প্রবাসজীবনে কেমন আছেন আপনি আর রোমান? যুক্তরাষ্ট্রের কোথায় আছেন?
দিয়া সিদ্দিকী: নিউইয়র্কে আছি। সব জায়গায় সংগ্রাম আছে, এখানেও ব্যতিক্রম নয়। প্রথম প্রথম সেটা বেশি হচ্ছিল। এখন মাঝারি অবস্থায় আছি। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
যুক্তরাষ্ট্রে কী করছেন এখন?
দিয়া: আমি একটা ডেন্টিস্ট অফিসের বিলার হিসেবে আছি। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ইনস্যুরেন্স আছে। আমরা পেমেন্টগুলো চেক করি।
প্রতিদিন কয় ঘণ্টা কাজ?
দিয়া: কাজ সাড়ে ৭ ঘণ্টা। মাঝে ৩০ মিনিট বিরতি। সপ্তাহে পাঁচ দিন। দুই দিন বন্ধ। এখানে ঘণ্টা হিসেবে পারিশ্রমিক। আমাদের মালিক ভারতীয়-আমেরিকান একজন নারী। নাম ভিকি।
রোমান সানা কী করেছেন?
দিয়া: একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করছে। ছয় দিন কাজ ওর। এক দিন বন্ধ।
আপনারা গেছেন ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বরে। কাজ পেতে কত দিন লেগেছিল?
দিয়া: দুই মাস বসেছিলাম। তখন প্রচুর বরফ পড়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক কমে যায়। ওই সময় আমরা কোনো কাজ পাইনি।
নতুন পরিবেশ, নতুন আবহাওয়া, কীভাবে টিকে থাকলেন প্রথম দুই মাস?
দিয়া: এখানে টাকা থাকলে টিকে থাকা কঠিন নয়। নিউইয়র্ক অনেক বড় শহর। প্রথমে নিউ জার্সিতে ছিলাম। ওখান থেকে নিউইয়র্কে আসি। নিউইয়র্কে অসীম ভাইয়েরাও (সাবেক আর্চার) আছেন। ওনারা যথেষ্ট হেল্প করেছেন। হ্যাঁ, এখানে শুরুতে কাজ খোঁজাটা কঠিন ছিল। কারণ, নিউইয়র্কে বসে বসে খাওয়া যায় না। এখানে বাসাভাড়া এত বেশি যে দিতে গিয়ে মনে হয় সব বুঝি শেষ।
তাহলে সবকিছু সামলেছেন কীভাবে?
দিয়া: আমাদের হাতে কিছু টাকাপয়সা ছিল, যার কারণে প্রথম দুই মাস কাজ না করেও টিকে থেকেছি। আসলে এখানে চাকরি খোঁজাই ছিল সবচেয়ে বড় লড়াই। সেই লড়াটা পেরিয়ে এসেছি আল্লাহর রহমতে। অসীম ভাইয়েরাও বলেন যে তুমি অনেক ভালো একটা চাকরি পাইছ।
চাকরির বাইরের জীবনটা কেমন?
দিয়া: এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। ওসব জায়গায় ঘুরতে পছন্দ করি। কোথাও গিয়ে টুকটাক খাওয়াদাওয়া। তবে মূল ব্যাপার, ঘোরাঘুরি। এখানে সবকিছুর আইন আছে, যার কারণে অনিরাপদ লাগে না। তারপরও টুকটাক সমস্যা থাকে সব জায়গায়। এখানে কেউ কারও কোনো বিষয়ে নাক গলাই না। এই জিনিস আমার অনেক ভালো লাগে। এর মধ্যে ভালো খবর, এরই মধ্যে আমাদের অনেক পেপারস চলে আসছে।
পেপারস মানে গ্রিন কার্ডের?
দিয়া: হ্যাঁ গ্রিন কার্ডের। প্রক্রিয়া চলছে। আস্তে আস্তে ইনশা আল্লাহ হয়ে যাবে।
একবার খেলতে যাওয়ায় আপনাদের ভিসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে কি খেলোয়াড়ি পরিচয় কোনোভাবে সাহায্য করছে?
দিয়া: অবশ্যই। খেলোয়াড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে আমি কখনো দিয়া সিদ্দিকী হতাম না। আর অবশ্যই এটা হেল্প করছে।
ওখানে চাইলে আর্চারি চর্চা করার সুযোগ আছে?
দিয়া: সুযোগ আছে। বিভিন্ন ক্লাব আছে।
২৪ ঘণ্টা কাটে কীভাবে?
দিয়া: সপ্তাহটা কীভাবে চলে যায়, টের পাই না। ছুটির দিন একটু ঘুরতে–টুরতে যাওয়া হয়।
নিউইয়র্কে এখন পর্যন্ত কোথায় কোথায় গেছেন?
দিয়া: সেন্ট্রাল পার্ক, টাইমস স্কোয়ার, সেন্ট্রাল স্টেশন, হাটসন রিভার, রোজভেল আইল্যান্ড ইত্যাদি জায়গায় গেছি। চেরি ফুল ফোটে সব সময়, এমন জায়গায়ও গেছি।
বাঙালি খাবারই খাওয়া হয়?
দিয়া: হয়। তবে স্ন্যাক্স খাই না স্বাস্থ্যসচেতনায়। আমি চাই না, মোটা হয়ে যাই। ফিটনেস ধরে রাখি, যার কারণে বাসায় টুকটাক জিম করি।
রান্নাবান্না আপনিই করেন?
দিয়া: আমিই করি। রোমান অনেক হেল্প করে। তবে ওকে রান্না করতে দিই না। ও বেশি কষ্ট করে তো তা–ই।
দেশ ছেড়ে, খেলাধুলা ছেড়ে প্রবাসজীবন নিয়ে খুশি আছেন?
দিয়া: আলহামদুলিল্লাহ, খুশি আছি আমরা। চেষ্টা করি নিজের আত্মবিশ্বাস সব সময় ধরে রাখতে। তবে এটা ঠিক, আমরা নিউইয়র্কে সাধারণ মানুষ, কোনো অ্যাথলেট নই।
অথচ দেশে আপনি ছিলেন তারকা।
দিয়া: হ্যাঁ, ছিলাম। তবে জেনেবুঝেই সেই জীবন ছেড়েছি। ছেড়ে এসে ভুল করিনি। সম্মানীয় একটা কাজ করছি এখানে। কারও ট্যালেন্ট থাকলে সে অবশ্যই ভালো কিছু করতে পারবে। আমার মনে হয় এখানে মেয়েদের অনেক বড় সুযোগ আছে।
রোমান ক্ষোভ-হতাশায় বলেছিলেন, দেশ তো কিছু দিল না। এখন আর্থিক সংকট নিশ্চয়ই কেটেছে?
দিয়া: এ নিয়ে শুধু এতটুকুই বলব, আলহামদুলিল্লাহ।
দুজন থাকেন কোথায়? বাড়িটাড়ি কিনে ফেলেছেন এরই মধ্যে?
দিয়া: না, ওসব আরও পরে। এখন একটি বাঙালি বাসায় থাকি ভাড়া।
দেশ ছাড়ার সময় অনুভূতি কেমন ছিল?
দিয়া: অনেক টেনশনে ছিলাম। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিয়ে তখন চিন্তা ছিল। সে সময় ট্রাম্প ক্ষমতায় আসি আসি করছে। আমরা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিই দেশ ছেড়ে আসার। আমাদের টেনশন ছিল কীভাবে কাগজপত্র রেডি করব।
সুখের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন। সুখের দেখা কি পেলেন?
দিয়া: সুখ কী, জানি না। তবে আমার মনে হয় নিজের মতো বাঁচাই একটু সুখ। হ্যাঁ, হয়তোবা কেউ বলতে পারে, তুমি তো কারও অধীনে কাজ করছ। কিন্তু দিন শেষে আমি আমার মতো সবকিছু করতে পারি। আর সুখের সন্ধান করা যায় না। সুখ এমনিতেই ধরা দেয়। আমি যদি খুশি থাকি, সেটাই সুখ।
সুখ পাখি ধরতে গিয়ে নিজের আর্চার পরিচয়টা কি ভুলেই থাকেন?
দিয়া: বলব না যে আমি ভুলে গেছি, জিনিসটা হলো ভুলে যাওয়ার নাটক করি। এখানে তো আমরা আর্চার পরিচয়ে আসিনি। এসেছি সাধারণ মানুষ হিসেবে। অন্যান্য দেশে খেলতে গেলে সবাই আমাকে আর্চার হিসেবে জানত। তবে এখানে অনেকে যখন আমার নাম সার্চ দিয়ে দেখেছে, তখন জানছে আমি আর্চার ছিলাম। ওরা আমাকে বলে, এই যে আর্চার আসছে। অনেক সময় পরিচয় করিয়ে দেয় যে আমি আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় ছিলাম যে অলিম্পিক গেমসেও খেলেছি।
রোমানেরও কী একই রকম অভিজ্ঞতা?
