‘আমার ছেলে যা হতে চায়, তা-ই হবে’: মায়ের সেই সাহসে ডায়াবেটিসকে হারিয়ে নিউইয়র্ক জয় জভেরেভের

পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রথম ১২ বছরে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিততে না পারা জভেরেভ এবার তিন মাসের মধ্যেই জিতে নিলেন দুটি।রয়টার্স

কখনো কখনো একটি ট্রফি শুধু ট্রফি থাকে না। তার ভেতরে জমে থাকে বছরের পর বছরের অপেক্ষা, একটি ভেঙে পড়া রাতের স্মৃতি, অসংখ্য প্রশ্ন আর প্রিয় মানুষের অদৃশ্য হাত।
আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম গতকাল তেমনই একটা ট্রফি জয়ের সাক্ষী হলো।

গ্যালারিতে তখন তুমুল করতালি, আলেক্সান্দার জভেরেভের হাতে সেই ট্রফি। গ্যালারিতে বাবা জভেরেভ সিনিয়র চোখের জল আটকাতে পারছেন না। ছেলে জিতেছেন, অথচ বাবার চোখ ভিজে যাচ্ছে এমন এক আবেগে, যা কোনো ট্রফির মূল্যে মাপা যায় না।

বেন শেলটনকে ৬-৩, ৭-৬ (২), ৫-৭, ৬-২ গেমে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ইউএস ওপেন শিরোপা জিতলেন জভেরেভ। কিন্তু এই রাত তাঁর জেতা অন্য যেকোনো শিরোপার চেয়ে আলাদা। ছয় বছর আগে এই একই কোর্টে দুই সেটে এগিয়ে থেকেও ডমিনিক থিমের কাছে হেরে গিয়েছিলেন তিনি, পঞ্চম সেটের টাইব্রেকে ভেঙে পড়েছিল স্বপ্ন। সেই আক্ষেপ এবার মুছে দিলেন ২৯ বছর বয়সী জার্মান।

আরও পড়ুন

এটি তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম। কিন্তু জভেরেভের কাছে এটি সম্ভবত সব শিরোপার চেয়ে আলাদা। কারণ, এই ট্রফির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি চার বছরের শিশুর গল্প। সেই শিশুর মায়ের গল্প। আর এমন এক লড়াইয়ের গল্প, যেখানে প্রতিপক্ষ কখনো র‍্যাকেট হাতে দাঁড়ায়নি, তারপরও প্রতিদিন তাকে হারিয়ে এগোতে হয়েছে। সেই প্রতিপক্ষ জভেরভের নিজেরই শরীর!

৬ বছর পর আরেকটি ফাইনাল খেলে এবার ইউএস ওপেন জিতলেন আলেকসান্দার জভেরেভ
রয়টার্স

ট্রফি গ্রহণের সময় জভেরেভ কথা বললেন এমন একজন মানুষকে নিয়ে, যার নাম উচ্চারণও করলেন না, ‘আমি আসলে আরও একজন মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি কখনো আমার ম্যাচ দেখেন না। কিন্তু আমার টেনিস জীবন এবং ব্যক্তিজীবনে তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।’

কথা বলতে বলতে থেমে গেলেন জভেরেভ। দুবার বাক্য শেষ করতে পারলেন না। গলায় জমে থাকা আবেগ যেন শব্দগুলোকে আটকে দিচ্ছিল। তারপর বললেন, ‘যখন আপনার চার বছর বয়সী ছেলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় এবং চিকিৎসকেরা বলেন, তার জীবন ও খেলাধুলার ভবিষ্যৎ খুব সীমিত হতে পারে, তখন সেই চিকিৎসকদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একজন অত্যন্ত শক্ত মায়ের প্রয়োজন হয়।’

হ্যাঁ, সেই মানুষটা জভেরভের মা! যার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে এল জভেরভের, ‘চিকিৎসকের সেই চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে বলতে পারা, “আমার ছেলে যা হতে চায়, তা–ই হবে”...এর জন্য অসাধারণ শক্তি লাগে। মা বলেছিলেন, সে যদি টেনিস খেলোয়াড় হতে চায়, তবে তা–ই হবে। অন্য কিছু হতে চাইলে, তা-ই হবে। কিন্তু এই রোগ আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে না। আমার মা আমার দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী।’

