default-image

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে ১৩ ক্লাবে খেলছেন ৫২ বিদেশি। লম্বা এই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের জাপানি মিডফিল্ডার ইয়োসুকে কাতো একটু আলাদা।

বড় ভাইয়ের মতো সতীর্থ ফুটবলারদের খোঁজখবর নেন। সবার রুমে রুমে যান।
গত ২২ ডিসেম্বর ফেডারেশন কাপ শুরুর আগে আর্থিক সংকটে মুক্তিযোদ্ধার দল গড়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়লে এগিয়ে আসেন কাতো।

ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে ঢাকায় জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মুক্তিযোদ্ধাকে সহায়তার আবেদন জানান।

একজন ফুটবলার হয়ে তাঁর কাজ মাঠে খেলা, কিন্তু খেলার পাশাপাশি দলের আর্থিক সংকট দূর করার উদ্যোগ নিলেন কেন? বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘জি’ ব্লকে মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দলের আবাসিক ক্যাম্পে বসে প্রথম আলোর মুখোমুখি কাতো—

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযোদ্ধার জন্য তহবিল সংগ্রহ করছেন আপনি। কিন্তু কেন?

কাতো: মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দলের একটা ঐতিহ্য আছে। এ দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ক্লাবটি গঠন করা হয়। কাজেই এই ক্লাবটিকে সবারই উচিত সহায়তা করা। যখন দেখলাম ক্লাবটি নানা সংকটে ধুঁকছে, তখন আমি এগিয়ে আসি।

এখন পর্যন্ত কতটা সাড়া মিলেছে?

কাতো: ফেডারেশন কাপে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান ১০ হাজার ডলার স্পনসরশিপ দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাকে। প্রিমিয়ার লিগে ১ কোটি টাকার স্পনসরশিপ দিয়েছে একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান, জাপানসহ ১৫২টি দেশে যাদের ব্যবসা রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের স্ত্রী জাপানি। তা ছাড়া এখন আমি অনলাইনে মুক্তিযোদ্ধার জন্য ক্রাউড ফান্ডিং করছি।

ক্রাউড ফান্ডিং ব্যাপারটা কী?

কাতো: বাংলাদেশে হয়তো ক্রাউড ফান্ডিং ব্যাপারটা পরিচিত নয়। তবে জাপানে এটা আছে। কেউ চাইলে অনলাইনে দর্শক, সমর্থকদের কাছে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারেন। জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধার জন্য আমার এই ক্রাউড ফান্ডিং করে দিচ্ছে। তাদের ১০ শতাংশ টাকা দিতে হবে।

default-image

এ পর্যন্ত কত টাকা উঠেছে?

কাতো: এ পর্যন্ত ২৬ লাখ ইয়েন বা ২৬ হাজার ডলার উঠেছে। ১২০ জনের বেশি জাপানি এই টাকা দিয়েছেন। তবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫০ হাজার ডলার না উঠলে সব টাকাই কিন্তু ফেরত যাবে প্রেরকের কাছে। এটাই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের নিয়ম।
প্রশ্ন: ব্যাপারটা একটু অভিনব মনে হচ্ছে। ৫০ হাজার ডলার না উঠলে, যা উঠেছে সব টাকাই ফেরত যাবে কেন? একটু বুঝিয়ে বলবেন?

ব্যাপারটা একটু অভিনব মনে হচ্ছে। ৫০ হাজার ডলার না উঠলে, যা উঠেছে সব টাকাই ফেরত যাবে কেন? একটু বুঝিয়ে বলবেন?

কাতো: নিয়ম হলো, আপনি কত দিনে কত টাকা তুলতে চান, সেটার লক্ষ্যমাত্রা আগেই দিতে হয়। আমি ৪৫ দিনের মধ্যে ৫০ হাজার ডলার লক্ষ্য দিয়েছি। এখন ৪৫ দিনের মধ্যে পুরো ৫০ হাজার ডলার না উঠলে, যা উঠেছে, ধরুন ৩০ হাজার ডলার উঠেছে, সেই ৩০ হাজার ডলারই প্রেরকদের কাছে ফেরত যাবে। ১৫ দিন সময় বাকি আছে। আশা করছি, সব টাকাই উঠবে।

এই টাকা দিয়ে কী করা হবে?

কাতো: মুক্তিযোদ্ধার ফুটবলারদের বেতন–ভাতাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে।

খেলাই আপনার কাজ। টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব কর্মকর্তাদের। তাহলে আপনি টাকা সংগ্রহ করছেন কেন?

কাতো: কারণ, মুক্তিযোদ্ধা দলটাকে ভালোবাসি। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। সেসব গল্প রোমাঞ্চকর। এসব লিখেছি ফেসবুকেও। নিয়মিত লিখি। বলতে পারেন মুক্তিযোদ্ধার জন্য কিছু করতে পারলে ধন্য হব।

মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এমন ভালোবাসা থাকলে গত লিগে আপনি শেখ জামালে চলে গিয়েছিলেন কেন?

কাতো: কারণ আছে অবশ্যই। আমি প্রথমবার বাংলাদেশে এসে মুক্তিযোদ্ধায় খেলি ২০১৮-১৯ মৌসুমে। দ্বিতীয় মৌসুমে বড় প্রস্তাব পেয়ে মুক্তিযোদ্ধায় যাই (জানা গেছে, মাসিক বেতন ছিল ৮ হাজার ডলারের মতো)। কিন্তু মাত্র ৬টি ম্যাচ হওয়ার পর কোভিডের কারণে গত বছর মার্চে লিগ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তখন আমি দেশে চলে যাই। এবার আর বাংলাদেশে ফিরতে চাইনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার ম্যানেজার আরিফুল ইসলামের অনুরোধে ফিরে আসি। সে আমাকে মুক্তিযোদ্ধার অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব করেন। সবকিছু ভেবে আবার এসেছি। কিন্তু এসে দেখলাম মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব আর্থিক সংকটে।

default-image

মুক্তিযোদ্ধা যে আর্থিক সংকটে ছিল, আপনি তা জানতেন না? আপনার নিজের টাকার দরকার নেই?

কাতো: আমি মুক্তিযোদ্ধার আর্থিক সংকটের কথা জানতাম না। জানতাম, ভালো দল গড়া হবে। আর অবশ্যই আমার টাকার দরকার আছে। আমার পরিবার আছে। তবে খেলার জীবনে আগে যেমন আমি টাকাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতাম, এখন ভাবি টাকাই সব নয় (জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধায় কাতোর মাসিক বেতন ৫ হাজার ডলারের আশপাশে)।

প্রশ্ন: জাপানে আপনার জন্ম কোথায়? পরিবারে কে কে আছে?

কাতো: টোকিও থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে ওসাকায় আমার জন্ম। সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক আমার স্ত্রী। একটিমাত্র বোন আছে। বাবার বয়স এখন ৭৪ বছর। মা–ও প্রায় একই বয়সী। তাঁরা ওসাকায় অবসরজীবনে আছেন। সরকার থেকে ভাতা পান। আমার চার বছরের একমাত্র ছেলে কিন্ডারগার্টেনে যায়। তবে ওর মায়ের স্কুলে নয়।

প্রশ্ন: মায়ের স্কুলে নয় কেন?

কাতো: জাপানে নিয়ম হলো, মা-বাবা যে স্কুলের শিক্ষক, সেই স্কুলে তাঁর সন্তানেরা পড়তে পারে না। অন্য স্কুলে পড়তে হবে। যাতে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে। আমার বাবাও স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্কুলে আমি পড়তে পারিনি। আমাকে যেতে হয়েছে অন্য স্কুলে (হাসি)।


প্রশ্ন: জাপানে করোনার কী অবস্থা এখন? আগামী জুলাই-আগস্টে অলিম্পিক গেমস হবে টোকিওতে?

কাতো: করোনায় ছয় মাস ওসাকায় থেকে গত নভেম্বরে ঢাকায় আসি। এখন টোকিওতে করোনার ঠিক কী অবস্থা আমার জানা নেই। তবে পরিস্থিতি ভালো নয় বলেই জানি। লকডাউন চলছে অনেক এলাকায়। অলিম্পিক হবে কি না, জানি না। তবে সরকার চায় অলিম্পিক আয়োজন করতে। কারণ, এখানে অনেক টাকার ব্যাপার।

বিজ্ঞাপন

সামনে ফুটবল নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

কাতো: ‘সি’ লাইসেন্স কোচিং কোর্স করতে চাই। জাপানে গিয়ে করব ভাবছিলাম। তবে অনেকে বলছে, ঢাকাতেই ওটা করা যাবে। আমি এখনো ফিট আছি। আরও তিন–চার বছর খেলতে পারব। তবে এখন আর অন্য দেশে গিয়ে খেলা কঠিন। তাই আমি আর দৌড়াদৌড়ি করতে চাই না। সম্ভবত মুক্তিযোদ্ধায় আর দু–এক মৌসুম খেলেই ক্যারিয়ারে ইতি টানব।

default-image

ফুটবল–জীবনটা কেমন কাটল এ পর্যন্ত?

