আমিনুল ইসলাম এখন কোথায় আছেন, কী করছেন। এই কৌতূহলটা দিয়েই শুরু করি…
আমিনুল: ভালো আছি, বাংলাদেশেই আছি। মানুষের ভালোবাসা দেখতে দেখতে সময় কাটছে। বোর্ড সভাপতি হিসেবে কী করতে চেয়েছিলাম, কতটুকু করতে পেরেছি—সবকিছু পর্যালোচনা করছি।
পর্যালোচনা করে কী পেলেন?
আমিনুল: সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা। আর সভাপতি হিসেবে যা করেছি, তা ভাবলে বলতে হয় আলহামদুলিল্লাহ। আমি দুইটা বোর্ডের সঙ্গে কাজ করেছি। প্রথম চার মাস একটা ভাঙা বোর্ড নিয়ে চালিয়েছিলাম। একপর্যায়ে একা হয়ে গিয়েছিলাম, সবাই তখন নির্বাচনের জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়।
পরের বোর্ড নিয়ে ছয় মাস কাজ করেছি, পুরোটা সময়ই বাইরে ও ভেতর থেকে আমাকে ডিস্টার্ব করা হয়েছে। ট্রিপল সেঞ্চুরির বড় একটা প্রোগ্রাম নিয়ে এসেছিলাম, সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বোর্ডের পুরো সমর্থন পেয়েছি। কিন্তু বাইরের একটা শক্তি ও ভেতরে থাকা ফ্যাসিস্ট আমলের লোকগুলোর কারণে যা প্রস্ফুটিত করতে পারিনি।
তারপরও মনে হয় যে আমরা স্বচ্ছভাবে চালিয়েছি, আমার মনে হয় না কোনো ব্যর্থতা আছে। একটা ব্যর্থতা বলা হচ্ছে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া। কালকে (আজ) নিউজিল্যান্ড দল আসছে সিরিজ খেলতে, সরকার যদি বলে এই সিরিজ খেলা যাবে না, বাংলাদেশ কি খেলতে পারবে? না। সরকারের কথা শুনতেই হবে।
আপনি একটু ভুল বলছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমিই এখনো বিসিবি সভাপতি। যারা বোর্ড ভেঙেছে, তারা তা করতে পারে না, এখতিয়ারে নেই।সাক্ষাৎকারে বলেন আমিনুল ইসলাম
বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। আপনাদের বোর্ডকে যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হলো, সেদিনের ঘটনাটা বলুন। দুপুরবেলা আপনি পূর্বাচল মাঠ দেখতে গেলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বললেন, তখনো কি বোঝেননি যে বোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে...
আমিনুল: আপনি একটু ভুল বলছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমিই এখনো বিসিবি সভাপতি। যারা বোর্ড ভেঙেছে, তারা তা করতে পারে না, এখতিয়ারে নেই। আমি আর খালেদ মাসুদ পূর্বাচলে মাঠ দেখতে গিয়েছিলাম। পূর্বাচলের এই মাঠ নিয়ে আপনি চাইলে পুরো একটা বই লিখতে পারবেন। সেই নৌকা (ডিজাইন) কার বুদ্ধিতে হয়েছিল? কার নামে স্টেডিয়াম হয়েছিল? ওই জায়গাটার প্রতি আর কার কার চোখ আছে এখন, সবকিছুই আমি সামাল দিচ্ছিলাম। খেলা চালায়, এমন কিছু মানুষেরও চোখ আছে ওই জায়গাতে অন্য কিছু করার।
যা–ই হোক, ওখানে ৩টা মাঠ ও ১৮টা উইকেট তৈরি করার কাজ করছিল পাইলট (খালেদ মাসুদ)। আমি তা দেখতে গিয়েছিলাম। বিসিবিতে ফিরে শুনলাম বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তখন হঠাৎ করে মনে হলো, আমাদের অফিসটা একটা রাজনৈতিক অফিস হয়ে গেছে। শত শত লোক আসা–যাওয়া শুরু করল। একপর্যায়ে পাইলট আমাকে অনুরোধ করে বলল, ভাই, চলেন চলে যাই। তখন ফাহিম ভাই, আমি আর পাইলট বোর্ডে ছিলাম। আমরা চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু আমি দাবি করি ও বিশ্বাস করি, এখনো আমরা বৈধ ক্রিকেট বোর্ড এবং আমি বৈধ সভাপতি।
যে পরিস্থিতির কথা বললেন, তা না হলে কি আপনি এনএসসির বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও বিসিবি অফিসেই থাকতেন?
আমিনুল: হ্যাঁ। কারণ, ক্রিকেট বোর্ডের গঠনতন্ত্রে অ্যাডহক কমিটি বলে কিছু নেই। যারা এসেছে, তারা যদি আদালতের একটা কাগজ নিয়ে আসত, তখন তারা যত বড় রাজনৈতিক দল থেকে আসত, (আমার) কোনো প্রশ্ন নেই…। কিন্তু আমাদের মানসম্মান আছে। মানসম্মান নিয়ে জিনিসপত্র ফেলেই চলে এসেছি।
তদন্ত কমিটিকেও আমি অবৈধ ভাবি। কিসের তদন্ত করা হয়েছে? তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কী লেখা আছে, আমরা জানিও না এবং সেটা দেখিওনি। এই কমিটি কিসের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে?সাক্ষাৎকারে বলেন আমিনুল ইসলাম
তাহলে আপনি এখনো আপনাদের বোর্ড ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়াটা মেনে নেননি?
আমিনুল: এটা কোনো প্রক্রিয়া না, এটা একটা ষড়যন্ত্র। কেন বললাম? আমাদের দুটি জায়গা আছে, যাদের সঙ্গে কাজ করি। একটা আইসিসি, যাদের সঙ্গে যত ক্রিকেটীয় গভর্ন্যান্স, ক্রিকেটীয় অর্জন; এসব নিয়ে কাজ। আর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আছে, তাদের অন্যতম সদস্য বিসিবি। এনএসসির কোনো এখতিয়ার নেই বোর্ড ভেঙে দেওয়ার।
তাদের যেটুকু এখতিয়ার আছে, ডেকে জিজ্ঞেস করা। যদি কোনো অনৈতিক কাজ করি, ক্রিকেট ঠিকমতো চালাতে না পারি, আমাদের বোর্ড যদি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়— সে ক্ষেত্রে তারা আমাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারত; সুপারিশ করতে পারত।
তারা তো একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি করেছে। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আপনাদের কমিটি ভেঙেছে…
আমিনুল: তদন্ত কমিটিকেও আমি অবৈধ ভাবি। কিসের তদন্ত করা হয়েছে? তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কী লেখা আছে, আমরা জানিও না এবং সেটা দেখিওনি। এই কমিটি কিসের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে? এক দল লোক, যারা আদালতে গিয়েছিল কয়েকবার। এরপর দেখলাম, মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এই গ্রুপটা সব সময় ঘুরত।
ওনার দুটি হস্তক্ষেপের কথা বলতে পারি, প্রথম দিনই উনি সরাসরি প্রধান নির্বাহীকে ফোন করলেন সাংবাদিকদের ভেতরে ঢুকতে দিতে। আরেকটা হলো, কয়েক দিন আগে দেখেছেন বিসিবি একটা চিঠি দিয়েছে বিসিসিআইকে। এটা উনি সিইওর সঙ্গে বসে করেছেন, আমি শুধু কপিতে ছিলাম। এই যে সিস্টেমটাকে নষ্ট করে ফেলছে, এর দায় কে নেবে।সাক্ষাৎকারে বলেন আমিনুল ইসলাম
আপনি ওই তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হননি কেন?
আমিনুল: আমি তাদের কাছে প্রশ্ন জানতে চেয়েছিলাম, পাইনি। আর যে জিনিসগুলো তারা জানতে চেয়েছিল, আমার মনে হয়নি তাদের সঙ্গে কথা বলার কোনো মানে আছে। কারণ, তাদের প্রজ্ঞাপন যখন প্রকাশ করে, তখন যে বিষয় লেখা ছিল, সেটাই বলে দিচ্ছিল যে তারা আগেই উত্তর লিখে বসে ছিল।
যে কমিটিটা করা হয়েছে ওখানে যে আইনজীবী ছিলেন, তিনি নির্বাচনের সময় বিসিবিতে ছিলেন, এটা স্বার্থের সংঘাত। পুরো কমিটিটা…এমনকি সাংবাদিক যিনি ছিলেন, একজন সাবেক পরিচালককে নিয়ে তিনি পডকাস্ট করেছেন। পুরোটাই আমার কাছে কিছুটা জোক (রসিকতা) মনে হয়েছে।
কমিটিটা তো যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীরই করে দেওয়া। এখানে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
আমিনুল: তাঁকে একটা কথা বলব, আপনি ভাই ক্রিকেটের অনেক বড় ক্ষতি করে দিলেন। ওনার দুটি হস্তক্ষেপের কথা বলতে পারি, প্রথম দিনই উনি সরাসরি প্রধান নির্বাহীকে ফোন করলেন সাংবাদিকদের ভেতরে ঢুকতে দিতে। আরেকটা হলো, কয়েক দিন আগে দেখেছেন বিসিবি একটা চিঠি দিয়েছে বিসিসিআইকে। এটা উনি সিইওর সঙ্গে বসে করেছেন, আমি শুধু কপিতে ছিলাম। এই যে সিস্টেমটাকে নষ্ট করে ফেলছে, এর দায় কে নেবে। আমি তো চলে যাব, হয়তো আর কোনো দিনও আসব না। কিন্তু আপনারা তো এখানে থাকবেন, আপনাদের এই ক্রিকেটটাকে তো বাঁচাতে হবে।
নতুন কমিটি এর মধ্যেই কাজ শুরু করেছে, তাদের কাজ কেমন দেখছেন…
আমিনুল: সভাপতি হওয়ার পর থেকেই বিসিবিতে ঢুকতে তাদের মরিয়া ভাব দেখেছি। এখন অ্যাডহক কমিটি করেছে, তাদের কাজ নির্বাচন দেওয়া, কারও বেতন বাড়ানো না। তারা যা করছে, সবকিছুই অবৈধ। বেতন বাড়ানোটা আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকটা প্রতিদান দেওয়া।
এখন যে কোয়াব দেখতে পাচ্ছেন, কোয়াবের আগে একটা ‘ই’ লাগাবেন। এটা হচ্ছে এলিট ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। এটা যারা জাতীয় দলে খেলে এবং যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে তাদের সংগঠন। সারা দেশের কণ্ঠস্বর না। তাই এলিট ক্রিকেটারদের বেতন বেড়েছে, এটা তাদের একধরনের প্রতিদান দেওয়া, কারণ তারা (ক্রিকেটাররা) অনেক লোককেই সার্ভ করেছে।
কোয়াবের প্রতি আপনার এই ক্ষোভটা কি বিপিএলের খেলা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে? ওখানে তো সব ক্রিকেটারই ছিলেন…
আমিনুল: আমার জীবনের কালো দিন ছিল ওটা। এর পেছনে কারা ছিল, তা নিয়ে একটা তদন্ত হওয়া উচিত। আমিও জানি, তবে নাম বলব না। যারা সেখানে ছিল, আমার কাছে মাফ চেয়েছে। এ দেশের তারকা খেলোয়াড় তারা। পরে আমাকে এসে বলেছে, ভুল হয়ে গিয়েছে মাফ করে দিন, আমাদের এমন করা উচিত হয়নি। আমাদের হয়তো দেড় কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে, তবে সারা পৃথিবীর সামনে মুখ কালো হয়েছে।
আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, যেদিন খেলা বন্ধ হয়েছিল সেদিনই আইসিসির একটা প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার কথা ছিল বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনার জন্য। সেই দিনই কেন আন্দোলন হয়েছিল, একটা লোকের মন্তব্যের কারণে যারা বিপিএলের মতো একটা বড় খেলা বন্ধ করে দিল, আমি তাদেরকে ঘৃণা করি।
আমার কাছে মনে হচ্ছিল দেশটা বদলে গেছে। বদলে গেছে মানে খেলা ও রাজনীতি একসঙ্গে যাবে না। আমরা কিন্তু খুব জোর গলায় বলছি যে খেলোয়াড়েরা রাজনীতি করতে পারবে না। কিন্তু রাজনীতিবিদ কীভাবে তাহলে খেলায় আসে? তাদের কাজ তো রাজনীতি করা।সাক্ষাৎকারে বলেন আমিনুল ইসলাম
কিন্তু যাঁর মন্তব্যের জন্য এত কিছু, সেই এম নাজমুল ইসলামকে আপনারা সরিয়ে দিয়েও আবার ফিরিয়ে আনলেন। এটা কি ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিশোধ?
