শখের খেলোয়াড়দের দিয়ে হচ্ছে স্বাধীনতা কাপ কাবাডি

‘ও পৃথিবী এবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে...ও পৃথিবী তোমায় জানাই স্বাগত এই দিনে।’ পল্টন উডেনফ্লোর জিমনেসিয়ামে গানের তালে তালে নাচল একদল তরুণ-তরুণী। পাশেই কাবাডি স্টেডিয়াম। অথচ উডেনফ্লোরে কাল শুরু হয়েছে স্বাধীনতা কাপ কাবাডি! স্বল্প পরিসরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হয়ে গেল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন।
টুর্নামেন্টে চাকচিক্য আনতে ইনডোরের কাবাডি ম্যাটের চারপাশে বসানো হয়েছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী বোর্ড। একপাশে বিশালাকার পর্দায় সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে খেলা। টাইম আউটের ফাঁকে উচ্চ ভলিউমে বাজছে গান। গত বছর মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোরে হওয়া টুর্নামেন্টের মতোই এবারও ফেডারেশন বৈচিত্র্য আনতে এমন আয়োজন করেছে।
কিন্তু গতবার এই স্বাধীনতা কাপেই খেলেছিল দেশের সব সার্ভিসেস দল: নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, বাংলাদেশ জেল ও ফায়ার সার্ভিস। সঙ্গে জেলা ও বিভাগীয় আটটি দলও অংশ নিয়েছিল স্বাধীনতা কাপে। কিন্তু এবার সার্ভিসেস দলগুলো ছাড়াই হচ্ছে টুর্নামেন্ট। এবার বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেয় ৫৮টি দল। চূড়ান্ত পর্ব হচ্ছে আট বিভাগের চ্যাম্পিয়ন আটটি জেলা নিয়ে।
তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তুলে আনতেই মূলত সার্ভিসেস দলগুলোকে সুযোগ দেয়নি ফেডারেশন। কিন্তু তৃণমূলে কাবাডির চর্চা সেভাবে হচ্ছে না বললেই চলে। ঢাকায় যেসব খেলোয়াড় এসেছেন, তাঁদের কেউ কেউ ডিশ সংযোগের ব্যবসা করেন। কেউ কেউ কসমেটিকসের দোকানদার বা চাকরিজীবী। একজনকে পাওয়া গেল ট্রাক কিনে ভাড়ায় খাটান। অনেকের বয়স ত্রিশের ওপর। এই খেলোয়াড়দের বেশির ভাগই শখের বশে এলাকায় হা-ডু-ডু খেলেন। নিজেদের ব্যবসা রেখে কাবাডিতে তাঁরা আদৌ কতটুকু সময় দেবেন, সেই প্রশ্নটা তাই ঘুরেফিরে আসছে।
জাতীয় দলের কোচ সুবিমল চন্দ্র দাস তো বলেই ফেললেন, ‘এভাবে টুর্নামেন্ট করে কোনো লাভ নেই। আসল খেলোয়াড় এভাবে পাওয়া যাবে না।’ চট্টগ্রাম জেলার কোচ শাহজালাল উদ্দিনের অভিযোগ খেলোয়াড়দের বয়স নিয়ে, ‘অনেক দলেই রয়েছে বয়স্ক খেলোয়াড়। এই বয়সে কাবাডি খেলে আসলেই কতটুকু উন্নতি করতে পারবে এরা?’
সিলেটের জিন্দাবাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী জাহিদ আহমেদ তবু খেলতে পেরেই খুশি, ‘খেলার সময় ভাইকে দোকানে বসিয়ে রাখি। এভাবে দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছি ঢাকা কাবাডি ক্লাবের হয়ে।’
মাদারীপুরের খেলোয়াড় মোহাম্মদ নাসিরের রয়েছে দুটি ট্রাক। ট্রাক ভাড়ার আয়ে সংসার চলে তাঁর। একই জেলায় খেলছেন নূরে আলম। মাদারীপুর শহরে মুঠোফোনের শোরুম ও খেলাধুলার সরঞ্জামের দোকান আছে আলমের। প্রথমবারের মতো ঢাকায় খেলতে এসে ভীষণ উচ্ছ্বসিত এই ব্যবসায়ী, ‘আমরা অবসর সময়ে হা-ডু-ডু খেলি। এর আগে কখনো ঢাকায় খেলিনি। মাত্র এক মাস অনুশীলন করে ঢাকায় এসেছি বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে।’
আরমানিটোলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আবুল হাসনাত। মাদারীপুরের খেলোয়াড়ের কথা, ‘আগে সংসার বাঁচাতে হবে। তারপর খেলতে হবে।’ খেলাধুলা নেই বলে আক্ষেপ ঝরল বরিশালের কেব্ল ব্যবসায়ী মাসুদ রানা কণ্ঠে, ‘অন্য জেলার তুলনায় বরিশালে খেলোয়াড় খুব কম। কারণ এখানে স্পনসর নেই। কেউ কাবাডি খেলতে আসতে চায় না।’
যে যে-ই পেশা থেকে আসুন না কেন, সবার ভালোবাসার নাম কাবাডি। কিন্তু ব্যবসা রেখে তাঁরা পুরোদস্তুর খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারবেন তো?