ম্যাচ চলাকালে ইনসুলিন নিচ্ছেন জভেরেভ।
ইউএস ওপেন

জভেরেভের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তাঁর শরীরে ধরা পড়ে টাইপ-১ ডায়াবেটিস। চিকিৎসকেরা তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন, এই রোগ ভবিষ্যতে তাঁর জীবনযাপন এবং খেলাধুলার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একটা বাচ্চার জন্য, তার মা-বাবার জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর খবর আর কী হতে পারে। কিন্তু জভেরভের মা ইরিনা জভেরেভ সেটাকেই শেষ কথা হিসেবে মেনে নেননি। পরে এক সাক্ষাৎকারে ইরিনা বলেছিলেন, শুরুর সেই বছরগুলো কতটা কঠিন ছিল। জভেরেভের রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করতে এবং ইনসুলিন দিতে তাঁরা প্রতি রাতে তিনবার করে ছেলেকে ঘুম থেকে তুলতেন। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন। একদিকে ছিল সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে ভয়। অন্যদিকে ছিল স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার অদম্য চেষ্টা। ধীরে ধীরে তাঁরা শিখে নেন কীভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। কীভাবে একজন শিশুকে বড় করে তুলতে হয়, যে অন্যদের মতোই দৌড়াবে, খেলবে, স্বপ্ন দেখবে।

স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি জভেরেভও। এবারের ইউএস ওপেনেও দর্শকদের নজরে পড়েছে জভেরেভের একটি অস্বাভাবিক অভ্যাস। ফাইনাল চলার সময়ও বিরতিতে তাঁকে বারবার একটি মুঠোফোনের মতো ডিভাইস দেখতে দেখা যাচ্ছিল। টেনিস ম্যাচে সাধারণত খেলোয়াড়দের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু জভেরেভ কারও সঙ্গে যোগাযোগও করছিলেন না। তিনি নিজের শরীরের ভেতরের খবর নিচ্ছিলেন।

খেলার মাঝেই রক্তে শর্করা পরীক্ষা করতে হয় জভেরেভকে।
ইউএস ওপেন

জভেরেভের সঙ্গে থাকা ওই বিশেষ ফোনটির কোনো সিম কার্ড বা মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগ নেই। ব্লুটুথের মাধ্যমে এটি তাঁর শরীরে থাকা কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফোনের পর্দায় তিনি দেখতে পারেন তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা কত, সেটি বাড়ছে, নাকি কমছে। প্রয়োজনে ইনসুলিন নেন। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, ডায়াবেটিস নিয়ে টেনিস খেলা মানে ‘একসঙ্গে দুটি ম্যাচ খেলা’। একটা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে, আরেকটা নিজের শরীরের বিপক্ষে।

প্রথম দুই সেট জভেরেভ জেতার পর বেন শেলটন তৃতীয় সেটটা ৭-৫ গেমে জিতে নিয়ে গ্যালারির পুরো সমর্থন নিজের দিকে টেনে নিলেন। তখন মনে হচ্ছিল আবার বুঝি ছয় বছর আগের সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। ঠিক তখনই জেভরেভ বের করে আনলেন নিজের ভেতরের সেই একগুঁয়ে চার বছরের ছেলেটাকে। চতুর্থ সেটে দ্রুত ব্রেক আদায় করে ৬-২ গেমে জিতলেন।

এই জয়ে জার্মান টেনিসেও নতুন একটি অধ্যায় লিখেছেন জভেরেভ। বরিস বেকারের পর দ্বিতীয় জার্মান হিসেবে একই বছরে রোলাঁ গারোঁ ও ইউএস ওপেন জয়ের কীর্তি গড়লেন।

ইতিহাসের পাতায় নাম ওঠার মুহূর্তেও জভেরেভের হয়তো মনে পড়ছিল সেই ছোটবেলার কথা। মা–বাবার সেই নির্ঘুম রাতগুলোর কথা। আর মায়ের সেই কথাটা, যা তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছে, ‘আমার ছেলে যা হতে চায়, তা–ই হবে।’

মা পাশে থাকলে কি কোনো ছেলে হারতে পারে!