সাক্ষাৎকারে সুব্রত বিশ্বাস
বাংলাদেশের ষষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হতে চাই
জাতীয় জুনিয়র (অনূর্ধ্ব-২০) দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এটাই শেষ সুযোগ ছিল ২০ বছর বয়সী সুব্রত বিশ্বাসের। সুযোগটা ময়মনসিংহের এই দাবাড়ু নষ্ট করেননি। গতকাল শেষ রাউন্ডে ড্র করে প্রথমবার হয়েছেন জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন। শিরোপা জয়ের পর ফিদে মাস্টার সুব্রত প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন নিজের ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন নিয়ে।
প্রশ্ন :
চ্যাম্পিয়ন হবেন, এই আত্মবিশ্বাস কতটা ছিল?
সুব্রত বিশ্বাস: শুরু থেকেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খেলেছি। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে অঘটন ঘটে। সাফিন খানের সঙ্গে জেতা ম্যাচ ড্র হয়। তবে এরপর শিরোপার দাবিদার যারা ছিল, সবাইকে হারিয়েছি। তাই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।
প্রশ্ন :
৯ ম্যাচে কঠিন প্রতিপক্ষ কাকে মনে হয়েছে?
সুব্রত: অষ্টম রাউন্ডে তাহসিন তাজওয়ারের সঙ্গে ম্যাচটি বেশ কঠিন ছিল। ওর জেতার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই জিতেছি।
প্রশ্ন :
২০১৮ সালে সাব-জুনিয়রে চ্যাম্পিয়ন হন। চার বছর পর এসে জুনিয়রে চ্যাম্পিয়ন হলেন। সাফল্যের ধারাবাহিকতাটা নেই কেন?
সুব্রত: ২০১৭ সালে জেতা একটা ম্যাচ হেরে সর্বনাশ হয়েছিল। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হয়েছে, এতেই খুশি।
প্রশ্ন :
আপনার দাবায় আসার গল্পটা বলবেন?
সুব্রত: আমার পরিবারের কেউ দাবা খেলে না। আমি খেলি, সেটা মা–বাবা কখনো চাননি। ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্রপাড়ের বিপিন পার্কের এক কোণে একটা বড় বটগাছ আছে। ওই গাছের নিচে কিছু আয়োজক প্রতি শুক্রবার দাবা টুর্নামেন্টের আয়োজন করত। সেখানেই খেলতাম। কিন্তু শুরুতে কেউ খেলতে নিত না।
প্রশ্ন :
কেন?
সুব্রত: ওখানকার নিয়ম ছিল, যার দাবার বোর্ড থাকবে, সে–ই খেলার সুযোগ পাবে। আমার কোনো বোর্ড ছিল না। অনেক কষ্টে টিফিনের টাকা জমিয়ে দাবার বোর্ড কিনি। খেলতে খেলতে একসময় জুনিয়রদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর বড় ভাইয়েরা খেলার প্রস্তাব দেন।
প্রশ্ন :
আপনার দাবার হাতেখড়ি হয় কার মাধ্যমে?
সুব্রত: অন্যের চাল দেওয়া দেখে দেখে খেলা শিখেছি। কিন্তু চাল দেওয়ার নিয়ম জানা মানেই তো দাবা শেখা নয়। এই পর্যায়ে আসতে অনেক লড়াই করতে হয়েছে।
প্রশ্ন :
কেমন লড়াই?
সুব্রত: আগেই বলেছি, বাড়িতে কেউ চাইত না দাবা খেলি। তাই বাসা থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসতাম। পরিবার চাইত, পড়াশোনা করতে হবে। আমি চাইতাম পড়াশোনা ছাড়াই দাবাড়ু হতে পারব। জেদ করে পড়াশোনা ছেড়ে সারাক্ষণ দাবা নিয়ে থাকতাম। চার বছর লেখাপড়া করিনি। ফেডারেশনের একটি কক্ষে থাকতাম প্রতিযোগিতার সময়। হাত খরচের জমানো টাকা থেকে রাস্তার হোটেলে গিয়ে খাবার খেতাম। পুরস্কারের যত টাকা পেতাম, সেসব দিয়ে শুধু দাবার বই কিনি। এর জন্য অনেকেই রাগারাগি করেছেন।
প্রশ্ন :
এর মানে পরিবারের সমর্থন পেলে আরও ভালো করতে পারতেন?
সুব্রত: এটা সত্যি। ফাহাদের (আন্তর্জাতিক মাস্টার ফাহাদ রহমান) বাবা সব সময় ওকে গাইড করেন। কিন্তু আমার কেউ নেই। তাই ক্যারিয়ারের প্রথম টুর্নামেন্ট জিতে যে ১৫ হাজার টাকা পেয়েছিলাম, সেখান থেকে গাড়িভাড়া রেখে বাকি টাকার বই কিনে বাড়ি যাই। বড় ভাই এটা দেখে বলেছিলেন, ‘তুই কি বোকা?’ মা বলেছিলেন, ‘দাবার বই দিয়ে কী হবে?’
প্রশ্ন :
আপনার কোনো কোচ আছে?
সুব্রত: না। আমার একজন কোচের খুব দরকার। কোনো সমস্যা হলে ফেসবুকে রাজীব (গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন) স্যার, রাকিব (গ্র্যান্ডমাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিব) স্যারের সহযোগিতা নিই। কিন্তু কোচিং করার জন্য পর্যাপ্ত টাকা আমার নেই। ২০১৮ সালে এলিগেন্ট চেস একাডেমি বিনা মূল্যে কিছুদিন কোচিং করিয়েছিল।
প্রশ্ন :
আপনার প্রিয় দাবাড়ু কে?
সুব্রত: গ্র্যান্ডমাস্টার ববি ফিশার। খেলার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বটা বেশি পছন্দ। উনি ভীষণ একগুঁয়ে ও জেদি। কোনো কিছুতে আপস করেন না। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম, ববি ফিশারের মতো কবে খেলব। ওনার মতো আমারও ড্র একদম পছন্দ নয়।
প্রশ্ন :
জুনিয়র দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনেকে হারিয়ে যান। আপনার লক্ষ্য কী?
সুব্রত: বাংলাদেশের ষষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হতে চাই।