আমিনুল: আমি সরিয়ে দিইনি, আবার আনিওনি। আমাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটি আছে, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিসিপ্লিনারি কমিটির যিনি চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি এই কাজটা করেছেন। তাঁর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ছয় মাস আগে যখন আপনি সভাপতি নির্বাচিত হলেন, তখন তো জানতেন সামনেই জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক সরকার এলে এই বোর্ড ভেঙে যেতে পারে, এমন কিছু কি তখন ভেবেছিলেন?
আমিনুল: আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম। ২০টা সহযোগী সদস্যদেশের সঙ্গে কাজ করেছি, আফগানিস্তানের সঙ্গেও। সেসব দেশে সরকারের একটা চর্চা দেখেছি। আরেকটা জিনিস আমাকে সব সময় আত্মবিশ্বাস দিত, আমার কাছে মনে হচ্ছিল দেশটা বদলে গেছে। বদলে গেছে মানে খেলা ও রাজনীতি একসঙ্গে যাবে না। আমরা কিন্তু খুব জোর গলায় বলছি যে খেলোয়াড়েরা রাজনীতি করতে পারবে না। কিন্তু রাজনীতিবিদ কীভাবে তাহলে খেলায় আসে? তাদের কাজ তো রাজনীতি করা।
একটা বড় ক্লাবে গিয়ে মহান মহান সব রাজনীতিবিদেরা বলে এল, খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেলাবে না, কিন্তু বাস্তবে কী দেখলাম? তাদের কথাগুলো আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কখনো ভাবিনি যে একটা বোর্ড এত নগ্নভাবে ভেঙে দিতে পারে। ভাঙা বলব কি, তাড়িয়ে দেওয়া আরকি। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না।
কিন্তু আপনি যেভাবে প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন, সেটি তো এনএসসি কোটায় পরিচালক হয়ে, ওই প্রক্রিয়াটা নিয়েও তো প্রশ্ন আছে। এটা যে ঠিক হচ্ছে না, তখন কি আপনি সরকারকে তা বলেছিলেন?
আমিনুল: তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তবে সভাপতি হওয়ার আগে এক ঘণ্টা তার সঙ্গে আমার একটা সাক্ষাৎকার ধরনের কথা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে আমি জানতাম না। তবে আমি যত দূর জেনেছি, প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণভাবে গঠনতন্ত্রে যেভাবে আছে, সেভাবেই হয়েছে। বোর্ডের গঠনতন্ত্র সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে বসিয়ে অনুসন্ধান করেন। আমরা একচুল নড়িনি। হাইকোর্টে মীমাংসিত বিষয়গুলো সামনে আনুন এবং প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করে দেখুন কোথায় অনিয়ম হয়েছে। নির্বাচিত হতে না পারার ভয়ে যদি কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়, সেটা কেন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে?
অক্টোবরের নির্বাচনে আপনি যখন ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর যেভাবে হলেন, এটা নিয়েও তো প্রশ্ন আছে। মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে আপনাকে কাউন্সিলর করা হলো। দেখা গেল কিছুদিন পর তিনি জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ!
আমিনুল: কেউ কাউকে সরিয়ে দিতে পারে না। উনি সরে গেছেন। আর আশরাফুলের ব্যাটিং কোচ হয়েছে, তাঁর যোগ্যতা হচ্ছে আশরাফুল আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়, লেভেল থ্রি কোচ, স্পেশালাইজড ব্যাটিং কোর্স বাংলাদেশে হয়েছিল এর আগে কখনো হয়নি সেটা উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাটিং যেভাবে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ব্যাটিং কোচ দরকার ছিল। আমাদের আরও কিছু নাম ছিল, এগুলো থেকে আমরা আশরাফুলকে বেছে নিয়েছি।
আপনি যদি পার্থিব জীবন নিয়ে চিন্তা করেন, এটা একটা অসম্ভব ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু যখনই আমি ভাবি, আমাদের কাজটা কী? ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করা, দেশের জন্য কাজ করা। দেশের জন্য মানুষ বিভিন্ন ত্যাগ করে, আমি না হয় ছোট্ট একটা চাকরিই ছেড়েছি।সভাপতি হওয়াটা ভুল ছিল কি না, প্রসঙ্গে বলেন আমিনুল ইসলাম
ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি থাকতে না পারায় কি আপনার দুঃখ আছে?
আমিনুল: না, কোনো দুঃখ নেই। তবে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটটাকে ফিল করি। এই গতকালই ৩০ জন লেভেল থ্রি কোচ হলো। তারা যদি দেশের বাইরে করত, অন্তত সাড়ে ৪ লাখ ডলার খরচ হতো। এখানে মাত্র ২০-৩০ হাজার ডলারে করে ফেলেছি।
কানেক্ট এন্ড গ্রো প্রোগ্রামের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে প্রতিভা তুলে আনতে চেয়েছিলাম, সেটা হলো না। তারপর ধরেন ক্রিকেট বোর্ড এত বড় একটা অর্গানাইজেশন, এখানে কোনো ম্যানেজমেন্টই ছিল না। এই সবগুলো জিনিস কাভার করে ফেলেছিলাম। এবারের বিপিএলে ফিক্সিং কমে গিয়েছিল।
দেশজুড়ে আটটা ক্রিকেট সেন্টারের একটা সিলেটে চালু হয়ে গেছে। হেড অব ক্রিকেট, হেড অব এইচআর, হেড অব আইটি, হেড অব ডিজিটাল ঠিক করে ফেলেছিলাম। দু–এক দিনের মধ্যেই নিয়োগগুলো দেওয়ার কথা ছিল। আমরা যে নির্বাচক নিয়োগ দিয়েছিলাম, তিনি কিন্তু পুরো দেশের প্রধান নির্বাচক। বিভাগীয় নির্বাচকেরা দল নির্বাচন করবে, তিনি থাকতেন তাদের প্রধান। এভাবে বিভাগীয় দলগুলো দাঁড়াত। আমার কাজগুলো হয়তো এনএসসি বোঝেনি। কাজগুলো শেষ করতে না পারার কষ্ট তো থাকবেই। আমি তো জানি আমি কী করতে চেয়েছিলাম। হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভালোই হতো তাতে।
ব্যক্তিগত জায়গা থেকে আপনার কি এখন মনে হয় সভাপতি হওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
আমিনুল: আপনি যদি পার্থিব জীবন নিয়ে চিন্তা করেন, এটা একটা অসম্ভব ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু যখনই আমি ভাবি, আমাদের কাজটা কী? ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করা, দেশের জন্য কাজ করা। দেশের জন্য মানুষ বিভিন্ন ত্যাগ করে, আমি না হয় ছোট্ট একটা চাকরিই ছেড়েছি। আমার মনে হয় যে পরিমাণ মেধাস্বত্ব এখানে দিয়েছি, এটা টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না। খেলা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার ৪৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও আইডিয়া ফ্রি দিয়েছিলাম এখানে।
কিছুদিন ধরেই প্রসঙ্গটা আসে। বিসিবিতে আসলে কী আছে, যে জন্য সবার এতে ঢোকার এত আগ্রহ?
আমিনুল: আমিও সেটাই ভাবি। আমার পরিবার থাকে অস্ট্রেলিয়ায়, নিজের পয়সায় হোটেলে থাকি। জমি ছিল, ওটা বিক্রি করে চলছি, যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু বিসিবিতে কোনো মধু নাই। অনেক কাজ আছে।
আপনি কোন অর্থে বৈধ বলবেন এই কমিটিকে? আমাকে দুইটা কারণ বলেন।বিসিবির বর্তমান কমিটি নিয়ে আমিনুল ইসলাম
কিন্তু আপনার বোর্ডের অনেক পরিচালকই বেফাঁস মন্তব্য করেছেন, আপনি তো তাঁদের থামাতে পারেননি। তাঁদের সঙ্গে কি কোনো কথা বলেননি?
