‘আমি যদি ছেড়ে যাই, ফুটবল থাকবে না’
‘আমি ৯০ মিনিটের খেলোয়াড়’—চার বছর আগে বাফুফের সর্বশেষ নির্বাচনের আগে প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। ফুটবল মাঠের অপ্রতিরোধ্য স্ট্রাইকার নির্বাচনী মাঠেও সেটির প্রতিফলন রেখেছেন। প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও ২০১৬ সালে তৃতীয় মেয়াদে সভাপতি হন বাফুফের। আগামী ৩ অক্টোবর বাফুফের আরেকটি নির্বাচনে জিতে টানা চতুর্থবার সভাপতি হতে চান তিনি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যর্থতার নানা অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা। নির্বাচনে দুই সভাপতি প্রার্থীর ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বসে কাজী সালাউদ্দিন জবাব দিয়েছেন তাঁকে নিয়ে সমালোচনার—

আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। ‘সালাউদ্দিন হটাও’ স্লোগান উঠেছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

কাজী সালাউদ্দিন: আমার বিরুদ্ধে এসব পেশাদার প্রচারণা। চার বছর ধরেই এসব চলছে। এর সঙ্গে জড়িতরা নির্বাচন চায় না। নির্বাচন না হলে আমাকে সরাবেন কীভাবে!

আপনার কী মনে হয়, কেন এই প্রচারণা?

কাজী সালাউদ্দিন: আমাকে সরানোই মূল উদ্দেশ্য। এক জায়গায় হ্যাশট্যাগে আমার বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মন্তব্য এসেছে। এসব মন্তব্যে বলা হয়েছে, কাজী সালাউদ্দিন আহমেদকে সরাও। মজাটা হলো, আমার নাম কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ নয়, কাজী সালাউদ্দিন। একটা প্ল্যাটফর্ম থেকে যে এসব ছড়ানো হচ্ছে, বোঝা যায়।

বিজ্ঞাপন

বদলের ডাকের পর ভোটাররা আপনার ওপর আস্থা রাখবেন বলে মনে করেন?

কাজী সালাউদ্দিন: রাখবেন। কারণ, আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা শুধু নেতিবাচক খবর ফলাও করে প্রচার করছেন। টক শোতে কে কী বলল, এগুলোকে গুরুত্ব দেন। কই এটা তো বলেন না যে, কলকাতায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে বাংলাদেশ দল জিততে জিততে ড্র করেছে!

default-image

ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচ নিয়ে তো বাংলাদেশ দলের প্রশংসাই হয়...

কাজী সালাউদ্দিন: কয়দিন? দুই দিন করেই শেষ। আমার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার তো চলছেই। আপনি আমাকে হারাতে চান? নির্বাচনে আসুন।

বলা হচ্ছে, সভাপতি পদের প্রবল প্রার্থী তরফদার রুহুল আমিনকে প্রভাব খাটিয়ে আপনি নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন...

কাজী সালাউদ্দিন: এটা ঠিক নয়। আমি কেন সরাতে যাব? কেন সব বিষয় আমার ওপর চাপানো হচ্ছে! আমার তো এই নির্বাচনে আরও দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। দেখুন, রুহুল আমিন সাহেবটা কে? আপনারা তাকে মিডিয়ায় এনে ব্যাপক প্রচার দিয়েছেন। সে যখন শুরু করে তখন আমাদের এক সদস্য বলেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমরা তো ম্যারাথন দৌড়াই। আমিন সাহেবরা ২-৩ বছর পয়সাকড়ি খরচ করে যখন দেখবেন কিছুই হয় না, তখন চলে যাবেন।’ এজিএমের আগে তারা নানা কথা বলেছে। অথচ এজিএমে সবই পাস। আমাকে গালাগাল করা হচ্ছে, কিন্তু আমি গালাগাল দিতে জানি না। আমি ওই সমাজ থেকে আসিনি।

বাদল রায়ও বলেছেন, আপনার প্রভাবেই তাঁকে সরে যেতে হয়েছে। কী বলবেন?

কাজী সালউদ্দিন: এসব বাজে প্রচারণা। গতবারও ছিল, এবারও আছে।

আপনার ১২ বছরে ফুটবল আরও পিছিয়েছে বলে অভিযোগ। ফেসবুক সয়লাব আপনার বিরুদ্ধে নানা মন্তব্যে...

