু।
সেই ভাবনাই তাঁকে নতুন লড়াইয়ের পথ দেখায়। দীর্ঘ আড়াই বছর খেলার বাইরে থেকেও আবার বিজয়মঞ্চে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। মাঝপথে ২০২৪ সালের আগস্টে কমনওয়েলথ গেমসের ট্রায়ালে অংশ নিলেও ভালো করতে পারেননি, সেই ব্যর্থতা তাঁকে একটু থমকেই দিয়েছিল। ৩০তম জাতীয় প্রতিযোগিতায় সোনা জেতার পর সেই স্মৃতি মনে করে বললেন, ‘মনে হচ্ছিল সবকিছু শেষ। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে, পরিশ্রম করলে যে সফলতা পাওয়া যায়, সেটা আরেকবার বুঝতে পারলাম।’
যদিও নিজেকে ফিরে পেতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে বর্ণাকে। প্রচণ্ড ব্যথা চেপে রেখে, শরীরের ওপর অমানুষিক ধকল সয়ে ওজন কমিয়েছেন প্রায় ১০ কেজি। রোজা–পরবর্তী ক্লান্তি আর মনের কোণে দানা বাঁধা ভয়; সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়। বর্ণা জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতার মঞ্চে নেমে তাঁর মনে হয়েছিল, এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স। কিন্তু যখন বিচারকের রায় তাঁর পক্ষে এল এবং গলায় সেই কাঙ্ক্ষিত পদকটি উঠল, তখন সব বাঁধ ভেঙে যায়।
সোনার পদক ফিরে পেয়ে বর্ণা তাই আবেগাপ্লুত, ‘এই পদক আমার কাছে শুধু একটা পদক নয়, এটা আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন ছিল। এখন আর কেউ বলতে পারবে না “তুমি পারবা না”।’
দুই বোন জুডোকা উম্মে সালমা ও ২০১০ এসএ গেমসে সোনাজয়ী কারাতেকা মরিয়ম খাতুনের কাছে বর্ণার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বর্ণার সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোতে আলোকবর্তিকা হয়েছিলেন এই দুজন। দুঃসময়টা মনে করিয়ে বর্ণা বলেন, ‘খারাপ সময়ে কাউকে পাশে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি খুবই কৃতজ্ঞ আমার দুই বোনের কাছে। তাঁরা সব সময় আমাকে সাহস জুগিয়েছে। বলতে পারেন আমার এই লড়াইয়ের সঙ্গী তাঁরাও।’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কারাতেকা বর্ণার এই গল্প অনেকের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণার। যে গল্পের মর্মবাণী—শরীর হার মানলেও মন যদি অদম্য থাকে, তবে শূন্য থেকেও আবার শীর্ষে পৌঁছানো যায়।