‘টঙ্গীতে ফুটবল হলে ক্যাম্প বন্ধ করে তাহলে বাড়ি চলে যাই’

মার্টিন ফ্রেডরিখ মাঠ নিয়ে টানাটানিতে হতাশাফাইল ছবি
আর্চারির অনুশীলনে ব্যাঘাত ঘটিয়ে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের ম্যাচ আয়োজন করছে বাফুফে। দেশের শীর্ষ ফুটবল সংস্থার এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে বিস্মিত বাংলাদেশ আর্চারি দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। এই অবস্থায় বাংলাদেশের ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ যদি চায়, তাহলে ক্যাম্প গুটিয়ে বাড়ি চলে যেতে চান তিনি। বলেছেন, কারও উন্নতির পথে বাধা তৈরি করা উচিত নয়। এসব নিয়েই বুধবার দুপুরে টঙ্গীর মাঠে জাতীয় আর্চারি দলের অনুশীলন শেষে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশের আর্চারির বাঁক বদলের নেপথ্য নায়ক—

প্রশ্ন :

সাম্প্রতিক সময়ে আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্চারি আন্তর্জাতিক সাফল্য পেয়েছে। সেই আর্চারিকে সমস্যায় ফেলে টঙ্গীতে দেশের শীর্ষ ফুটবল লিগের খেলা হচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

মার্টিন ফ্রেডরিখ: দুটি বিষয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। প্রথমত, টঙ্গীতে খেলা চালানোর ব্যাপারে বাফুফের সিদ্ধান্তটা অনেক দেরিতে এসেছে, যখন আর্চারি ফেডারেশনের আর কিছু করার ছিল না। দ্বিতীয়ত, আমি খুব বিস্মিত হয়েছি যে গত বছরের পরিস্থিতি থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নিইনি (বাফুফেকে ইঙ্গিত করে)। গত বছরও এখানে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ চালিয়েছে বাফুফে। তখনো একই সমস্যা হয়েছিল। এক বছর সময় গেছে সমাধান খুঁজে নেওয়ার, একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু সেটি হলো না। এটা আমার কাছে হতাশারই।

প্রশ্ন :

বাফুফের সিদ্ধান্তটা প্রথম শোনার পর আপনার কেমন লেগেছে?

ফ্রেডরিখ: খুবই খারাপ। কারণ আমি ভাবিনি এখানে এ বছরও ম্যাচ হবে। শোনার পর প্রথমে আমার বিশ্বাসও হয়নি। ভেবেছি এটা হয়তো কোনো রসিকতা। যা–ই হোক, প্রথমে আমি বাফুফের সূচি দেখেছি। দেখলাম, লিগের প্রথম পর্বের অনেকগুলো ম্যাচ তারা এখানে দিয়েছে (৬৬টি ম্যাচে ৩২টি টঙ্গীতে)। এটা ভীষণ বেদনার আমার কাছে। এখন এ দেশের ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ যদি বলে টঙ্গী স্টেডিয়ামে আর্চারি হবে না, ফুটবল হবে, তাহলে আমি ক্যাম্প বন্ধ করে ছেলেমেয়েদের বাড়ি পাঠিয়ে আমিও বাড়ি ফিরে যাই।

আর্চারি এখন দেশের অন্যতম প্রত্যাশার খেলা
ছবি: প্রথম আলো

প্রশ্ন :

কী বলেন, বাড়ি চলে যেতে চান!

ফ্রেডরিখ: দেখুন, আমি আমার পরিকল্পনা মতো এগোতে না পারলে শুধু শুধু ক্যাম্প চালিয়ে লাভ কী! সামনে আমাদের অনেক খেলা। এ জন্য ভালো প্রস্তুতি দরকার। সেই প্রস্তুতিই যদি না হয় ক্যাম্প চালিয়ে ভালো ফল আসবে না। তার চেয়ে বরং টঙ্গীর মাঠে ফুটবলই হোক!

প্রশ্ন :

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রথমে সাতটি ভেন্যু বাছাই করেছিল এবারের প্রিমিয়ার লিগের জন্য। তাতে টঙ্গীও ছিল। কিন্তু করোনার কারণ দেখিয়ে তারা শুধু মুন্সিগঞ্জ আর টঙ্গীতে খেলা দিয়েছে। আপনার কী মনে হয়, বাফুফে কেন এমনটা করল?

ফ্রেডরিখ: আমি সত্যিই জানি না। প্রতিবছর কেন একই সমস্যা হয়, সেটিও বুঝতে পারছি না। বাফুফের পরিকল্পনা কী জানি না, কী তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া, সেটিও আমার অজানা। তবে এক বছরেও তারা ভেন্যু সমস্যার সমাধান পাবে না, এটা অবাক করা ব্যাপার। এ দেশে মাত্র দুটি ভেন্যুতে পেশাদার লিগ হচ্ছে, অন্য মাঠ খুঁজে পাওয়া গেল না! আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে অবাক।

মাঠ নিয়ে টানাটানিতে ফুটবল–আর্চারি কারওরই ভালো হচ্ছে না বলে মনে করেন ফ্রেডরিখ
ছবি: প্রথম আলো

প্রশ্ন :

টঙ্গীর মাঠে দেশের শীর্ষ লিগের খেলা হচ্ছে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে। এখন পর্যন্ত কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে আর্চারির?

ফ্রেডরিখ: সমস্যা তো হচ্ছেই। ফুটবল ম্যাচের দিন আমরা বিকালে অনুশীলন করতে পারছি না। সকালের অনুশীলন এখন টানা দুপুর পর্যন্ত করছি। পরিকল্পনায় একটু হোঁচটই খেতে হলো। আমরা এখন জিম ব্যবহার করতে পারছি না। কারণ এই রুমটা ফুটবলের ড্রেসিংরুম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তা ছাড়া ফুটবল ম্যাচের দিন মাঠে অনেক লোকজন আসে। ফলে আমার খেলোয়াড়েরা কোভিডের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। খেলোয়াড়দের শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারছি না।

সাধারণত জার্মানিতে আমি দেখি মাঠে নিয়মিত পানি দেওয়া হয়, রোল করা হয়। নিরন্তর পরিচর্যার মধ্যে থাকে মাঠ। কিন্তু এখানে সেটা নেই। আর্চারি অনুশীলনের সময় ফুটবল ফেডারেশন মাঠের পরিচর্যা করতে পারে না। আমরা অনুশীলন শেষ করলে তবেই তারা পরিচর্যায় নামতে পারে। এই পরিস্থিতি ফুটবল বা আর্চারি কারও জন্যই আসলে ভালো নয়।
মার্টিন ফ্রেডরিখ, আর্চারি দলের জার্মান কোচ

প্রশ্ন :

তাহলে তো একটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে...।

ফ্রেডরিখ: হ্যাঁ, তা তো থাকছেই। মার্চেই থাইল্যান্ডে এশিয়া কাপ। ৩ মার্চ থেকে দেশে জাতীয় র‍্যাঙ্কিং প্রতিযোগিতা। এসব প্রতিযোগিতার আগে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা জরুরি। সেটা দিতে না পেরে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে।

টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লা মাস্টার স্টেডিয়ামের মাঠ আর্চারির অনুশীলনে ব্যবহার হচ্ছে, এতে হুট করে, অনেকটা গায়ের জোরে ফুটবল ঢুকিয়ে দেওয়াটা অন্যায়ই মনে করেন আর্চারি দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ
ছবি: প্রথম আলো

প্রশ্ন :

টঙ্গীর মাঠের যা অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, এখানে দেশের শীর্ষ লিগের ম্যাচ পরিচালনা কতটা বাস্তবসম্মত মনে করেন আপনি?

ফ্রেডরিখ: দেখুন, আমি ফুটবল বিশেষজ্ঞ নই, আর্চারি বিশেষজ্ঞ। তাই আপনি প্রশ্নটা ফুটবল ফেডারেশনকে করুন। তারাই ভালো বলতে পারবে। কারণ, তারাই এই মাঠ পছন্দ করেছে প্রিমিয়ার লিগের জন্য। তবে সাধারণত জার্মানিতে আমি দেখি মাঠে নিয়মিত পানি দেওয়া হয়, রোল করা হয়। নিরন্তর পরিচর্যার মধ্যে থাকে মাঠ। কিন্তু এখানে সেটা নেই। আর্চারি অনুশীলনের সময় ফুটবল ফেডারেশন মাঠের পরিচর্যা করতে পারে না। আমরা অনুশীলন শেষ করলে তবেই তারা পরিচর্যায় নামতে পারে। এই পরিস্থিতি ফুটবল বা আর্চারি কারও জন্যই আসলে ভালো নয়।

রোমান ও দিয়ার সঙ্গে মার্টিন ফ্রেডরিখ
ফাইল ছবি

প্রশ্ন :

এখানে যে ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে দেখেন?

ফ্রেডরিখ: ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় আসলে আমার কম। তবে এক দিন অল্প একটু দেখেছি। তাতে যা দেখলাম, এই মাঠে ফুটবল খেলতে অনেক অসুবিধা। মাঠ ছোট। বল বাইরে চলে যায়। ব্যস্ততম সড়কের ওপরেই মাঠ হওয়ায় গাড়ির শব্দ আসে কান পাতা দায়। খেলোয়াড়দের মনোযোগ নষ্ট হতে পারে।

প্রশ্ন :

এখন তাহলে সমাধান কী?

ফ্রেডরিখ: আর্চারি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট বাফুফের সঙ্গে কথা বলছেন। বাফুফে বলেছে, ১৮ ফেব্রুয়ারির পর তারা এখানে আর খেলা দেবে না। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ও বলেছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে টঙ্গীতে আর্চারির জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে। আমরা ধরে নিচ্ছি, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে এখানে আর ফুটবল হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা অনুশীলন চালিয়ে যেতে পারব। আসলে আমাদের দেখা উচিত, যাতে কেউ কারও উন্নতির পথে যেন বাধা তৈরি না হয়। তাই আগে থেকেই আলাপ-আলোচনা করা উচিত। সেটিই সমাধানের পথ এবং আমাদের একটা পেশাদারি সমাধানে যেতেই হবে।