কাজী সালাউদ্দিন: একটি গোষ্ঠী এসব রটাচ্ছে। আমি বাফুফের সভাপতি হওয়ার আগে ফুটবলাররা ৩ লাখ টাকা পেত ক্লাব থেকে (২০০৮ সালে ১৫-২০ লাখ পেত), এখন পায় ৫০-৬০ লাখ টাকা। আগে লিগ ম্যাচ হতো শুধু ঢাকায়। এখন ৫-৬টা জায়গায় হয়। ফুটবলে করপোরেট প্রতিষ্ঠান এসেছে। এগুলো নিয়ে আলাপ হয় না। কিছু ব্যবসায়ী এসে টাকা ছড়িয়ে অপপ্রচার করছে। কিন্তু আমি পরিষ্কার বলি, ফেডারেশন থেকে আমাকে বের করতে দুটি পথ আছে। হয় আমি পদত্যাগ করব, নয় ব্যালটে হারানো।

২০১৬ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে বলেছিলেন, সেটাই আপনার শেষ। তাহলে আরও ৪ বছর কেন বাফুফে সভাপতি থাকার প্রয়োজন মনে করছেন?

কাজী সালাউদ্দিন: তখন হয়তো ও রকম ভেবেছিলাম। এবারও আমার শেষ হতে পারে, না–ও হতে পারে। তবে আমার অধিকার আছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আমি কী করব, সেটা আমিই ঠিক করব। আমি গত ১২ বছর নিয়মিত পেশাদার লিগ মাঠে রেখেছি। অন্য খেলাও আছে মাঠে। আপনারা আমার পেছনে লেগেছেন কেন? আপনারা ২০-২৫ বছর আগে অবসর নেওয়া কিছু ফুটবলারের সাক্ষাৎকার নেন, যাঁদের কোনো লক্ষ্য নেই। শুধু অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

default-image

আপনি বড় তারকা। আলোচনা-সমালোচনা তো হতেই পারে...

কাজী সালাউদ্দিন: আসলে এসবের কারণ, হয় আমার চেহারা খারাপ, নয় আমি বিশেষ কেউ, যে কিছু করতে পারে। আমার সময়ে জাতীয় দলের জয়ের হার ৫ ভাগ বেড়েছে। এগুলো আপনারা দেখেন না। নেতিবাচক প্রচার যেভাবে চলছে, কে আসবে মাঠে বলেন?

বেশ জনপ্রিয়তা নিয়েই তো ১২ বছর আগে বাফুফে সভাপতি হয়েছিলেন। তাহলে কেন আজ আপনার এত বিরোধিতা?

কাজী সালাউদ্দিন: উত্তরটা আপনিই দিয়ে দিয়েছেন। জনপ্রিয়তা এখনো আমার আছে। সমস্যা হলো, পেশাদার কিছু অপপ্রচার চলছে। স্বাভাবিকভাবে তারা আমাকে ফেলতে পারছে না বলেই এই পথ ধরেছে।

default-image

নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর ফুটবল উন্নয়নে আপনার ভূমিকা তেমন দেখা যায় না। প্রতিপক্ষের এমন অভিযোগের কী জবাব দেবেন?

কাজী সালাউদ্দিন: আসলে ফুটবল উন্নয়ন ফেডারেশন করে না। কাজটা ক্লাব, জেলার। ফুটবল ফেডারেশনের কাজ হলো টুর্নামেন্ট করা, জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ, দলের জন্য হোটেল, ভেন্যু ইত্যাদি ঠিক করা।

প্রিমিয়ার ও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ নিয়মিত হলেও ঢাকার নিচের দিকের লিগগুলো অনিয়মিত। গত ১২ বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পাইওনিয়ারে ৪টি বিভাগে ৪৮টি লিগের মধ্যে ২৫টিই হয়নি। এর কি ব্যাখ্যা দেবেন?

কাজী সালাউদ্দিন: এগুলো করার জন্য আলাদা কমিটি আছে। ঢাকায় পেশাদার লিগ ও দ্বিতীয় স্তর হয়েছে নিয়মিত। প্রথম থেকে তৃতীয় বিভাগের জন্য মাঠ মাত্র একটি। এটা বিরাট সমস্যা। কমলাপুরে টার্ফ বসানোর কারণে এক বছর খেলা হয়নি।

কিন্তু এত বছরেও মাঠ বাড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়নি...

কাজী সালাউদ্দিন: ঢাকা শহরে কোনো মাঠ আছে নাকি! আমি এটা নিয়ে ২৪ ঘণ্টা কথা বলছি। মাঠ দেন, মাঠ দেন।।

বিজ্ঞাপন

বিকল্প কিছু এত বছরেও হলো না..

কাজী সালাউদ্দিন: ২০০৮ সালের আগে যান। নিচের দিকের লিগগুলোর অবস্থা কী ছিল দেখেন।

আপনার কাছে প্রত্যাশা ছিল বেশি। সেটা তো মানবেন?

