default-image

২০০২ সালে জুলাই।

আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনির সেই সাফল্যের পর কেটে গেছে গোটা একটি যুগ। মাঝে হয়ে গেছে কানাডার ভিক্টোরিয়া ও মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর দুটি কমনওয়েলথ গেমস। বাংলাদেশ সাফল্যশূন্য, পদকশূন্য। ভিক্টোরিয়া গেমসে ক্রীড়াবিদদের পালিয়ে যাওয়ার মতো লজ্জাজনক ঘটনাও ঘটেছে। ১৯৯৮ সালে কুয়ালালামপুর গেমসে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরেও নিজেদের গ্রুপের প্রতিটি ম্যাচেই বাজেভাবে হেরে দেশে ফিরেছেন বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেওয়া, টেস্ট খেলার অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটাররা। এমন একটা সময়ে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে অংশগ্রহণ। সাফল্যের সম্ভাবনা নিভে যাচ্ছে একে একে। সাধের শুটিংয়ে বড় বড় তারকাও ব্যর্থ। কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছে না, তখন আবির্ভাব এক কিশোরের—আসিফ হোসেন খান। দেশের মানুষকে বিস্মিত করে তিনি শুটিংয়ের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে জিতে নিলেন সোনা। আতিক-নিনিদের মতোই তিনি আনন্দে ভাসালেন দেশের মানুষকে। পেলেন বীরোচিত সংবর্ধনা। ক্রিকেট-ফুটবলের বাইরে দেশের ক্রীড়াঙ্গন পেয়ে গেল আরেক বড় তারকাকে। তাঁকে নিয়ে শুরু করল স্বপ্ন দেখা। বড় কিছুর স্বপ্ন।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, কমনওয়েলথ গেমসে আসিফের পর আর কেউই দেশের খেলাপ্রেমীদের স্বর্ণালি আনন্দে ভাসাতে পারেননি। কমনওয়েলথ গেমসে আর কখনোই বাজেনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।

default-image

এরপর ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, ২০১০ সালে ভারতের দিল্লি, ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো আর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে আরও চারটি কমনওয়েলথ গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে। পদক তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল প্রতিবারই। কিন্তু সোনার পদকের দেখা আর পাওয়া হয়নি। এ চার গেমসে বাংলাদেশ জিতেছে পাঁচটি পদক—দুটি রুপা ও তিনটি ব্রোঞ্জ। প্রতিটিই শুটিংয়ে। কিন্তু সোনার পদক না জেতার খচখচানিটা থেকে গেছেই। ২০০৬ সালে মেলবোর্নে আসিফ হোসেন খান আর অঞ্জন কুমার সিনহার জুটি ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত ইভেন্টে রুপা জিতেছিলেন। ২০১০ সালে দিল্লিতে আসিফ আবদুল্লাহ হেল বাকীকে সঙ্গী করে ওই একই ইভেন্টে জেতেন রুপা।

এরপর আবদুল্লাহ হেল বাকীর ওপর বাজি ধরে হলেও তিনি দেশকে সোনা উপহার দিতে পারেননি। একক ইভেন্টে বাকী দুবার রুপা জেতেন (১০ মিটার এয়ার রাইফেল) ২০১৪ সালে গ্লাসগো ও ২০১৮ সালে গোল্ডকোস্টে। রুপার মিছিলে ২০১৮ সালে যোগ দেন শাকিল আহমেদ—৫০ মিটার পিস্তল ইভেন্টে। কমনওয়েলথ গেমস মানেই বাংলাদেশের পদক-ভরসা শুটিং। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ অর্জন দুটি সোনা, চারটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জের সব কটিই এসেছে শুটিং থেকেই। তবে আতিকুর রহমান, আবদুস সাত্তার নিনি কিংবা আসিফ হোসেন খানরাই কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের ‘সোনার ছেলে’।

default-image

২০২২ সালেও লক্ষ্য ‘অভিজ্ঞতা অর্জন’?

১৯৭৮ সালে কানাডার এডমন্টনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসের স্মৃতি খুব করেই মনে পড়বে প্রবীণ ক্রীড়াপ্রেমীদের। সেবারও দেশের দ্রুততম মানব মোশাররফ হোসেন শামীম কমনওয়েলথ গেমসে গিয়েছিলেন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য লড়াই করতে। আজ ৪৪ বছর পরেও বাংলাদেশের ক্রীড়া দলটি ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের কমনওয়েলথ গেমসে যাচ্ছে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই। পার্থক্য বলতে ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ দলটি ছিল দুই সদস্যের। আর এবার স্বাধীনতার ৫১ বছর পর কমনওয়েলথ গেমসের দলটি ১৪ জন কর্মকর্তাসহ মোট ৩০ জনের। কিন্তু এবার নাকি একটি পদক জেতারও সম্ভাবনা নেই। কমনওয়েলথে দেশকে ৮টি পদক উপহার দেওয়া শুটিং এবার নেই। সাম্প্রতিক কালে দেশকে কিছুটা সাফল্যের সম্ভাবনা দেখানো আর্চারিও নেই। সাঁতার, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস, টেবিল টেনিস—এই খেলাগুলোয় ‘অভিজ্ঞতা অর্জন’ও যে দেশের খেলাধুলার হালহকিকতে রীতিমতো কঠিন, এটা বলাই যায়।

default-image

কোনো একটা অলিম্পিকের সময় বিদেশি পত্রিকায় একটা প্রতিবেদন বেরিয়েছিল। বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ (জনসংখ্যার হিসেবে), যারা কখনোই অলিম্পিকে পদক জেতেনি। এই যে ৫০ বছর ধরে দেশের খেলাধুলায় ‘অভিজ্ঞতা অর্জনে’র চক্র চলছে, সেটি ছাপিয়ে বাকি দুনিয়ারও চিন্তার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি—অলিম্পিকে কখনো পদক জেতেনি ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ। অলিম্পিক দূরে থাক, এসএ গেমস ছাড়া এশিয়ান গেমসেও যে বাংলাদেশের লক্ষ্য ওই ‘অভিজ্ঞতা অর্জন’ই।

আরেকজন আতিকুর রহমান, আরেকজন আবদুস সাত্তার নিনি, আসিফ হোসেন খানরা যখন কমনওয়েলথে সাফল্য পেয়েছিলেন, এমনকি বাকী, শাকিলরাও যখন পেরেছিলেন, তখন তাঁদের অভিজ্ঞতা কতটুকু ছিল। আমাদের খেলাধুলার লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘আতিক’ ‘নিনি’ ‘আসিফ’, ‘বাকী’, ‘শাকিল’, ‘অঞ্জন’দের তৈরি করা। অভিজ্ঞতা অর্জনের খেলা এবার আসলেই বন্ধ হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ‘অভিজ্ঞতা অর্জন’, ‘অংশগ্রহণই বড় কথা’—এসব ছেঁদো কথার কোনো মূল্যই নেই।

অন্য খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন