বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনুশীলনের কথাই যখন উঠল, আপনাকে সম্প্রতি অনুশীলনে সুইপ শট খুব বেশি খেলতে দেখা যায়। এর কোনো বিশেষ কারণ?

এ শট নিয়ে আমি একটু আত্মবিশ্বাসী হওয়ার চেষ্টা করছি। কিছুদিন আগে জিম্বাবুয়েতে খেলে এসেছি। সেখানকার বাউন্সের কারণে ওই শটের প্রয়োজন ছিল না। তাই অনুশীলনও হয়নি তেমন। এরপর অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ছিলাম না। সেখানে খেলা দেখে মনে হয়েছে এই শট খুব কাজে লাগতে পারে। কন্ডিশনই এমন। এখানে সুইপ ছাড়া কোনো অপশন ছিল না। ওইটা নিয়েই কাজ করছিলাম। আইপিএলের পর বিশ্বকাপের কন্ডিশনেও শটটা কাজে লাগতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০১৮ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালে আপনার একটি ভালো ইনিংস ছিল। এবারের বিশ্বকাপও সেখানে। সেই স্মৃতি কি বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে?

ভালো খেলেছি সেটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই মাঠে খেলার অভিজ্ঞতা। আমার ওই মাঠটা সম্পর্কে ধারণা আছে। এটা প্রতিটা ক্রিকেটারকে এটা সাহায্য করে। উইকেট কেমন, মাঠের অ্যাঙ্গেল কি, কোন দিকে বাউন্ডারি বড়, কোন দিকে ছোট—এসব ব্যাপারে ধারণা আছে।

বিশ্বকাপের আগে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্সকে কীভাবে দেখছেন?

শেষ দুই সিরিজের রানখরা নিয়ে কেউই মনে হয় না ভাবছে। জিম্বাবুয়েতে যখন খেলেছি তখন সৌম্য ও নাঈমই কিন্তু রান করেছে। ওইখানে উইকেট ছিল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য আদর্শ। আর মিরপুরে যে দুটি সিরিজে খেলেছি, সেখানে বোলাররা দাপট দেখাবে, ব্যাটসম্যানরা কোনো রকম নিজের বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে খেলবে। তাই এই দুটি সিরিজ নিয়ে ভেবে কোনো লাভ নেই। যদি এই দুই সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ওপেনাররা রান করত, আর আমরা ব্যর্থ হতাম, তাহলে বুঝতাম আমাদের দক্ষতায় সমস্যা আছে।

আমাদের ও বাইরের দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে পার্থক্য এটাই। তাঁরা দিন দিন শট খেলার সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। আর আমাদের কমছে।
লিটন দাস

মিরপুরে নতুন বলে ব্যাটিং একটু বেশিই কঠিন মনে হয়েছে, বিশেষ করে স্পিনের বিপক্ষে। এটার কারণ কী হতে পারে?

নতুন বলের সিম অনেক খাঁড়া থাকে। স্পিনাররা বল করলে সিমে পড়লে বল ঘুরে। বলের পেটে পড়লে সোজা যায়। যেটা পুরোনো বলে খুব একটা হয় না। এটাই নতুন বল সবচেয়ে বড় জিনিস। আর আপনি যখন পরে ব্যাটিং করবেন, তখন বাইরে পাচ্ছেন পাঁচজন ফিল্ডার। প্যাডে হোক, ব্যাটে হোক, যে কোনো জায়গায় লাগলেই একটা রান হয়েই যাচ্ছে। ওপেনারের কিন্তু সেই সিঙ্গেল নেওয়ার সুযোগ কম। ফিল্ডার সবাই থাকে বাইরে। তাঁকে রান করতে হলে মারতে হবে। আর উইকেটের চরিত্র ছিল না মারার মতো।

এই উইকেটে খেলে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে আড়ষ্টতা তৈরি হচ্ছে, সেটা নিয়ে বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে রান করা সম্ভব?

মিরপুরের উইকেট সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং। এখন ওয়ানডে ক্রিকেটে কোনো জায়গায় তিন শ’র নিচে রান হয় না। যে তিন শ’র নিচে রান করে সেই দল হারে। একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, একমাত্র ভেন্যু মিরপুর, যেখানে আপনি ২৪০-২৫০ রান করলেও প্রতিযোগিতায় থাকেন। এমনকি জিতেও যেতে পারেন। এখানে ব্যাটসম্যানরা অনেক শট খেলতে পারে না। খেলতে হয় ধৈর্য নিয়ে। আপনি ভালো উইকেটে খেললে শট খেলার সামর্থ্য দিন দিন বাড়বে। এখানে তো আমাদের শট সীমিত। আমাদের ও বাইরের দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে পার্থক্য এটাই। তাঁরা দিন দিন শট খেলার সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। আর আমাদের কমছে। ওরা যেমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে শট খেলে, আমরা ওই সব খেলতে গেলে থাকি দ্বিধাদ্বন্দ্বে।

default-image

মিরপুরের একাডেমি ও ইনডোরের উইকেট নিয়ে কী বলবেন? বেশির ভাগ সময় তো আপনারা সেখানেই অনুশীলন করেন...

শট উন্নতি করার মতো অনুশীলন এখানে হয় না। খেলা যদি মিরপুরে হয়, আর সেটার জন্য যদি অনুশীলন করেন, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু অনুশীলন করে যদি নিজের শটে উন্নতি আনতে চায়, তাহলে একটু ঝামেলা। তবে আপনাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে যে কোনো কন্ডিশনেই মানিয়ে নিতে হবে। এখানে কোনো অজুহাত দেওয়ার কিছু নেই।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কি তাহলে আদর্শ হচ্ছে?

যদি অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করেন তাহলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটা অনেক আগ্রাসী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করেন তাহলে ভিন্ন কথা। এখানে খেলা হয় ১৪০-১৫০ রানের। অন্যান্য জায়গায় খেলা হয় ১৮০ রানের। ওই খেলাগুলোর জন্য আপনার স্ট্রাইক রেট বাড়াতেই হবে। আমার প্রস্তুতিটাও হয় সেরকম।

গত দুই বছরে দুই রকম লিটনকে দেখা গেছে। করোনার আগে আপনি ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন। করোনার পর আবার সেটি হারিয়েও ফেলেন। এর ব্যাখ্যা কি?

অনেক দিন কিন্তু খেলার বাইরে ছিলাম। প্রায় এক বছর। আপনি যখন ভালো করা শুরু করবেন, স্বাভাবিকভাবেই আপনার চাহিদা বাড়তে থাকবে। সে ক্ষেত্রে আমার প্রচুর ম্যাচ খেলা দরকার ছিল। আমি সেই সময় খেলতে পারলে ওই ছন্দে অনেক কিছু করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু করোনায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাট-বল থেকে দূরে ছিলাম। আমার সঙ্গে ব্যাট-বল থাকলে ব্যাট-বল কথা শুনবে। আমি যদি ঘুরে ফিরে এসে ম্যাচ খেলি তখন সফল হওয়ার সুযোগ থাকবে না। জিনিসটা এমনই।

default-image

এক জুনিয়র সতীর্থকে আপনি একবার বলছিলেন, ‘আমার নিজের ব্যাটিং বুঝতে ৩০ ম্যাচ লেগেছে। তোদের যেন এই সময়টা না লাগে।’ আপনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?

আমার স্পষ্ট মনে নেই। তবে নতুন যারা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলি। আমি যেহেতু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটা পাঁচ-ছয় বছর ধরে খেলছি, আমার ধারণা আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটা কেমন। যারা নতুন তাঁরা যদি আগে থেকেই এই জিনিসটা সম্পর্কে ধারণা পায়, তাহলে তাদের যে প্রতিভা আছে সেটা দিয়ে ওরা আরও দ্রুত ধারাবাহিক হতে পারবে। এই জিনিসটা আমি অনেককেই বলি। যে কাউকে এই কথাটা বললে ওর সুবিধা হবে, আমি সেটা বলে দিই। আমি তো কমবেশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি, আমি যদি এটা না করি তাহলে দলে আমার ভূমিকাটা কি?

৫-৬টা ম্যাচ খেলা আর আমার মতো ৬০-৭০টা ম্যাচ খেলা ক্রিকেটারের মধ্যে পার্থক্য তো থাকবেই। সে হয়তো আমার থেকে ভালো ক্রিকেটার, কিন্তু আমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেটা তো সে পাচ্ছে না। সেটাই আমি বলার চেষ্টা করি। আমি যখন দলে এসেছিলাম তখন আমি অনেক কিছুই বুঝিনি। না বুঝেই অনেক কিছু করে ফেলেছি। সেটাই ওদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। যে জিনিসটা বুঝতে আমার ২৫-৩০ ম্যাচ লেগেছে, সেটা যেন ৪-৫ ম্যাচেই ওরা বুঝে যেতে পারে।

আপনার ক্যারিয়ারের শুরুর শিক্ষাটা কী ছিল?

আমার ক্যারিয়ারের শুরুটাই তো ব্যর্থতায় ভরা। সাফল্য বলতে যদি দেখেন, সেটা হয়তো এশিয়া কাপের রান আর জিম্বাবুয়ে সিরিজের রান। আমার শুরুতে খেলাটা ছিল একদম ঘরোয়া ক্রিকেটের মতো। আমি ঘরোয়া ক্রিকেটে যেভাবে খেলতাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও সেরকমই খেলতাম। অথচ দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক।

আইপিএলে প্রতি দলেই তাদের দুই-তিনজন করে ক্রিকেটার খেলে। এখন একজন ভারতীয় ক্রিকেটার বিশ্বকাপে গিয়ে মিচেল স্টার্ককে খেলবে, সে স্নায়ুর চাপে থাকবে নাকি বাংলাদেশের কোনো একজন ক্রিকেটার স্নায়ুর চাপে থাকবে?

শুরুর ব্যর্থতা কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন?

জীবনে ব্যর্থ হওয়া খুব দরকার। তাহলে মানুষ অনেক কিছু জানতে পারে, শিখতে পারে। আমি সে জন্যই ব্যর্থতাকে সব সময় স্বাগত জানাই। ইউটিউবে দেখবেন অনেক মোটিভেশনাল স্পিকারের বক্তব্য পাওয়া যায়। ওগুলো শুনলে যে হতাশা থাকে সেগুলো কেটে যায়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনি যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিশ্চয়ই সেরকম ছিল না…

এটা তো স্বাভাবিক। আপনি ঘরোয়া ক্রিকেটে কাদের সামলাচ্ছেন আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাদের সামলাচ্ছেন সেটা বুঝতে হবে। আমি এখনকার কথা বলছি না। এখন খুবই ভালো আমাদের বোলাররা। চার-পাঁচ আগের কথা যদি চিন্তা করেন, হাতে গোনা ২-৩জন জোরে বল করার বোলার ছিল। রুবেল ভাই, তাসকিনরা ছিল। এই দুজন কয়টা দলে খেলবে বলেন? যে কোনো এক-দুইটা দলেই খেলবে। বাকিরা তো আর জোরে বল করার মতো বোলার না। কথার কথা, যদি চার বছর আগে তাসকিন আমাকে বল করত, সে হয়তো প্রথম স্পেলে পাঁচ ওভার বল করবে। সেই পাঁচ ওভারের সব বল আমি একা খেলব না। অন্য ব্যাটসম্যানও খেলবে। জিনিসটা অনেক কম হয়ে গেল না? ওই জিনিসগুলো তো কখনোই চ্যালেঞ্জিং ছিল না। এখন আবার অনেক ভালো। এখন সেটা নেই। এটা যে ব্যাটসম্যানরা উঠে আসছে, তাদের জন্য অনেক ভালো।

পেস বোলিংয়ের মতো লেগ স্পিনের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি তো একই…

বিশ্বের সব দলে লেগ স্পিনার আছে। কিন্তু আমাদের দেশে নেই। সেটা খেলারও তো একটা অভিজ্ঞতা লাগে। মাঠও অনেক বড়। আপনি চাইলেই যে মেরে বল বাইরে পাঠিয়ে দেবেন তা নয়। সেটা যে কোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা।

default-image

একই বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও সত্যি। বিশ্বমানের বোলার খেলার সুযোগ খুব কমই পায় বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানরা।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। প্রথম বিপিএলের আগে ও পরের বাংলাদেশের কথা একবার চিন্তা করেন। আমাদের আত্মবিশ্বাসে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছিল। আমরা দেখি যে ভারতের তরুণ ক্রিকেটাররা খুব ভালো করছে। যারই অভিষেক হচ্ছে সেই ভালো করছে। এই বছরটার কথাই চিন্তা করেন, ভারত ইংল্যান্ডে থাকল কত দিন, আর ইংল্যান্ড ভারতে থাকল কত দিন। ভারত থাকেই ইংল্যান্ডে ও অস্ট্রেলিয়ায়। ওদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। আর আইপিএলে প্রতি দলেই তাদের দুই-তিনজন করে ক্রিকেটার খেলে। এখন একজন ভারতীয় ক্রিকেটার বিশ্বকাপে গিয়ে মিচেল স্টার্ককে খেলবে, সে স্নায়ুর চাপে থাকবে নাকি বাংলাদেশের কোনো একজন ক্রিকেটার স্নায়ুর চাপে থাকবে?

ভারতীয়রা ওদের সতীর্থ। সতীর্থ হলে সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুত্বর মতো হয়ে যায়। তখন আত্মবিশ্বাসটা অন্য মাত্রায় চলে যায়। ভয় বলতে কিছু থাকে না। এসব বিষয় একজন উঁচু মানের পারফর্ম করতে সাহায্য করে। আমি যখন প্রথম বিপিএলে আন্দ্রে রাসেলের সঙ্গে খেলছিলাম, তখন অনেক নার্ভাস ছিলাম। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার বিষয়টা আরও কমে আসল। ক্রিস গেইলের সঙ্গে এখন মাঠে দেখা হলে সে আমার সঙ্গে হাই-হ্যালো করে। কারণ সে আমাকে চেনে। এই চেনার ব্যাপারটা আমার সাহস অনেক বাড়িয়ে দেবে। সাকিব ভাই কেন পারফর্ম করেন, কারণ দেশের বাইরে খেলে ওই আত্মবিশ্বাসটা তৈরি হয়েছে। যা বাংলাদেশের খুব কম ক্রিকেটারেরই হয়েছে।

কদিন আগে অ্যাশওয়েল প্রিন্স বলেছেন, আপনি বিশ্বের সেরা ১০ ব্যাটসম্যানের একজন হবেন। কী বলবেন?

আমাকে এভাবে কখনো বলেনি। আমার সঙ্গে কথাবার্তাগুলো হয় ব্যাটিং নিয়ে। এর বাইরে তেমন কোনো আলোচনা নেই যে আমি বিশ্বের এক, দুই, তিন ব্যাটসম্যান হব। এসবের কোনো মূল্য নেই। একজন এসে বলল, বিশ্বের এক, দুই, তিন নম্বর ব্যাটসম্যান হব। বাস্তবায়ন তো আমাকেই করতে হবে। এটা তখনই সত্যি হবে যখন আমি মাঠে প্রমাণ দিতে পারব।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন