ব্রাজিল কেন কাঁদছে?

আনিসুল হক
আনিসুল হক

ব্রাজিলিয়ানরা দেখা যাচ্ছে কাঁদতে খুব ভালোবাসে। আজ আপনারা যখন এই লেখা পড়ছেন, তখন জেনে গেছেন, ব্রাজিলিয়ানরা কেন কাঁদছে, সুখে নাকি দুঃখে।
প্রথম দিন ব্রাজিল যখন খেলতে নামল এবারের বিশ্বকাপে, নেইমারসহ খেলোয়াড়দের চোখের পানি ছিল অগোপন। জাতীয় সংগীত বাজছে, নেইমাররা কাঁদছেন। ভেবেছিলাম, বয়স কম, তার ওপর প্রথম বিশ্বকাপ, নেইমার বুঝি তাই কাঁদে। এ মা, এঁদের কান্না দেখি থামেই না। আমাজনে পানি প্রবাহিত হয় সবচেয়ে বেশি, সেই প্রবাহ ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের অশ্রুর প্লাবনে বোধ করি আরেকটু বেড়েছে।
ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল খেলে না, ফুটবল যাপন করে। তারা সৈকতে ফুটবল খেলে খালি পায়ে, শৈশবে ফুটবল খেলে নাঙ্গা পায়ে, জুতা কোত্থেকে জুটবে গরিব বাচ্চাগুলোর? আমরা যেমন হাত দিয়ে ভাত খাই, সেটা নাকি আমাদের হাতের আঙুলে বাড়তিÿক্ষমতা দেয়, চিকিৎসকেরা বলেন। আর ছোটবেলা থেকে খালি পায়ে খেলা আমেরিকার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবলটারও একটা আত্মিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে, তাত্ত্বিকেরা ব্যাখ্যা দেন।
চিলির সঙ্গে খেলাটি কিন্তু ‘কান নিয়েছে চিলে’ই হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু ব্রাজিলের নাগরিকেরা এখন কথা তুলেছেন, সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, চিলির সঙ্গে টাইব্রেকার হবে, তখন থিয়াগো সিলভা কাঁদছিলেন কেন?
সিলভা সাংবাদিকদের জবাব দিয়েছেন, ছোটবেলায় যক্ষ্মা হয়েছিল, তাই ছোটবেলা থেকেই আমি কান্নার চ্যাম্পিয়ন। ব্রাজিলিয়ানরা এয়ারপোর্টে সৈকতে লবিতে আড্ডা দিচ্ছে, আর বলছে, এটা কি দুর্বলতার লক্ষণ নয়? হুলিও সিজারও তো দেখি টাইব্রেকারের পেনাল্টি ঠেকিয়ে কাঁদে।
আর বলা হচ্ছে, ব্রাজিলের জাতীয় সংগীতের প্রথম লাইনটাই এমন, কান্না এসে যায়। ‘ইপিরাঙ্গানা নদীর শান্ত তীর—শুনল কান্না এক বীর জনগোষ্ঠীর। সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল সূর্য মুক্তির, আলোকিত করল আকাশ জাতির।’ আপনি যখন দূর থেকে জাতীয় সংগীত শোনেন, তখন এক, আর আপনি যখন বিশ্বকাপে খেলতে নামছেন, তখনকার জাতীয় সংগীতের অন্য মানে—বলছেন ব্রাজিলের এক সাবেক খেলোয়াড়।
আমি ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে বসে এই লেখা লিখছি। কিন্তু তার মানে এই নয়, যে খেলা হয়ে গেছে, যার ফল আপনার জানা, তা সম্পর্কে আগের রাতে আমি আপনার চেয়ে বেশি জানি। ব্রাজিলে এলেই ফুটবলের ফল সম্পর্কে বেশি কথা বলার অধিকার জন্মায় না। আমি শুধু মনে রাখছি, গতকাল পর্যন্ত কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা, নেইমার আর মেসির চেয়ে তাঁর গোলসংখ্যা একটা বেশি বৈ কম নয়। ৫ জুলাইয়ের ঠিক এক সপ্তাহ পরে হামেসের জন্মদিন, আর তাঁর নামটা নাকি জেমস বন্ডের জেমস থেকেই নেওয়া। জেমসকে হামেস বলা গেলে আমাদের একটা জেলায় ‘পানি’কে কেন ‘হানি’ আর ‘সকল’কে ‘হগল’ বলা যাবে না?