কাজী সালাউদ্দিন: আমি ১২ বছরে ১২টা লিগ দিয়েছি (পেশাদার লিগ ২০০৭ সালে শুরু হয়ে ১১টি হয়েছে)। পাইওনিয়ারসহ অন্য লিগ হয়েছে। ৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আমরা জেলাকে টাকা দিয়েছি। খেলা আয়োজনের দায়িত্ব সবার। আমাকে একা কেন দায়ী করা হচ্ছে?

আপনি তো জেলাগুলোর কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাননি কেন?

কাজী সালাউদ্দিন: কে বলেছে চাইনি? ৮-১০টি জেলা হয়তো লিগ করে না (আসলে আরও বেশি)। জেলাকে জিজ্ঞেস করেন। আপনারা ভাবেন সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধ নিউজ করলে নিজউটা খাবে।

আপনি স্বপ্নবাজ মানুষ। কিন্তু ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে খেলতে আপনার সেই 'ভিশন ২০২০' ব্যর্থ হলো কেন?

কাজী সালাউদ্দিন: ব্যর্থ তো হবেই। কোনো কিছু আমি একা করতে পারব না। ফুটবল উন্নয়নে চাই সরকার, ক্লাব, দর্শক, মিডিয়া সবার সহযোগিতা। সেটা কী আমি পাচ্ছি?

ফুটবলে টাকার প্রবাহ অনেক বেড়েছে। ফিফা টাকা দিচ্ছে। তারপরও কেন বাংলাদেশের ফুটবল কাঙ্ক্ষিত জায়গায় যেতে পারছে না?

কাজী সালাউদ্দিন: ফিফা আমাদের প্রশাসনিকসহ কিছু খাতে টাকা দেয়। সেই টাকা আরেক খাতে নেওয়া যায় না। এগুলো বুঝতে হবে।

আপনার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ভালো। বিদেশে সবাই আপনার প্রশংসা করেন। কিন্তু দেশে কেন নির্বাচন এলে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন?

কাজী সালাউদ্দিন: যারা এসব করছে তারাই ভালো বলতে পারবে। আমি ফুটবল বাঁচিয়ে রেখেছি।আমি যদি ছেড়ে যাই, তাহলে ফুটবল থাকবে না। কিন্তু একটি গোষ্ঠী চাচ্ছে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে।

default-image
বিজ্ঞাপন

কাজ করতে দলীয় সংহতি লাগে। অনেকে বলেন বাফুফেতে সেটার ঘাটতি আছে। কি বলবেন?

কাজী সালাউদ্দিন: দুই-চারজন উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন কাজে বিরোধিতা করেছে। তবে বাকিটা ঠিক আছে। সালাম, নাবিলরা ভালো কাজ করেছে।

বাফুফের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন?

কাজী সালাউদ্দিন: আমরা সঠিক পথে আছি। সরকার থেকে ২০ কোটি টাকা এনেছি। অথচ কিছু লোক সরকারের কাছে গিয়ে বলছে টাকা না দিতে। এসব বাদ দিতে হবে। আরেকটি কথা, আমি ম্যাজিশিয়ান নই। সবার চেষ্টা দরকার। একসঙ্গে কাজ করলে সফল হব আশা করি।

default-image

এবার ৩৬ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিলেও তার মধ্যে একাডেমির কোনো প্রতিশ্রুতি নেই...

কাজী সালাউদ্দিন: একটা একাডেমি তো আছে।

কিন্তু সেটা ফর্টিজ গ্রুপের । ফেডারেশনের নয়...

কাজী সালাউদ্দিন: আপনি সরকারকে বলেন টাকা দিতে। ৭ দিনে আমি একাডেমি করে দেব। কথা দিলাম এই মেয়াদে একটা একাডেমি করে দেব। তবে একাডেমি চলবে কীভাবে সেটা জানি না। টাকা কোথায়?

গতবারের বেশির ভাগ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। আপনি বলেছেন, গতবারের ইশতেহারটি আপনার নয়। এটা কীভাবে সম্ভব?

কাজী সালাউদ্দিন: ওটা আমার সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়নি। তরফদার রুহুল আমিন করছেন। এবারেরটি আমার। এবার ৮০ ভাগই কার্যকর হবে। তবে তা নির্ভর করছে ভোটাররা কাদের আনে ফেডারেশনে। একা আসলে কিছু হবে না।

ভোট সামনে রেখে দেশবাসীর কাছে আপনার কোনো বার্তা আছে?

কাজী সালাউদ্দিন: একটাই বার্তা, আমার ওপর আস্থা রাখুন।

মন্তব্য পড়ুন 0