‘সেগুলো আপাতত নিজের কাছেই রাখছি’

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ওভারপ্রতি মাত্র ২.৮৮ গড়ে রান দিয়ে ৫ উইকেট। এরপর সদ্য সমাপ্ত টি–টুয়েন্টি সিরিজে ২ ম্যাচে নেন ৪ উইকেট। সাদা বলের ক্রিকেটে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা বাংলাদেশ দলের বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম আছেন ৮ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দলেও। তার আগে গতকাল কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে—

প্রশ্ন:

ওয়ানডে সিরিজে একাদশে সুযোগ পাবেন, এই সম্ভাবনাই ছিল না শুরুতে। সেখান থেকে ম্যাচগুলো শুধু খেললেনই না, দুর্দান্ত পারফর্মও করলেন। কেমন লাগছে?

শরীফুল ইসলাম: আলহামদুলিল্লাহ। প্রায় দেড় বছর পর মনে হয় ওয়ানডে খেলেছি। তা–ও আবার ম্যাচটা আমার খেলার কথা ছিল না, আল্লাহ হয়তো কপালে লিখে রেখেছিলেন। সে জন্য ম্যাচের দুই-তিন সেকেন্ড আগে (মোস্তাফিজুর রহমানের চোটে) সুযোগটা পেয়েছি। যত দিন বাইরে ছিলাম, চেষ্টা করেছি সব সময় প্রসেসটা ঠিক রাখতে। আমাদের সব পেসারই খুব ভালো করছিল। দলে বা একাদশে সুযোগ পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল তাই। লম্বা অপেক্ষার পর সুযোগ পেলাম, ভালোও করেছি। এ জন্য ভালো লাগছে। এভাবে ভালো করতে পারলে অধিনায়ক বা দলের সবাইকেই একটু নির্ভার করতে পারব। তারা ভরসাটা পাবেন যে একাদশের বাইরে থাকা খেলোয়াড়েরাও এসে পারফর্ম করতে পারে।

প্রশ্ন:

ওয়ানডের আত্মবিশ্বাস নিয়েই কি টি–টুয়েন্টিতেও ভালো করলেন?

শরীফুল: আসলে আমি তো পাকিস্তানেও (পিএসএলে) টি–টুয়েন্টি খেলেই এসেছিলাম। তারপর ভিন্ন সংস্করণে খেললাম। সংস্করণ আলাদা হলেও ওয়ানডেতে আমি চেষ্টা করেছি লাইন–লেংথ ঠিক রেখে বল করতে, সাফল্যও পেয়েছি। আর টি-টুয়েন্টি তো খুব কম সময়ের খেলা। এখানে যত তাড়াতাড়ি ভুলগুলো শুধরে নেওয়া যায় ততই ভালো। যেমন সিরিজের প্রথম ম্যাচেই আমি ৩৬ রান দিয়ে ফেলেছিলাম। ম্যাচ শেষ করে ড্রেসিংরুমে ফিরে পুরো বোলিংয়ের ভিডিও দেখলাম। পরের ম্যাচে চেষ্টা করেছি যেন যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলো আর না হয়।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টু–টুয়েন্টিতে ৩ উইকেট পেয়েছেন শরীফুল
শামসুল হক
প্রশ্ন:

টি–টুয়েন্টিতে তো আপনি স্ট্রাইক বোলার হয়ে গেলেন, এটা কি পারফরম্যান্সের চাপও বাড়িয়ে দিয়েছিল?

শরীফুল: এই যে স্ট্রাইক বোলারের কথাটা বললেন, অনেকেই তা বলে, আমি এটার সঙ্গে সত্যি বলতে একমত নই। কারণ, আমাদের দলে যারা পেসার আছে, আমি মনে করি সবারই এই সক্ষমতা আছে। আমরা সবাই একই রকম, সবাই পারফর্মার। যার দিন ভালো যায়, সে ভালো করে। এই সিরিজে আমাকে স্ট্রাইক বোলার বললেন বা পরের সিরিজে আরেকজনকে বললেন, আমি এটা মানি না। আমি মনে করি সবাই স্ট্রাইক বোলার। যার ভালো দিন যায় সে ভালো করে। অধিনায়কও সবাইকে ওভাবেই বিশ্বাস করে।

আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

দলের অন্যরা ভালো করছেন বলেই কি তাহলে প্রায় দেড় বছর ওয়ানডেতে সুযোগ পাননি?

শরীফুল: অবশ্যই। যখন একটা দল ঘোষণা হয়, তখন চার–পাঁচজন পেসার থাকে। কেউ হঠাৎ চোটে পড়ে গেল, সুযোগ পেয়ে যখন আরেকজন ভালো করবে—এটা দল বলেন বা টিম ম্যানেজম্যান্ট, তাদের একটা বিশ্বাস জোগাবে যে বেঞ্চে যারা আছে, তারাও ভালো করবে। আমি হয়তো উইকেট কম পেয়েছি, কিন্তু চেষ্টা করেছি নিজের সেরাটা দেওয়ার।

নিউজিল্যান্ডের টিম রবিনসনকে বোল্ড করেছেন শরীফুল (ছবিতে নেই)
শামসুল হক
প্রশ্ন:

দলে তো সবারই আলাদা আলাদা ভূমিকা থাকে, আপনার ক্ষেত্রে তা কী?

শরীফুল: আমি নতুন–পুরাতন দুই বলেই বোলিংটা উপভোগ করি। হয়তো কখনো সফল হই, কখনো ব্যর্থ। তবে আমি দুই ধরনের বলেই বোলিং উপভোগ করি। তবে প্রতিটা বোলারই চায় যারা ভালো ব্যাটিং করছে তাদের উইকেট নিতে। কারণ, তখন একটা বোলারের সামনে পুরো ম্যাচটা ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। সেটা যদি কেউ ঠিকঠাক করতে পারে, তাহলে ওই ভালো লাগাটা সত্যিই অন্য রকম। আমিও চাই সেট ব্যাটসম্যানকে আউট করতে। অনেক সময় সফল হই, অনেক সময় হই না।

আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

সামনে টেস্টও খেলবেন, যদিও পেসারদের জন্য তিন সংস্করণেই খেলাটা একটু চ্যালেঞ্জিং। এ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

শরীফুল: আমি কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিন সংস্করণে খেলেছি। মাঝে ইনজুরির কারণে পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম, এখন আবার ফিরে এসেছি। চেষ্টা করব এটা ধরে রাখতে, ওয়ার্কলোড বাড়িয়েও কীভাবে ফিট থেকে খেলা যায়। সব পেস বোলারেরই স্বপ্ন থাকে তিন সংস্করণে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার। আমি সেটা পারছি, ওই ভালো লাগাটা তো আছেই।

প্রশ্ন:

কোন সংস্করণ আপনার চোখে কেমন?

শরীফুল: টি–টুয়েন্টি অল্প সময়ের খেলা, ভুল করার সুযোগ কম। ৫০ ওভারে আলাদা আলাদা স্পেল, আর টেস্ট তো লম্বা সময়। একেকটা সংস্করণের একেক রকম চাহিদা থাকে। চেষ্টা করি সে অনুযায়ী বোলিং করতে।

২০২৪ সালের পর আর টেস্ট খেলেননি শরীফুল
এএফপি
প্রশ্ন:

টেস্ট ক্রিকেটের আলাদা কোনো গুরুত্ব কি আছে আপনার কাছে?

শরীফুল: আমার কাছে এই সংস্করণটা বিশেষ কিছু। যখন টেস্ট ম্যাচ জিতি, অনেক আনন্দ লাগে। টেস্ট ক্রিকেটে ফল বের করতে গেলে অনেক পরিশ্রম আর ধৈর্যের দরকার হয়। প্রতিটা সেশনেই খেলার মোড় ঘুরে যায়। আমি এটা খুব উপভোগ করি। টেস্ট ক্রিকেটের মজাটাই আলাদা।

আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ জেতা দলের ক্রিকেটার আপনি। ওই দল থেকে আপনিই সবার আগে জাতীয় দলে এলেন। এরপর ক্যারিয়ারটা যেভাবে এগিয়েছে, তাতে কতটা সন্তুষ্ট?

শরীফুল: ক্যারিয়ারে সবারই উত্থান–পতন থাকে, তা নিয়ে পড়ে থাকলে তো হবে না। চেষ্টা করি যেসব ভুল করছি সেগুলো পরের ম্যাচে আর না করতে। এভাবেই এগিয়ে যাই। সামনে যেন আরও ভালো কিছু করতে পারি, কোন কাজটা করলে উন্নতি করতে পারব, আমার মনোযোগ ওখানেই থাকে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে যদি তিন সংস্করণেই সমানভাবে সফল হতে পরি।  

পেস বোলিং কোচ শন টেইটের সঙ্গে শরীফুল (বাঁয়ে)
শামসুল হক
প্রশ্ন:

জাতীয় দলের বর্তমান পেস বোলিং কোচ শন টেইটের সঙ্গে আপনার বেশ আগে থেকেই পরিচয়। এটা কতটা কাজে লাগছে?

শরীফুল: কোচের সঙ্গে নিয়মিতই আলোচনা করি। আমি যখন বলি যে আমার রিস্ট এ রকম যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে? আমাকে উনি বলেন, ‘টেনশনের কিছু নেই। তুমি অনুশীলনে রিস্ট সোজা রেখে বল করতে থাকো, এটা অভ্যাস হলে আবার ফিরে আসবে।’ উনি সব সময় ইতিবাচক চিন্তাই করেন।

প্রশ্ন:

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের এখন অনেক প্রশংসা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় কিছু আপনাদের হাত ধরেই আসবে, আপনাদের মধ্যে কী কখনো এ রকম কথা হয়?

শরীফুল: ইচ্ছা তো আছে। দেখা যাক আল্লাহ কতটুকু সহায় হন। চেষ্টা করব আমাদের সেরাটা দেওয়ার জন্য। ব্যক্তিগতভাবেও অনেক স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেগুলো আপাতত নিজের কাছেই রাখছি।

আরও পড়ুন