নেইমার তাঁর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ফেসবুকের পাতায় বলেছেন, ‘প্রত্যেক বিজেতারই একটা করে জখম আছে কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছুই প্রায় নেই, যা একজন ইতিবাচক মানুষকে থামাতে পারে, যদি তার লক্ষ্যটা একেবারে ধবধবে পরিষ্কার থাকে।’ আমরা জানি, নেইমারের একেবারে পরিষ্কার লক্ষ্যটা কী। এ যে অর্জুনকে জিজ্ঞেস করা সেই প্রশ্ন, অর্জুন, তুমি কী দেখো? আমি দেখি পাখির চোখ।নেইমার, তুমি কী দেখো? আমি দেখি, ১৩ জুলাই উঁচিয়ে ধরা কাপ, সোনার...সমস্যা হলো সেটা আরও অনেকেই দেখছেন, মেসি, হামেস, মুলার, রোবেন...।
কিন্তু ব্রাজিলের মানুষেরা একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। মাত্র দুই ঘণ্টা হলো এসেছি রিওতে, চার ঘণ্টা আগে সাও পাওলোর বিমানবন্দরে। তার আগে আবুধাবি থেকে বিমানে বিরতিহীন ১৫ ঘণ্টা, তার আগে ট্রানজিট প্রায় ২৪ ঘণ্টা। আমার জীবনে আমি কোনো দিনও এর আগে ৪৮ ঘণ্টার বিমানযাত্রা করিনি। আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। আমার সঙ্গে এসেছেন চারজন বাংলাদেশি শফিক, ববি, মাহবুব, শাফি—এঁরা বিশ্বকাপের বিশ্বকোষ, কোকা-কোলা আয়োজিত বিশ্বকাপের কুইজে এঁরা ভালো করেছেন, এমন ভালো যে প্রশ্ন শেষ করার আগে উত্তর দিয়ে দিতেন। এঁরা অবশ্য দুই দিন পরেই চলে যাবেন।
আমি থেকে যাব। ব্রাজিলের কিছুই আসলে দেখা হয়নি এখনো। জার্মানি-ফ্রান্স খেলাটা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে দেখব, আর তার পরই বিমানে চড়ে আরেক শহরে উড়ে গিয়ে দেখব আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচ। এর পরের ম্যাচটায় ব্রাজিল খেলছে, না কলম্বিয়া, তা আপনারা জানেন, ওই সেমিফাইনালও দেখব।
টেলিভিশনের খবরে দেখলাম, ব্রাজিল দল বাসে যাচ্ছে, স্টেডিয়ামে অনুশীলন করছে, বাচ্চারা পাগলের মতো চিৎকার করছে, কে কোন দেয়ালে উঠে যে খেলোয়াড়দের একনজর দেখবে। বাসের কালো কাচের ভেতরে বসে নেইমার বাচ্চাদের এই কান্না শুনলে নিশ্চয়ই ভেজা চোখ লুকোনোর পথ খুঁজেছেন?
আর এরই মধ্যে সেমিফাইনাল দেখতে আমি যে বেলো হরিজন্তেতে যাব, সেখানকার স্টেডিয়ামের কাছে একটা ফ্লাইওভার ভেঙে পড়েছে, আমার ব্রাজিল আগমনের দিনটাতেই। টিভিতে অল্প অল্প দেখাচ্ছে। দুজন মারা গেছেন, আর বড় বড় কংক্রিটের চাঁইয়ের নিচে কতজন পড়ে আছে, কেউ জানে না। টিভির সাক্ষাৎকারে মানুষ বলছে, এই হলো ব্রাজিল বিশ্বকাপের আসল চেহারা। তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে ভালোমতো কোনো কাজই করা হয়নি। অপচয় করা হয়েছে।
ব্রাজিলের নারী প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ টুইটারে বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকারের যদি কোনো সাহায্য দরকার হয়, তাঁর সরকার করতে প্রস্তুত আছে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমিÿক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছি।’
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে মিশে গেছে রাজনীতির সঙ্গে। তিন মাস পরই জাতীয় নির্বাচন। এত যে বিক্ষোভ, তার মূলে আছে বৈষম্য আর দারিদ্র্য, আছে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি। আছে দলীয় নির্বাচনী রাজনীতিও। মানুষ স্টেডিয়াম চায় না, নাগরিক অধিকার চায় বলা হচ্ছে। আর মনে করা হয়, কেবল ব্রাজিল ফুটবল দল বিশ্বকাপে ভালো করলেইÿক্ষমতাসীনেরা আবার নির্বাচিত হবেন, খারাপ করা মানে ওয়ার্কার্স পার্টির দিলমা রুসেফের হার। খোদ আমার প্রিয় খেলোয়াড় রোনালদো (আর নাইন) বিরোধী শিবিরকে সমর্থন করছেন।
ব্রাজিল কিন্তু সেই দল, যারা রানার্সআপ হলে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।
আজকে কী হচ্ছে আপনারাই জানেন।
আমাদের সঙ্গের বিমানেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরা পর্যটকেরা আসছেন।
কাল ব্রাজিলের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে, আজ আর্জেন্টিনারটা হবে। আমি এতটুকু অনুমান করতে পারি, ফুটবল-বিধাতা অন্তত একটা আমেরিকান দলকে ফাইনালে তুলবেনই। কাল যদি ব্রাজিল না জেতে, আজ আর্জেন্টিনা জিতবেই। যদি ব্রাজিল জেতে, তাহলে হয় অল-আমেরিকান ফাইনাল, নয়তো আর্জেন্টিনার বিদায়।
ফুটবল নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী লিখিতভাবে করতে হয় না।
শুধু বলে রাখি, ব্রাজিলের মতো বাঙালিরাও বড় আবেগপ্রবণ। জাতীয় সংগীত শুনে বহু বাঙালি কাঁদছেন, এ আমার বহুবার দেখা। আমার কথা নাহয় বাদই দিন। আমার কাঁদতে উপলক্ষ লাগে না। কিন্তু ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা হারলেও যে বাঙালি কাঁদে, এর কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। শুধু হারলে না, জিতলেও বাংলাদেশের মানুষ কাঁদে। কী বিচিত্রই না এই দেশ!
৪ জুলাই, ব্রাজিল সময় রাত ১টা ৪৫