দিয়া: একই রকম। তবে আর্চারি কথা বললে রোমান অনেক কষ্ট পায়। কারণ, ওর পুরা জীবনই ছিল আর্চারি। ওটা ছেড়ে সে এখানে আসছে। ওই একই জায়গা থেকেই আমাদের পরিচয়। কাজেই এটা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
রোমানের নিশ্চয়ই কাজের চাপ বেশি। তিনি রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। রোমানের কথা একটু বলুন।
দিয়া: ছেলেদের সব জায়গায় কষ্ট করতে হয়। তবে রোমান কষ্ট করছে দেখে ভালো লাগে না। তারপরও ভাবি, ইনশা আল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে।
আর্চারিজীবনের কোন স্মৃতি বেশি মনে হয়?
দিয়া: সবই। দেশের জন্য যা যা অর্জন করেছিলাম, আমার কাছে সবই বড়।
কাকে মিস করেন?
দিয়া: শুধু কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখকে। সত্যি কথা, ওনাকে একটা টেক্সট করার সাহস হয়নি আমার। কারণ, আসার সময় তাঁকে বলে আসিনি। বিদায় নেওয়া হয়নি। অথচ তিনি আমার জন্য অনেক করেছেন। তাই আমার মনে একটা আপরাধবোধ আছে। তবে আমি জানি, টেক্সট দিলে উনি ভালোভাবে উত্তর দেবেন। প্রতিদিন ভাবি দেব, কিন্তু আমার হয়ে ওঠে না। রোমান দিয়েছে।
আর্চারি আপনার জীবনে কী রেখে গেছে? গর্ব নাকি অপূর্ণতা?
দিয়া: বাংলাদেশের জন্য আর খেলতে না পারার একটা অপূর্ণতা আছে। আবার গর্বও কম নয়।
যখন ফ্লাইটে উঠছেন, শেষ কার মানে কার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন?
দিয়া: কারও কাছ থেকেই নয়। কারণ, কেউ তো যাননি বিমানবন্দরে। আব্বু-আম্মু ছিলেন, কিন্তু ওনারা জানতেন না একবারে চলে আসছি।
ফ্লাইটে ওঠার সময় ভয় হচ্ছিল?
দিয়া: না। কারণ, এটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত। কেউ তো জোর করে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেনি, যার কারণে ও রকম কোনো কিছু খারাপ লাগেনি।
দেশ ছাড়ার প্রথম রাতে ঘুমাতে পেরেছেন?
দিয়া: হ্যাঁ, পেরেছি। আমি সহজে সব জায়গায় ঘুমাইতে পারি (হাসি)।
প্রবাসজীবনে কঠিন দিক কী?
দিয়া: এখানে অনেক স্প্যানিশ মানুষ থাকেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগে একটু প্রবলেম হয়। তাঁরা ইংলিশ অত জানেনও না। আর আমরা স্প্যানিশ জানি না। এখানে দ্বিতীয় প্রধান ভাষা স্প্যানিশ। আমার কর্মক্ষেত্রে ৮০ ভাগ স্প্যানিশ। আমি কিছু স্প্যানিশ শিখেছি। এখন অনেকটা বুঝতে পারি।
গুগলে সার্চ দিয়ে নিজের কিছু দেখা বা ইউটিউবে নিজের পুরোনো খেলা দেখেছেন?
দিয়া: সার্চ দিইনি কিছু। তবে গত জুনে সিঙ্গাপুরে আলিফের এশিয়া কাপের ফাইনালটা দেখেছি। আর ঢাকায় নভেম্বরে হওয়া এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও একটু দেখেছি।
প্রথম আলো: দেশ ছেড়ে যাওয়ায় কোনো অনুশোচনা হয়?
দিয়া: হয়, কোচ মার্টিনকে বলে না আসার জন্য।
ছুটি পেলে কোথায় যেতে চান?
দিয়া: বাড়ি। তবে প্রথমে ঢাকায় নেমে যদি সময় থাকে তাহলে মার্টিনকে সালাম দিয়ে আসব।
বাংলাদেশে কাটানো কোন জায়গাটা সবচেয়ে বেশি মিস করেন?
দিয়া: বাড়ি আর সব থেকে বেশি মিস করি টঙ্গী, যেখানে আমাদের ক্যাম্প।
রোমানকে এককথায় বর্ণনা করবেন কীভাবে?
