সাক্ষাৎকার: নিগার সুলতানা
বেশি উন্নতি করতে পারি কল্পনা করে
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের মেয়েদের সেঞ্চুরিই আছে দুটি, দুটিই আবার টি–টোয়েন্টিতে এবং একই ম্যাচে। ২০১৯ সালে নেপালের পোখারায় এসএ গেমসের ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে সেঞ্চুরি দুটি করেছিলেন নিগার সুলতানা ও ফারজানা হক। আন্তর্জাতিক ম্যাচ যদিও নয়, সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা নারী ইমার্জিং দলের বিপক্ষে জেতা সিরিজে দুটি সেঞ্চুরি করে নিজের বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্যটা আবারও দেখিয়েছেন দলের অধিনায়ক নিগার। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন লম্বা ইনিংস খেলার সামর্থ্য বাড়াতে তাঁর চেষ্টার কথা—
প্রশ্ন :
দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েদের তো হারিয়ে দিলেন। সিরিজে দলের পারফরম্যান্স কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
নিগার সুলতানা: দেশের মাটিতে সিরিজ জয় অন্য রকম তৃপ্তির ব্যাপার। আমার নেতৃত্বে দল জিতেছে, আনন্দটা তাই বেশি।
প্রশ্ন :
আপনার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও ভালো ছিল। দুটি সেঞ্চুরি করেছেন...
নিগার: সব সময়ই চেষ্টা থাকে দলে যেন অবদান রাখতে পারি। এবারও সেটাই চেষ্টা করেছি। আমাদের তো এক বছর খেলা ছিল না। ওই সময়ে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার অনেক সময় পেয়েছি। কিছু দুর্বলতা ছিল সেগুলো বের করে কাজ করেছি। আর ক্যাম্পে ফিটনেসে বেশি নজর দিয়েছি। ফিটনেসের কারণেই বড় ইনিংস খেলতে পেরেছি।
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখি যে আমি পারব। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, যা আমাকে ধীরস্থির রাখে। এ ছাড়া প্রতিদিন মেডিটেশন করি। ঘুমের আগে চিন্তা করি আজ কী কী করলাম, এটা না করে ওটা করলে ভালো হতো কি না। কল্পনাশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখি। এমন কিছু শট আছে, যা আমি যতটা না অনুশীলন করে উন্নতি করতে পারি, তার চেয়ে বেশি উন্নতি করতে পারি কল্পনা করে। আপনি যখন বারবার কল্পনা করবেন, যখন ম্যাচে যাবেন তখন দেখবেন সেই শটটা এমনিতেই চলে আসে। আমি খেলা দেখি প্রচুর। শুধু যে দেখি, তা নয়। খেলার বিশ্লেষণগুলোও মনোযোগ দিয়ে শুনি
প্রশ্ন :
কোচ শাহনেওয়াজ শহীদ বলেছেন, শট নির্বাচনে উন্নতি করেই আপনি সফলতা পেয়েছেন। আপনিও তাই মনে করেন?
নিগার: আমরা এর আগে এক-দেড় বছর টি-টোয়েন্টির জন্যই খেলেছি। সেখানে উড়িয়ে মারার প্রতি বেশি আগ্রহ ছিল। সেটা আমার ভেতরে রয়ে যায়। লম্বা বিরতির পর এসেও তাড়াহুড়ো করে খেলছিলাম। ক্যাম্পে দু-এক দিন অনুশীলন দেখে কোচ আমাকে বলেছেন, ‘তুমি বেশি উড়িয়ে মারছ। নিচে খেলার চেষ্টা করো, তাহলে ইনিংস লম্বা হবে।’ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় সেঞ্চুরিতে আমি একটা বলও উড়িয়ে মারিনি।
প্রশ্ন :
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষেও ভালো করলেন। সাফল্যের পেছনের কারণটা কি বলবেন?
নিগার: সবকিছুই আসলে প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। প্রস্তুতি ভালো হলে ভালো পারফর্ম করবই। বিশ্বকাপে সেটাই হয়েছে। ক্রিকেট বোর্ডের ক্যাম্পে গিয়েই আমাকে প্রস্তুত হতে হবে, আমি কখনো সেটার অপেক্ষায় থাকি না। বড় মঞ্চে ভালো খেলার জন্য নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখি। আগে এটা ছিল না আমার মধ্যে। আমার দক্ষতা ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল না। এখন আমি অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড—কাদের বিপক্ষে খেলছি সেটা নিয়ে চিন্তা করি না।
প্রশ্ন :
মানসিকভাবে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেন?
নিগার: নিজের ওপর বিশ্বাস রাখি যে আমি পারব। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, যা আমাকে ধীরস্থির রাখে। এ ছাড়া প্রতিদিন মেডিটেশন করি। ঘুমের আগে চিন্তা করি আজ কী কী করলাম, এটা না করে ওটা করলে ভালো হতো কি না। কল্পনাশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখি। এমন কিছু শট আছে, যা আমি যতটা না অনুশীলন করে উন্নতি করতে পারি, তার চেয়ে বেশি উন্নতি করতে পারি কল্পনা করে। আপনি যখন বারবার কল্পনা করবেন, যখন ম্যাচে যাবেন তখন দেখবেন সেই শটটা এমনিতেই চলে আসে। আমি খেলা দেখি প্রচুর। শুধু যে দেখি, তা নয়। খেলার বিশ্লেষণগুলোও মনোযোগ দিয়ে শুনি।
প্রশ্ন :
আপনার ক্রিকেটের শুরুর গল্পটা বলুন...
নিগার: আমার বয়স যখন ২ বছর, যখন আমি হাঁটা শুরু করি, তখন থেকেই বড় ভাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা শুরু করি। আমি বড় হয়েছি ক্রিকেটীয় পরিবেশে। অন্য মেয়েরা মেয়েদের খেলা খেলত, আমি কখনো তা করিনি। বড় ভাই সম্রাট সালাউদ্দিনকে দেখেই ক্রিকেট খেলা শুরু। শেরপুরে তিনি ক্লাব ক্রিকেট খেলতেন। ভাইয়ার স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার, কিন্তু স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। তিনি তাই চেয়েছিলেন আমি ক্রিকেটার হই। ভাইয়ার স্বপ্ন থেকেই সবকিছুর শুরু। আমার পরিবারেরও অনেক অবদান। মফস্বলের একটা মেয়ের ক্রিকেটার হওয়াটা দুঃস্বপ্নের মতো ছিল তখন।
প্রশ্ন :
শেরপুর থেকে ঢাকার ক্রিকেটে আসা কীভাবে?
নিগার: ২০১১ সালে প্রথম ঢাকায় আসি। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে খেলি। দলে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। ব্যাটিং ও ফিল্ডিং ভালো করতাম। সে সুবাদে ১৫ জনের দলে সুযোগ পেয়ে যাই। দুই বছর শেখ জামালে খেলার পর দেখলাম যে এখানে আমি ভালো খেলতে পারছি না। আসলে ব্যাটিংই পাচ্ছিলাম না। পরে রাইজিং গার্লস ক্রিকেট একাডেমি দলে চলে যাই। ওই বছর ওরা প্রথম প্রিমিয়ারে খেলছিল। সেখান থেকেই আমার মোড় ঘুরে যায়। ২০১৩ সালে ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করে সেরা রান সংগ্রাহকদের মধ্যে চলে আসি। এরপর জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাই।
প্রশ্ন :
বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেট তো টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে। আপনিও নিশ্চয়ই চাইবেন টেস্ট ক্রিকেটার হতে...
নিগার: আমি টেস্ট দেখতে খুব পছন্দ করি। আগে জাতীয় লিগ খেলতাম ৫০ ওভারে, কিন্তু সাদা জার্সিতে। আমার খুব পছন্দ ছিল সাদা জার্সিতে খেলা। জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট খেলার সুযোগ যে আসবে, এটা আসলে কখনোই কল্পনা করিনি। যখন থেকে শুনছি যে সম্ভব হতে পারে, তখন থেকেই একটা ভালো লাগা কাজ করছে।