আমিনুল: না, আমি কখনো কারও সঙ্গে কথা বলিনি। এমনকি যখন বিপিএলের ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিল, আমি একটা পাতাও পড়িনি। কারণ, আমার ভাবনা ছিল, যার কাজ সে করুক। আমি তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।
কিন্তু তারা তো শেষ পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকল না। বোর্ড ভাঙার আগেই সাতজন পরিচালক পদত্যাগ করলেন।
আমিনুল: চাপে পড়ে করেছে। আগামী বোর্ডে নেওয়া হবে, এ কথা বলা হয়েছে অথবা হয়তো কোনো ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণে করেছে। তারা কেন পদত্যাগ করেছে, তা একদিন নিজেরাই বলবে।
আপনি কি তাহলে লড়াইটা চালিয়েই যাবেন। এই বোর্ডকে মেনে নেবেন না?
আমিনুল: আপনি কোন অর্থে বৈধ বলবেন এই কমিটিকে? আমাকে দুইটা কারণ বলেন।
এনএসসি তো চাইলে যেকোনো কিছু করতে পারে, তাদের আইনে বলা আছে…
আমিনুল: তারা চাইলে যা কিছু করতে পারে না।
এখন যদি বাংলাদেশে একটা ভূমিকম্প হয়ে যায়, সেটা কি তারেক রহমানের ব্যর্থতা হবে? টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলা ছিল সরকারের সিদ্ধান্ত, তা–ও নিরাপত্তার কারণে।টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলা প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম
তাহলে তো আইসিসির নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা, কেন দিচ্ছে না?
আমিনুল: আইসিসির ভেতরে–বাইরের সব গল্প আরেক দিন বলব। আপনাকে না, পুরো বিশ্বকেই বলব।
আপনার সভাপতিত্বের সময়ে আরেকটা ঘটনা, যেটা হয়তো সারা জীবনই আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে, বাংলাদেশের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলা। এটাকে কি আপনি নিজের ব্যর্থতা মনে করেন?
আমিনুল: এখন যদি বাংলাদেশে একটা ভূমিকম্প হয়ে যায়, সেটা কি তারেক রহমানের ব্যর্থতা হবে? টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলা ছিল সরকারের সিদ্ধান্ত, তা–ও নিরাপত্তার কারণে।
এটা যেন না হয়, অন্তত একজন সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে আপনি কি সেটার জন্য লড়েছেন?
আমিনুল: শুধু লড়াই–ই করিনি, রীতিমতো যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এটা তো আমি মানুষকে দেখিয়ে করব না। আসিফ নজরুল সাহেবদের সঙ্গে যেদিন বৈঠক হয়, ক্রিকেট বোর্ডের ঢাকায় থাকা ১৪–১৫ জন পরিচালক কিন্তু সিদ্ধান্ত দিয়ে এসেছিলেন। আমাদের যুদ্ধ কিন্তু সহজ ছিল—কেন মোস্তাফিজকে আইপিএল খেলতে দেওয়া হবে না, এটা ছিল নিরাপত্তা শঙ্কার কারণ। মোস্তাফিজকে দলে নেওয়া যাবে না, বাংলাদেশের সমর্থকেরা জার্সি পরে ঘুরতে পারবে না, এগুলোর নিরাপত্তা না দিলে হলো? আমাদের বাগ্বিতণ্ডা যা–ই বলেন, তা ভারতের সঙ্গে ছিল না, আমাদের অনুরোধ ছিল আইসিসির কাছে। সাধারণ একটা অনুরোধ ছিল ভারত থেকে সরিয়ে যেন শ্রীলঙ্কায় ম্যাচগুলো দেয়।
মজার ব্যাপার হলো, আইসিসিকে যখন লিখলাম, তখন আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড কিন্তু ই–মেইল দিয়েছিল যে আমরা তোমাদের সমর্থন দিতে তৈরি। গ্রুপ বদলাতে সমস্যা নেই। তারা আমাদের শুধু কথা দেয়নি, লিখিত দিয়েছে।
তারপরও কেন তা হলো না?