দিয়া: জেদি।
এখন বাংলাদেশ নামটা শুনলে কেমন লাগে?
দিয়া: ভয় লাগে। কিছুদিন আগে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে পাথর দিয়ে মারছে দেখা যায়, এর থেকে ভয়ংকর দৃশ্য হয় না।
রোমানের দিন-রাত কীভাবে কাটে?
দিয়া: সকালে আমাকে ট্রেন স্টেশন পৌঁছে দেয়। ১২-১টার দিকে নিজের কাজে যায়। আসতে আসতে রাত ৯টা-১০টা। আমার কর্মক্ষেত্র আমার বাসা থেকে ৪০ মিনিটের ট্রেন-দূরত্ব।
আপনাদের পরিবার আছে দেশে। সবকিছু মিলিয়ে পরিবার খুশি?
দিয়া: হ্যাঁ, পরিবার খুশি আছে। তবে ওই যে মন খারাপ হয়, পরিবারের লোকেরা বারবার জিজ্ঞাসা করে, কবে যাব। আমি দিন গুনতেছি, কবে বাংলাদেশে যাব। মা–বাবাকে, দাদুকে দেখব। শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। পরিবার এখানে থাকলে হয়তো আমি আর বাংলাদেশে না–ও যেতাম।
পিছুটান না থাকলে আর বাংলাদেশে আসতেন না?
দিয়া: না। তবে যদি এমন হয় যে মার্টিন অন্য দেশে চলে গেছে, ওনার অধীনে আমার প্র্যাকটিস করার সুযোগ আছে, তাহলে হয়তো আমি ওখানে প্র্যাকটিস করতে পারি। কিন্তু আমি দেশে গিয়ে একই জায়গায় আর আর্চারি খেলব না।
কেন এই ক্ষোভ–হতাশা?
দিয়া: ক্ষোভ-হতাশা নয়। আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ আমার মা–বাবা, ভাইবোন বা পরিবারের অন্যরা। তো ওনারা যদি এদিকে থাকতেন, আমি বাংলাদেশে কখনো আর যেতাম না। বাংলাদেশে গেলে যে জিনিসটা আর্চারির কথা মনে পড়ত বেশি। যে জিনিসটা আমি আর মনে করতে চাই না।
আর্চারি ফেডারেশনের প্রতি কোনো ক্ষোভ আছে?
দিয়া: নেই, ফেডারেশন আমাকে যথেষ্ট হেল্প করছে। আমি দিয়া সবার থেকে বেশি আদর পাইছি।
আর রোমান?
দিয়া: রোমান এসব বিষয় অনেক আগেই ছেড়ে দিছে। সে জাতীয় দল থেকে ইস্তফা দিয়েছে আগেই। ওর কোনো ক্ষোভটোভ নেই।
চলে যাওয়ার পরে বন্ধুবান্ধব, পরিবারের কাছ থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?
দিয়া: বেশির ভাগই বলছে ভালো করছি। জীবনে এটি সেরা সিদ্ধান্ত।
ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছেন?
দিয়া: ছোটবেলায় আমাকে ডাক্তার দিয়া বলতেন কাছের মানুষেরা। ভালো ছাত্রীও ছিলাম। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার বয়সে আর্মি অফিসার হওয়ার ইচ্ছা জাগে। কারণ, আমার দাদু-চাচ্চু আর্মিতে ছিলেন। আমার চাচ্চু এখন মেজর, উনি এখন কুয়েতে আছেন। আমার দাদুও কুয়েতে ছিলেন।
খেলার বাইরে আপনার শখ কী?
দিয়া: ড্রয়িং খুব ভালো পারি। কিন্তু আর্চারি এসে ওটা আর করতে পারিনি। আমার অনেক ড্রয়িং স্কেচ ছিল। পেনসিল স্কেচ থেকে পেন স্কেচ...সবই করতে পারতাম, তা ছাড়া আমি বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারি। এমব্রয়ডারির কাজ করতে আমার ভালো লাগে।
আর্চারিতে আসার গল্পটা কী?
