‘ব্রাজিলের খেলা দেখছি, এমন অনুভূতি পুরো ম্যাচে একবারও আসেনি’
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটুখানি ঝলক ছাড়া এই ব্রাজিল আমাকে যারপরনাই হতাশ করেছে। মূলত ভিনির অসাধারণ এক মুহূর্তের ব্যক্তিগত জাদুকরি দক্ষতার জোরেই কোনোমতে হার এড়িয়ে ম্যাচটি ড্র করতে পেরেছে সেলেসাওরা।
অথচ ছোটবেলা থেকেই আমি ব্রাজিলের সমর্থক হওয়ায় দলটার প্রতি আমার অন্য রকম একটা ভালোবাসা কাজ করে। যখনই ব্রাজিল মাঠে নামে, আমি সব সময় ঐতিহ্যবাহী ‘সাম্বা ফুটবল’ দেখতে চাই। অতীতে বহুবার তারা এই নান্দনিক ফুটবল খেলে আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাদের খেলা দেখেই দলটাকে আরও বেশি ভালোবেসেছি।
স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিলের কাছে প্রত্যাশাটাও থাকে অনেক বেশি। তবে আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ, কখনো স্রেফ আবেগ দিয়ে কোনো দলকে মূল্যায়ন করি না। আর সেই বাস্তবতাবোধ থেকেই এবারের বিশ্বকাপ শুরুর দিন ‘প্রথম আলো’য় ছাপা হওয়া আমার কলামে লিখেছিলাম: ব্রাজিল আমার প্রিয় দল হলেও এই বিশ্বকাপে ওরা ফেবারিট নয়। হলুদ জার্সিধারীদের প্রথম ম্যাচটি আমার সেই আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করল। ‘ব্রাজিলের খেলা দেখছি’, এমন অনুভূতিটা পুরো ম্যাচে একবারও আসেনি আমার মনে।
আমার এই হতাশা শুধু ম্যাচটি ড্র করার জন্য নয়; বরং মাঠজুড়ে ব্রাজিলের ছন্দহীন ফুটবল আর ভুল পাসের ছড়াছড়ির কারণে। মাঝমাঠে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না দলটির, আক্রমণভাগও ছিল পুরোপুরি ধারহীন। এই দলটা না পারছিল ভালো কোনো সুযোগ তৈরি করতে, না পারছিল বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল বলতে আমরা যে পাসিং ফুটবল বুঝি, পুরো ম্যাচে সেটার বড্ড অভাব ছিল। যখনই ওরা চেষ্টা করেছে, তখনই মিস পাস হয়েছে। ব্রাজিল কোনো সাবলীল ফুটবল খেলতেই পারেনি; বরং তাদের ভীষণ নার্ভাস লেগেছে।
রাইট-ব্যাকে রজার ইবানেজ, স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো, মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতা, রাইট উইঙ্গার রাফিনহা—ম্যাচে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেননি। পরের ম্যাচে কোচ আনচেলত্তিকে একাদশে দুই-তিনটি পরিবর্তন আনতেই হবে।
অন্যদিকে প্রথমার্ধে মরক্কোর গতিশীল মিডফিল্ডারদের থামাতে গিয়ে গতিতে পিছিয়ে পড়েন কাসেমিরো। প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখে তিনি দলকে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিলেন। রক্ষণে রজার ইবানেজকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে এই দুজনকে তুলে ফাবিনিও ও দানিলোকে নামিয়ে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচে তাঁর দলের বিপর্যয় আটকেছেন বলতে হবে।
বিপক্ষ দল মরক্কোর প্রশংসা না করে উপায় নেই। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা এবারও দুর্দান্ত গতিশীল ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে তাদের মাত্র ১৮ বছর বয়সী তরুণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি (জার্সি নম্বর ৬) পুরো মাঝমাঠ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ছেলেটার পারফরম্যান্স এককথায় অসাধারণ ছিল। আর ইসমায়েল সাইবারির গোলটা ছিল মাত্র তিনটি পাসের ফসল। এত দ্রুত আক্রমণ আর ফিনিশিং দেখার মতো দৃশ্য।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল ও মরক্কো যথাক্রমে ৬ ও ৭ নম্বরে রয়েছে। অর্থাৎ তালিকার পিঠাপিঠি অবস্থানটি যে মাঠের লড়াইয়েও কতটা সত্যি, মরক্কো তা প্রমাণ করে ছেড়েছে। নামের ভারে ব্রাজিল অনেক এগিয়ে থাকলেও মরক্কো তাদের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলেছে এবং মাঠের খেলায় অনেকটা সময়ই সেলেসাওদের বেশ চাপে রেখেছে। বিশেষ করে প্রথমার্ধের চোখধাঁধানো খেলার পর এই ম্যাচে মরক্কোই জয় পাওয়ার যোগ্য ছিল।
ভাগ্য ভালো যে ভিনিসিয়ুসের ওই একক মুহূর্তের ঝলকটি ছিল, নয়তো ব্রাজিলের কপালে হারই লেখা ছিল। আমার বিশ্বাস, ব্রাজিল দল নিজেদের এই পারফরম্যান্স দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবে। নিজেরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে যে বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন ফুটবল খেললে সামনে আর পার পাওয়া যাবে না।
হতে পারে প্রথম ম্যাচ বলে খেলোয়াড়দের মধ্যে একধরনের জড়তা ছিল। মনে রাখতে হবে, গত বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ হেরেও আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তাই প্রথম ম্যাচ দেখে তীব্র হতাশা থাকলেও ব্রাজিলকে একেবারে বাতিলের খাতায় না ফেলে আশা রাখা যায়, তারা আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।
অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল।