জার্মানি, নাকি ফ্রান্স?
প্রতিবেশী দেশ দুটির বৈরিতা চিরকালীন। সঙ্গে ফুটবলের ঐতিহাসিক দ্বৈরথ, ম্যাচের প্রেক্ষাপট—সবকিছু মিলিয়ে আগুনে এক ম্যাচেরই পূর্বাভাস। এমন একটা ম্যাচের আগে জমে উঠতে পারত কথার লড়াই। কিন্তু কী আশ্চর্য, জার্মানি-ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালের আগে একে অন্যকে খোঁচা মেরে কথা বলার কোনো চেষ্টাই নেই। নেই বাঁকা কথায় প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টাও।
কথা যে হচ্ছে না, তা নয়। তবে সেটা শুধুই প্রতিপক্ষকে সম্মান-সমীহ করে। জার্মানির কোচ জোয়াকিম লো বলছেন, ‘২০১০ সালের পর দিদিয়ের দেশম ফ্রান্সকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। জিততে হলে আপনার সবকিছুই হতে হবে নিখুঁত। আরেকটি ক্লাসিকের দিকেই তাকিয়ে আছি আমরা।’ ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম তো প্রতিপক্ষকেই মানছেন ফেবারিট। দুই কোচ যেন কথার মাধ্যমেই বুঝিয়ে দিলেন মারাকানায় আজকের দ্বৈরথটা দুই পরাশক্তির।
এই দ্বৈরথে একটা ব্যাপার নিশ্চিত—ইউরোপের অন্তত একটি দল অবশ্যই সেমিফাইনালে যাচ্ছে।
সেই দল কোনটি উত্তর মিলবে আজ রাতেই। তবে সেমিফাইনালের স্বপ্নে দুই দলই বুঁদ। গত তিনটি বিশ্বকাপেই সেমিফাইনালে খেলেছে জার্মানি। ২০০২ বিশ্বকাপে উঠেছিল ফাইনালেও। অন্যদিকে গত তিনটি বিশ্বকাপের দুটিতেই গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে ফ্রান্স। মাঝে ২০০৬ বিশ্বকাপে উঠেছিল ফাইনালে। তবে জার্মানি বিশ্বকাপের সেই স্মৃতি নয়, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফ্রান্সকে তাড়িয়ে ফিরেছে ২০১০ বিশ্বকাপের সেই কলঙ্ক। উজ্জীবিত পারফরম্যান্স দিয়ে দেশমের দল এরই মধ্যে সেই কলঙ্ক প্রায় মুছে ফেলেছে । এখন তাদের স্বপ্ন আরও উঁচুতে। কিন্তু প্রতিপক্ষ জার্মানি বলেই হয়তো ফরাসিরা নিজেদের প্রত্যাশাটা চেপে রাখছেন ভেতরেই। আর ভেতরেই বা রাখছেন কোথায়? একদিকে জার্মানিকে ফেবারিট মানছেন, আরেক দিকে দেশমও এটাও বলছেন, ‘খেলোয়াড়ি জীবনে আমি সব সময়ই হারতে ঘৃণা করেছি। এখনো হারতে ঘৃণা করি।’
১৯৯৮ সালে দেশমের অধিনায়কত্বেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ফ্রান্স। দেশম অধিনায়ক ছিলেন ফ্রান্সের ২০০০ ইউরোজয়ী দলেরও। দেশম নিজেই তাই বেনজেমা-ভালবুয়েনাদের জন্য জ্বলন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। চাইলে দেশমও নিজের উদাহরণ দিয়েই শিষ্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। কিন্তু ৪৫ বছর বয়সী সেই পথে হাঁটতে রাজি নন, ‘তারা সবাই তা জানে। তাদেরও সামর্থ্য আছে, নিজেদের গল্পটা তারা নিজেরাই লিখে নিতে জানে।’
কাগজে-কলমে এবং বিশ্বকাপের ইতিহাস হয়তো জার্মানিকেই এগিয়ে রাখছে। কিন্তু এই বিশ্বকাপে দুই দলের পারফরম্যান্স তুলনা করলে এগিয়ে থাকবে ফ্রান্সই। হন্ডুরাসের সঙ্গে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে শুরু। এরপর সুইজারল্যান্ডকে ৫-২ গোলে উড়িয়ে দেওয়া। ইকুয়েডরের সঙ্গে গ্রুপের শেষ ম্যাচটা ড্র করলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে নাইজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে। জার্মানির শুরুটাও হয়েছিল পর্তুগালকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে। কিন্তু তার পর থেকেই যেন লোর দল কিছুটা ছন্দহীন। ঘানার সঙ্গে ২-২ ড্র, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১-০-তে জিতলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে আলজেরিয়াকে হারাতে ঘাম ছুটে গেছে। লোর কৌশল নিয়েই জার্মানিতে উঠে গেছে প্রশ্ন। নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পরও মেসুত ওজিল, মারিও গোটশেদের ওপরই কেন লো ভরসা রাখছেন, তা নিয়ে জার্মানরা সমালোচনায় মুখর। লোর সঙ্গে জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তিটা হয়তো ২০১৬ সাল পর্যন্ত, তবে আজ হেরে গেলে কাগজের ওই চুক্তিটা ভেসেও যেতে পারে। লো এবং জার্মানির ওপর তাই বাড়তি একটা চাপও থাকবে। আলজেরিয়া ম্যাচে দলের প্রথম গোলটি করা আন্দ্রেয়া শুরলে অবশ্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন চাপ জার্মানির জন্য কোনো সমস্যা নয়, ‘আপনি যখন জার্মানির সঙ্গে বিশ্বকাপে আসবেন, আপনি জয়ের প্রত্যাশাই করবেন।’ এএফপি ও ওয়েবসাইট।