দিয়া: নীলফামারীতে আমার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ভালোবাসতাম। আব্বু কখনো পড়াশোনার জন্য চাপ দিতেন না। বলতেন, ‘তুমি খেলো, গান শেখো, সব করো।’ একদিন স্কুলের শারীরিক শিক্ষক বললেন, ‘আর্চারি নামে নতুন খেলা আসছে, চেষ্টা করে দেখো, ভালো করলে ঢাকায় নেওয়া হবে।’ গেলাম, প্রথমে বাদ পড়লাম। পরে কোচকে গিয়ে বললাম, ‘আপনি তো আমাকে দেখলেনই না।’ উনি বুঝলেন, মেয়েটার ইচ্ছা আছে। সেখান থেকেই শুরু। সবার মধ্যে আমি টিকে গেলাম। তারপর বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া।
দেশে আসবেন কবে?
দিয়া: সুস্থ থাকলে এ বছর হয়তোবা কোনো একসময়।
আপনি যাওয়ার পর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টঙ্গীর ক্যাম্প ছিল নির্যাতনকেন্দ্র? আসলেই তা–ই?
দিয়া: আমি চর্টার সেল শব্দটা বলিনি। তবে হ্যাঁ, ওখানে অবশ্যই কিছু হয়েছিল আমার সঙ্গে। যে কারণে আমি অনেক আঘাত পাই। তবে চপল স্যারকে টেক্সট দিলেই তিনি উত্তর দেন। এটা আমার খুব ভালো লাগে।
দেশের শীর্ষ আর্চার ছিলেন। অনেক আন্তর্জাতিক পদক জিতেছেন দুজনই। কতটা মিস করেন দিনগুলো?
দিয়া: মিস করি না বললে মিথ্যা বলা হবে। অবশ্যই মিস করি। সব থেকে বেশি মিস করি কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখকে। তিনি আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছেন। কিন্তু আমি ওনার সঙ্গে ঠিক কাজ করিনি। ওনাকে বলেও আসিনি। এ কারণে মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করে।
কতটা অপ্রত্যাশিত ছিল এই প্রবাসী জীবন?
দিয়া: আমার কাছে অপ্রত্যাশিত কিছুই নয়। দিন শেষে অবশ্যই আমাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হতো। না ভাবলে হয়তোবা কোনো একটা বাহিনীতে চাকরি করতে হতো। বা পড়াশোনা শেষ করে কোনো অফিসে যোগ দিতে হতো। তবে যা একটু দেরিতে হওয়ার কথা ছিল, সেটা একটু আগে হয়ে গেছে।
রোমান আর্চারি কতটা মিস করেন?
দিয়া: আমার চেয়ে রোমানই বেশি মিস করে খেলাটা। কিন্তু ও বেশি আলোচনা করতে চায় না খেলা নিয়ে। কারণ, ছোটবেলা থেকে বলা যায় ওর রক্তে ছিল আর্চারি। ও পড়াশোনা বাদ দিয়ে আর্চারি শুরু করে, যার কারণে খেলাটা বেশি মিস করে। আমার তো সাত বছরের ক্যারিয়ার। ওর ১৪-১৫ বছরের। তবে দুজন এই বিষয় নিয়ে বেশি কথা বলি না।
খেলার কথা একদমই মনে হয় না?
দিয়া: আমি কোনো নিউজ দেখি না। কোনো খেলার খোঁজ রাখি না। আমার শুধু দুই একজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সিনিয়র হিসেবে খোঁজখবর নেন, এতটুকুই। যে জিনিসটা আপনার পছন্দের ছিল, তা নিয়ে যদি বেশি কথা বললে অবশ্যই খারাপ লাগে। তবে অতীত নিয়ে পড়ে থাকার দরকার নেই। বর্তমান নিয়েই থাকি।
দেশের কী মিস করেন?
দিয়া: বিকেএসপির সবাইকে। বিকেএসপির জুনিয়রদের সঙ্গে আমার অন্য রকম একটা সংযোগ ছিল। যতই হোক, ওটা আমার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আনসার আমাকে সুযোগ–সুবিধা দিয়েছে, বেতন দিয়েছে, এগুলো মনে পড়ে। তবে হ্যাঁ, একটা পেশায় ছিলাম। ওই জীবনটা সেরা ছিল। ওটার কারণেই আমি দিয়া সিদ্দিকী হতে পেরেছি।
জীবনে এখন লক্ষ্য কী?
দিয়া: অনার্স ফাস্ট ইয়ার শেষ করছিলাম ঢাকা ভার্সিটিতে। বিষয় ছিল ইতিহাস। পড়াশোনাটা শেষ করতে চাই। কারণ, সার্টিফিকেট দরকার দিন শেষে। এখানে সার্টিফিকেটের মূল্য আছে।