এশিয়ান গেমস সেমিফাইনালে উঠেই আপনার ব্রোঞ্জপদক নিশ্চিত হয়ে যায়। ঢাকা থেকে আসার আগে কি ভেবেছিলেন যে এমন ঐতিহাসিক কিছু অর্জন করতে পারবেন?
জিন্নাত আক্তার: না, একদমই ভাবিনি। এটি আমার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রথমবার এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ। প্রথমবার দেশের বাইরে এসে এমন একটা ফলাফল করা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।
প্রথম ম্যাচটিতে আপনি বাই পেলেন, আর দ্বিতীয় ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী অতিরিক্ত ওজনের কারণে প্রতিপক্ষ ডিসকোয়ালিফায়েড হলেন। সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত হওয়ার সময়ের অনুভূতি কেমন ছিল?
জিন্নাত: অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রথম ম্যাচে বাই পাওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে যখন কোয়ার্টার ফাইনালে উঠি, তখন দিলদার হোসেন দিলু স্যার (উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক) আমাকে বলেছিলেন, কোয়ার্টার ফাইনালে জিতলেই তোমার একটা পদক হয়ে যাবে। বাকিটা তোমার চেষ্টা আর আল্লাহর রহমত। আমি মানসিকভাবে সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ মেয়েটার খেলা দেখেছি, ওর খেলা দেখে কোচ ও ম্যানেজার আমাকে বিশেষ অনুশীলন করিয়েছিলেন। জয়ের লক্ষ্য নিয়েই তৈরি হয়েছিলাম। তবে আল্লাহর রহমতে আমার খেলাই লাগেনি। সেমিফাইনালে উঠে যাই। সতীর্থ, কোচ-কর্মকর্তা, দেশবাসী—সবার দোয়ায় এই সাফল্য পেয়েছি।
সেমিফাইনালে তো হেরে গেলেন চীনের বিশ্বমানের প্রতিযোগী উ দাইয়ের কাছে। খেলার সুযোগ পেয়ে নিজের সামর্থ্যের কতটা পরিচয় দিতে পারলেন?
জিন্নাত: আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু চীনের ওই খেলোয়াড় বিশ্বসেরাদের একজন। ওর সঙ্গে লড়াই করা ভীষণ কঠিন ছিল। প্রথম রাউন্ডের দুই মিনিটের মধ্যে ১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়েছি। দুবার আমি ম্যাটে পড়ে যাওয়ার কারণে সে জিতে যায় (৪-০ পয়েন্ট)। পরের দুই মিনিট আর খেলা হয়নি। এখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা আমার কাজে লাগবে।
ফাইনালে উঠতে না পারলেও আপনার এই ব্রোঞ্জপদকের মাধ্যমে দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে কোনো ব্যক্তিগত পদক পেল। এটা আগে থেকে জানতেন?
জিন্নাত: এসব আমার জানা ছিল না। ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর জানতে পেরেছি।
পদকটি কাকে উৎসর্গ করতে চান?
জিন্নাত আক্তার: আমার মরহুম বাবাকে। গত বছরের ২৩ নভেম্বর তিনি মারা গেছেন।
তিনি কী করতেন?
জিন্নাত: এমনিতে টুকটাক...।
টুকটাক বলতে কী?
জিন্নাত: কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। অসুস্থ হয়ে বাবা যখন মারা যান, বয়স ছিল ৭৩ বছর। আমার বর্তমান বয়স ২৩ বছর। মা-বাবার বিয়ের প্রায় ১২-১৩ বছর পর অনেক সাধনায় আমার জন্ম হয়। ফলে আমি অনেক আদর, ভালোবাসা পেয়েছি বাবা-মায়ের।
আপনার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে যদি আরেকটু বলতেন...
জিন্নাত: আমি গরিব পরিবারের মেয়ে। মা, আমি আর আমার একটি ছোট বোন আছে। আমার কোনো ভাই নেই, আমি সবার বড়।
গ্রাম থেকে একজন মেয়ে হিসেবে খেলাধুলায় উঠে আসতে গিয়ে কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে?
জিন্নাত: মেয়ে মানুষ তো, খেলাধুলায় আসায় গ্রামের মানুষ অনেক বাজে কথা বলেছে, বাধা দিয়েছে। মেয়েরা খেলাধুলা করে কী করবে...এমন কথা বলত। তবে মা–বাবার পুরো সমর্থন ছিল। তাঁদের কারণেই আজ আমি এত দূর পর্যন্ত আসতে পেরেছি।
খেলাধুলায় শুরুটা কীভাবে, উশুতেই–বা কীভাবে এলেন?
জিন্নাত: আমার খেলাধুলার শুরুটা হয় ফুটবল দিয়ে। আমি বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলেছি। ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে ডাক পাই। বাফুফে ভবনের ক্যাম্পে এক বছর ছিলাম। তবে ফুটবলের কোনো জাতীয় দলে খেলা হয়নি।
ফুটবল ছেড়ে উশুতে এলেন কেন?
জিন্নাত: পাসপোর্টের জটিলতার কারণে ফুটবলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারিনি। এরপর আমাকে আনসার ফুটবল দলে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকেই আমার উচ্চতা আর ওজনের কারণে উশু খেলায় যুক্ত হই। দিলু স্যার, শিবু, সাকি আপু, দিশা আপু, মিজান ভাই ও উত্তম ভাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। ২০১৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় আমি টানা ৭টি সোনা পেয়েছি।
আপনার উচ্চতা কত? আর উশু খেলায় উচ্চতা কেমন সুবিধা দেয়?
জিন্নাত: ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। উচ্চতা একটা বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করে।
ছোটবেলায় আপনার স্বপ্ন কী ছিল?
জিন্নাত: স্বপ্ন ছিল একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরব। আল্লাহ আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তবে আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য। ২০২৩ সালে সৈনিক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করি।
এশিয়াডের মতো বিশাল প্রতিযোগিতায় পদক নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে কেমন লেগেছে? বাড়িতে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে?
জিন্নাত: আনন্দের কারণে রাতে স্বাভাবিক ঘুম আসা সম্ভব ছিল না। এটা আল্লাহর অনেক বড় রহমত। মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, বাবা তো নেই...। মা আর পরিবারের সবাই এই অর্জনে খুশিতে কান্নাকাটি করেছেন।
এই অর্জনের পর দেশবাসী বা সরকারের কাছে আপনার কিছু বলার আছে?
জিন্নাত: বাংলাদেশে উশুর কোনো নিজস্ব ভেন্যু নেই। সরকারের কাছে আমার একটাই আকুল আবেদন—আমার এই অর্জনের উছিলায় হলেও বাংলাদেশে উশু খেলার জন্য যেন একটি নিজস্ব ভেন্যু তৈরি করে দেওয়া হয়।