কাতো: আমি সাতটি দেশে খেলেছি। যার মধ্যে আর্জেন্টিনায় পাঁচ বছর। ২০১২ সালে ডেম্পোতে খেলি। ডেম্পো তখন আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। থাইল্যান্ড চার বছর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়ায় খেলা হয়েছে। এখন বাংলাদেশ। সত্যি বলতে, এখানে খেলতে বেশ ভালো লাগছে।

প্রশ্ন: আপনি আর্জেন্টিনায় খেলেছেন। সেই গল্পটা কেমন?...

কাতো: আর্জেন্টিনায় খেলায় পর্বটা ছিল স্বপ্নের। বুয়েনস এইরেসের যেকোনো জায়গায় বা কোনো কফিশপে যান আপনি, সর্বত্র ফুটবল...ফুটবল। বুয়েনস এইরেস ছোট একটি শহর। অথচ এর আশপাশে অসংখ্য স্টেডিয়াম। অনেক পেশাদার ক্লাব। সেখানে বড় বড় ক্লাবের মধ্যে লড়াই, মারামারি চলে অহরহ। সে এক অন্য রকম উন্মাদনা। সেখানে রাস্তায় দেখা হলে স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন, কোন ক্লাবের সমর্থক আপনি? যদি বলা হয় অমুক ক্লাব...ওরা বলে, হে, কেন তুমি ওই ক্লাবকে সমর্থন কর? এটাই দেশটির সংস্কৃতি। প্রতিদিন হাজার হাজার সমর্থক মাঠে আসে। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পর রাস্তায় লোকজন আমায় বলেছে, কাতো তুমি খুব ভালো খেলেছ। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট যেমন সম্মান পান, তারকা ফুটবলারদেরও একই রকম সম্মান।

আর্জেন্টিনায় কোন স্তরে খেলেছেন?

কাতো: পাঁচ বছর আর্জেন্টিনায় দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগেই বেশি খেলেছি। প্রথম বা শীর্ষ লিগের ক্লাব হুরাকানে তিনটি ম্যাচ খেলা হয়েছে আমার। ২০০৭ সালে আমার বয়স তখন ২১। হুরাকানে অনেক বড় বড় প্লেয়ার ছিল ওই সময়। বর্তমানে রোমায় খেলা জেভিয়ার পাস্তেরো তখন এই দলে খেলেন। আমার পক্ষে সুযোগ পাওয়া ছিল খুবই কঠিন। যেটুকু সুযোগ পেয়েছি, দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছি। এখন মিডফিল্ডার।

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনায় কীভাবে গিয়েছিলেন?

কাতো: মাত্র ১৩ বছর বয়সে আমার হার্টে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসক বলেছিলেন, আমি ফুটবল খেলতে পারব না। কিন্তু আমার স্বপ্ন ফুটবল খেলব। মা–বাবার সহায়তায় বুয়েনস এইরেসের একটি একাডেমিতে ভর্তি হলাম। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা চলে যাই। দুই মাস ছিলাম তখন। ১০ হাজার ডলার খরচ হয়। তখন আমি সেখানকার স্টেডিয়াম দেখে রোমাঞ্চিত হই। জাপানে স্টেডিয়াম দেখে আমার এমন লাগেনি। চার বছর পর আবার যাই দেশটিতে। এভাবেই আমার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়।

ম্যারাডোনার বাড়ি গিয়েছিলেন?

কাতো: না, না। ওটা খুবই ডেঞ্জারাস এলাকা। ওদিকটায় যাওয়া হয়নি (হাসি)।

default-image

বাংলাদেশের ফুটবল কেমন দেখছেন?

কাতো: বাংলাদেশের ফুটবলে টাকা আছে। বসুন্ধরা, আবাহনী, শেখ রাসেল, শেখ জামাল, সাইফ—সবাই বড় বাজেটে দল গড়ছে। এটা ভালো। অন্যদিকে দেখুন, এশিয়ার ফুটবলে টাকা কমছে। আমি থাইল্যান্ডে খেলেছিলাম। ২০১৩-১৪ সালের দিকে থাইল্যান্ডে দ্বিতীয় বিভাগে খেললেও মাসে ৫-৬ হাজার ডলার পাওয়া যেত। কিন্তু সেখানেও ২০১৮-১৯ থেকে বাজেট নিচের দিকে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় দলগুলোর বাজেট কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশে খেলার আগ্রহ বেড়েছে বিদেশিদের মধ্যে। সংকট একটাই—এ দেশে ঘরোয়া ফুটবল দেখতে দর্শক তেমন আসে না।

ফুটবলার না হলে কী হতেন?

কাতো: হয়তো মা–বাবার মতো স্কুলশিক্ষক হতাম (হা হা হা)।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন