চীনে খেলা নিয়ে কে খেলছে কোন খেলা

বেইজিং অলিম্পিকে অংশ নিতে যাওয়া ইতালিয়ান দুই স্পিড স্কেটারের অনুশীলনছবি: রয়টার্স

৪ ফেব্রুয়ারি থেকে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শুরু হচ্ছে শীতকালীন অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ২০০৮ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সফল আয়োজন করতে পেরেছিল চীন। এরপর থেকে আরও ১৩টি শীত এবং গ্রীষ্ম পার হয়ে অলিম্পিকের ভিন্ন এক আয়োজনের দায়িত্ব আবারও এসে পড়েছে চীনের ওপর।

চীন এটাকে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের মতোই চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আয়োজনে সফল হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সামনে দেশটির অব্যাহত অগ্রযাত্রার গ্রহণযোগ্য ছবি যাতে তুলে ধরা যায়, সেই চেষ্টা বেইজিং স্বাগতিক শহর হতে পারার সময় থেকেই করে যাচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যপটের বদল চীনকে এখন অনেকটাই ঠেলে দিয়েছে ভিলেনের পর্যায়ে। এ রকম পরিস্থিতিতে শীতকালীন অলিম্পিকের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলতে থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নতুন এ ভিলেনকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্য নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলোর পাশাপাশি সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমও যোগ দিয়েছে সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে।

ফলে আমরা যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খবরাখবরের জন্য ইন্টারনেটের এ যুগেও পশ্চিমের মুখাপেক্ষী, চীন সম্পর্কে যেসব খবর আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি, তার প্রায় সিংহভাগই হচ্ছে নেতিবাচক খবর।

অনুশীলনে জাপানের এক ফ্রি-স্টাইল স্কেটার
ছবি: রয়টার্স

এসব খবরের মধ্যে যেমন থাকছে চীনের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষকে দমবন্ধ করা এক পরিস্থিতিতে রেখে ভীতি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সে দেশের শাসকদের নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টার কথা; একইভাবে থাকছে সেকালের কাবুলিওয়ালাদের ঢঙে উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে ঋণের জালে দেশগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়ে ‘ম্যায় আসলি মাংতা নেহি, সুদ দে দেও’ বলে একই কায়দায় চীনের ছড়ি ঘোরানোর খবর।

ফলে চীনের যে ছবি পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে আমরা পাচ্ছি, তার প্রায় সবটাই এখন হচ্ছে নেতিবাচক। এ ছাড়া আরও আছে পশ্চিমের মেধা ও জ্ঞানের সাফল্য চুরি করে নিজের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি মজবুত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ।

অন্যদিকে দেশটির এ রকম নেতিবাচক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে চীনের নানামুখী অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার চেষ্টাও থেমে নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে শীতকালীন অলিম্পিক বর্জনের ডাক যখন খোদ হোয়াইট হাউস থেকে চলে আসে, তখন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে ষড়যন্ত্রের জাল অনেকটাই বিস্তৃত।

তবে এ রকম অপপ্রচারের সবটাই যে সাফল্যের মুখ দেখছে তা অবশ্য নয়। পশ্চিমের দেশগুলোর নিজেদের প্রচারের তির নিজের ওপর এসে পড়ার দৃষ্টান্তও একেবারে কম নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে যেমন চীনের মুসলিম সংখ্যালঘু জাতিসত্তা উইঘুরদের ওপর দেশটির শাসকদের নির্যাতন চালানোর দোহাই দিয়ে অলিম্পিক বর্জনের ডাকে সেভাবে সাড়া না পাওয়ার পর চীনের এক নারী টেনিস তারকাকে নিয়ে পশ্চিমের হইচইও সেই অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা যুক্তিসংগত করে তুলতে পারেনি।

বরং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির মতো পশ্চিমঘেঁষা সংগঠনও অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেছে, এর কোনো সত্যতা তারা খুঁজে পায়নি।

জার্মানির ফেলিক্স লখের অনুশীলন
ছবি: রয়টার্স

তবে এতে হতোদ্যম না হয়ে এর ঠিক কিছুদিন পরই চীনকে নিয়ে ভিন্ন খেলা খেলতে শুরু করে পশ্চিমারা। যে খেলার মূলে এখন আছে শীতকালীন অলিম্পিকে যোগ দিতে যাওয়া পশ্চিমের ক্রীড়াবিদদের এই বলে সতর্ক করে দেওয়া যে অলিম্পিক উপলক্ষে বেইজিংয়ে অবস্থানকালে তাঁদের নানামুখী বাধার সামনে পড়তে হবে।