আমিনুল: এটা আমি বলব না। এখানে দুটো ব্যাপার—একটা হচ্ছে সরকারের সিদ্ধান্ত আর আইসিসির সাহায্য করতে না পারা। পরে পাকিস্তান যখন বলল ভারত ম্যাচ খেলব না, তখন ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে যাচ্ছিল। আমাকে আইসিসি লাহোরে উড়িয়ে নিল। আমি যদি তখন স্বাক্ষর না করতাম, তখন ভারত–পাকিস্তান খেলা হতো না। আপনারা লিখেছেন বিশ্বকাপ না খেলায় আমাদের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি হবে। কিছুই তো হলো না।
ক্রিকেটাররা অভিযোগ করেন, বিশ্বকাপ না খেলার এই পুরো প্রক্রিয়াই আপনি তাঁদের কিছু বলেননি। জানানো কি উচিত ছিল না?
আমিনুল: অবশ্যই জানানো উচিত ছিল এবং জানানো হয়েছে। যারা বলছে, তারা তাদের নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুক, তারা সব জানে। ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে কেউ বলেনি যে খেলতে যাবে। শুধু আফসোস করছিল। একটা লোকও বলেনি যেতে চাই।
আমরা বোর্ডটা স্বাধীনভাবে চালাতাম। ক্রিকেটারদের সব দায়িত্ব ক্রিকেট অপারেশন্সের কাছে ছিল। যত দূর জানি, তারা ক্রিকেটারদের জানানোর কাজটা করেছে। এখন এসব কথা বললে তো হবে না। তারা তো উপদেষ্টার সামনে জোর গলায় বলেনি যেতে চাই, আপনারা ব্যবস্থা করেন। আমরা ক্রিকেটার, দেশের সাংবাদিক ও যারা খেলা দেখতে যাবে, সবার নিরাপত্তার কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে আমরা কখনো বলিনি বিশ্বকাপ খেলব না। বলেছি খেলব, তবে ম্যাচগুলো ভারতের বদলে শ্রীলঙ্কায় হতে হবে।
সভাপতিজীবনের আর কিছু কি বলতে চান?
আমিনুল: সাংবাদিকদের কথা বলে শুরু করি। আমার ওপর তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন আমি ফোন ধরি না, সাক্ষাৎকার দিই না। আমি আপনাকে তিনটা গল্প বলব। এক. নির্বাচনের ঠিক আগে আমাকে একজন বড় টেলিভিশন চালায়, এমন একজন ফোন করে বলল আজ থেকে আপনার বিপক্ষে লেখা শুরু করব। আমি বললাম, কেন? বলল, যারা আমাদের টেলিভিশন চালায়, তারা অন্য একজনকে এনডোর্স করছে। আপনার পক্ষে আমরা বলব না। এই হচ্ছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্ট্যান্ডার্ড।
দ্বিতীয় গল্প হলো, একজন সাংবাদিক আমার বিরুদ্ধে বলল। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বলল, আপনি আমার ফোন ধরেন না, সাক্ষাৎকার দেন না। আরেকজন আছে, আসিফ আকবরের ভাষায় ছাপড়ি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সে গত কয়েক মাস ধরে আমার নামে মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত। সে আমাকে মেসেজ করে বলেছে, ‘আমার নম্বর ব্লক করে রেখেছেন, এটা নতুন নম্বর। আমরা আবার আগের সম্পর্কে ফিরে যেতে পারি কি!’
ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন?
আমিনুল: আপাতত হয়তো আমি একটা রিসার্চ টিমে কাজ করব। হায়ার কনশাসনেস, মাইন্ডফুলনেস ইন ক্রিকেট নিয়ে গবেষণা। একটা বড় চাকরির সুযোগ এসেছিল এসিসিতে। কিন্তু দুটি বড় দেশ সেখানে ভেটো দিয়েছে, সেটা হয়তো হবে না। অনেক তো কাজ করলাম, দেখি না এখন আল্লাহ নিশ্চয়ই ভালো কিছু লিখেছে। গবেষণা করব, বই লিখব, সেখানে হয়তো এই অধ্যায়টাও বড় করে থাকবে। ক্রিকেটের জন্য যাঁদের ডিপ্রাইভ করেছি, পরিবারের কাছে ফিরে যাব।