জিন্নাতের এক ব্রোঞ্জেই সান্ত্বনা বাংলাদেশের
আইচি–নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ১৮৭ জন অ্যাথলেটের বিপরীতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি স্রেফ উশুতে একটি ব্রোঞ্জ! দীর্ঘ ৪০ বছরের খরা কাটিয়ে একক ইভেন্টে জিন্নাত আক্তারের এই পদক জয় যেমন আনন্দের, আগামীকাল শেষ হতে যাওয়া এই আসরে বাকি ডিসিপ্লিনগুলোতে চরম ব্যর্থতা ও অপূর্ণতা ঠিক ততটাই হতাশার। পদকের এই একটিমাত্র ঝলকানি বাদ দিলে, গোটা আসরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল ভীষণ ম্লান ও বৈচিত্র্যহীন।।
ব্রোঞ্জ পদকটাও মিলেছে কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে। কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ ডিসকোয়ালিফাইড হওয়ায় সরাসরি সেমিফাইনালে ওঠেন জিন্নাত। সেখানে চীনের উ দিয়ের কাছে হেরে ব্রোঞ্জ পেয়েছেন তিনি। জিন্নাতের ব্রোঞ্জের পর জাপানে এবার আর কোনো বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদকে পদকের মঞ্চে দেখা যায়নি। ক্রিকেট, কাবাডি, আর্চারি ও শুটিং—যে খেলাগুলো থেকে পদকের আশা ছিল, সেগুলোতেও শেষ পর্যন্ত ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।
সবচেয়ে বড় হতাশার খবরটি এসেছে ক্রিকেটে। হাংঝু এশিয়ান গেমসে পুরুষ ও নারী—দুই দলই ব্রোঞ্জ জিতেছিল। এবার দুই দলই হয়েছে চতুর্থ। কাবাডিতেও পুরোনো হতাশার পুনরাবৃত্তি। ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পুরুষ কাবাডি দল পদক জিতেছিল। এরপর আর সেই ধারায় ফিরতে পারেনি দলটি। ২০২৩ সালের হাংঝু এশিয়ান গেমসেও পঞ্চম হয়েছিল বাংলাদেশ, এবারও শেষ করেছে একই অবস্থানে থেকে।
আর্চারি ও শুটিং ছিল বাংলাদেশের বড় পদকের আশার জায়গা। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আর্চারদের সাফল্যই সেই প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু এশিয়ান গেমসের বড় মঞ্চে সেটির প্রতিফলন দেখা যায়নি। শুটিংয়েও ছিল একই চিত্র।
হকিতে অবশ্য আগের আসরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হয়েছে। হাংঝুতে অষ্টম হওয়া পুরুষ দল এবার হয়েছে সপ্তম। যদিও এবারের আসরে তাদের লক্ষ্য ছিল ষষ্ঠ হওয়া। অন্যদিকে মেয়েদের হকির জন্য এবারের এশিয়ান গেমস ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। প্রথমবার অংশ নিয়েই নবম হয়েছে তারা।
নারী ফুটবলেও উন্নতির ছাপ খুব সামান্য। অ্যাথলেটিকসে ছিল না কোনো চমক। বক্সিং, ভারোত্তোলন, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, কারাতে, ফেন্সিং, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, গলফ, জুডো, টেবিল টেনিস, বিচ ভলিবল, কুস্তিসহ অন্য খেলাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি।
অবশ্য সব খেলাকে একই মানদণ্ডে বিচার করাও ঠিক হবে না। এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের এসব খেলার প্রস্তুতি, অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগের বড় ব্যবধান আছে।
প্রশ্নটা তাই মূলত পদকের সম্ভাবনাময় খেলাগুলোকে ঘিরেই; সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা হচ্ছে? খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, কোচিং, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কতটা কাজ হচ্ছে?
জাপান যাওয়ার আগে খেলোয়াড়দের তুলনায় কর্মকর্তাদের বড় বহর নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। পদকের হিসাব যখন এত ছোট, তখন ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুতি ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নটিও সামনে আসছে।
তবে এবারের এশিয়ান গেমসে জিন্নাতের হাত ধরে আসা পদকটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা সুখস্মৃতি। কিন্তু এই একটিমাত্র আনন্দ উদ্যাপনই যেন এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের সামগ্রিক দৈন্য আর দীর্ঘদিনের অপূর্ণতাকে আরও বেশি দৃশ্যমান করে তুলেছে।