এমনও বলা হচ্ছে যে অলিম্পিকে যোগদানের জন্য চীনে অবস্থানকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করাও এদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফলে যে উপদেশ পশ্চিমের—বিশেষ করে মার্কিন ক্রীড়াবিদদের দেওয়া হচ্ছে তা হলো নিজেদের ব্যবহারের মোবাইল ফোন সঙ্গে না রেখে বরং চীনে পৌঁছানোর পর তাঁরা যেন সেখানে ব্যবহার করার জন্য সস্তা কোনো মোবাইল সেট কিনে নেন।

এ ছাড়া চীনের, বিশেষ করে চীনের উইঘুর অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়া নিয়ে উচ্চকণ্ঠের প্রতিবাদ তাঁরা যেন অব্যাহত রাখেন, সেই উপদেশও ক্রীড়াবিদদের দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে পশ্চিম এখন চীনকে ঘায়েল করার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রচারযন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে ক্রীড়াবিদদেরও কাজে লাগাতে পিছপা হচ্ছে না।

এর সবটার জবাবে চীন কেবল এটুকুই বলেছে যে অলিম্পিকে যোগ দিতে আসা ক্রীড়াবিদদের উচিত হবে অলিম্পিকের চেতনাকে সমুন্নত রেখে খেলার মাঠে রাজনীতি নিয়ে আসার অশুভ যেকোনো তৎপরতা থেকে বিরত থাকা।

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের আধিপত্য চলতে থাকা অবস্থায় অলিম্পিকের মতো বিশাল এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারা চীনের পক্ষে সহজ ছিল না। ভাইরাসের বিস্তার যেন আয়োজন ভন্ডুল করে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিতে অলিম্পিক আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ এলাকাগুলোতে কেবল লকডাউন নয়, সেই সঙ্গে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিমালা চীনের কর্তৃপক্ষ প্রয়োগ করতে শুরু করে।

অনুশীলনে সুইজারল্যান্ডের কার্লার
ছবি: রয়টার্স

তবে এটা নিয়েও পশ্চিমের উষ্মার শেষ নেই। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমে চীনের এ কঠোর নীতিমালাকে দেখানো হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করার আরও একটি প্রচেষ্টা হিসেবে।

এ রকম বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যে অলিম্পিকের সফল আয়োজন করতে চীন অবশ্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনা নববর্ষের ছুটি চলতে থাকার দিনগুলোতে অলিম্পিক শুরু হলেও করোনাভাইরাস প্রতিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দর্শকবিহীন অবস্থায় সব কটি বিভাগের খেলা অনুষ্ঠিত হবে।

ফলে ছুটি চলতে থাকলেও চীনের নাগরিকেরা বিভিন্ন ভেন্যুতে উপস্থিত থেকে খেলা কিংবা বর্ণাঢ্য উদ্বোধনীর মতো অন্যান্য অনুষ্ঠান সরাসরি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। বিদেশি পর্যটকেরাও অলিম্পিক উপলক্ষে চীন ভ্রমণের অনুমতি পাবেন না।

শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাওয়া শীতকালীন অলিম্পিকে খেলাধুলার মোট ১৫টি বিভাগের ১০৯টি ইভেন্ট বেইজিংয়ের শহরতলির তিনটি ভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হবে। ভাইরাসজনিত নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রেখে তিনটি অঞ্চলের প্রতিটির জন্য ভিন্ন অলিম্পিক ভিলেজ গড়ে তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রধান একটি মিডিয়া সেন্টার ছাড়াও প্রতিটি জোনে ইতিমধ্যে খোলা হয়েছে নিজস্ব মিডিয়া সেন্টার। ফলে ক্রীড়া সাংবাদিকেরাও সীমিত এলাকায় অবস্থান করে খেলাধুলার সংবাদ সংগ্রহ করবেন, যা কিনা খেলাধুলার বাইরে ভিন্ন সংবাদ সংগ্রহে তাঁদের জড়িত হওয়া কিছুটা হলেও কঠিন করে তুলবে।

তবে চীনকে হেনস্তা করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া পশ্চিমের নানামুখী তৎপরতা যে এরপরও বন্ধ থাকবে, তা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। চীন অবশ্য এতে খুব বেশি বিচলিত নয়। এ কারণেই এর জুতসই জবাব হিসেবে অলিম্পিকের সফল আয়োজনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে বেইজিং।