হানুয়াবাদা গ্রামের ক্রিকেট পরিবারের গল্প

পাপুয়া নিউগিনি দলটা আসলেই একটি পরিবারের মতো, যারা ক্রিকেট খেলে স্রেফ খেলাটার প্রতি ভালোবাসার টানেছবি: এএফপি

পাপুয়া নিউগিনির ক্রিকেটার চার্লস আমিনির সংবাদ সম্মেলন তখনো শুরু হয়নি। আইসিসির দুই মিডিয়া কর্মকর্তাকে দেখা গেল হন্তদন্ত হয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপার কী? জানা গেল একটু পরই। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে কোনো সাংবাদিকই নেই। চার্লস এসে যদি দেখেন, তাঁকে প্রশ্ন করার কেউই নেই, খুব লজ্জার হবে ব্যাপারটা। আইসিসির দুই মিডিয়া কর্মকর্তা তাই তড়িঘড়ি করে ওমান ক্রিকেট বোর্ডের ইংরেজি জানা একজনকে ধরে এনে সংবাদ সম্মেলনে বসিয়ে দিলেন। আমিনির জন্য কিছু প্রশ্নও কাগজে লিখে দেওয়া হয় তাঁকে।

শেষ মুহূর্তে অবশ্য তিন-চারজন বাংলাদেশি সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছেন সংবাদ সম্মেলনে। দেখে যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন আইসিসির কর্মকর্তারা। একজন তো বললেনও, ‘যাক বাঁচা গেল! তোমরা এসেছ বলে রক্ষা।’

তাঁর কথা শেষ না হতেই মাসকাটের আল আমেরাত স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢোকেন চার্লস আমিনি। মজার ব্যাপার হলো, যে সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কারও আগ্রহই ছিল না, সেটিই শেষ পর্যন্ত গড়াল প্রায় ১৫ মিনিট। সেটা হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল ও সুভাষী চার্লস আমিনির গুণেই।

দলটির সবচেয়ে বড় তারকাও চার্লস আমিনি
ছবি: টুইটার

পাপুয়া নিউগিনির অন্য ক্রিকেটাররাও এমনই। সবাই একেবারে ‘মাই-ডিয়ার’ ধাঁচের। দলটা আসলেই একটি পরিবারের মতো, যারা ক্রিকেট খেলে স্রেফ খেলাটার প্রতি ভালোবাসার টানে। পেশাদার ক্রিকেটের দুনিয়ায় এখনো পুরোপুরি পা পড়েনি প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ দেশটির। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকলে পেশাদারি ও আর্থিক নিশ্চয়তার গুরুত্ব বাড়ে। তখন খেলাটা অনেকটা চাকরির মতো হয়ে যায় ক্রিকেটারদের কাছে।

পাপুয়া নিউগিনির গল্পটা এমন নয়। দলটির ক্রিকেটাররা যত না খেলোয়াড়, তার চেয়ে বেশি ক্রিকেটপ্রেমী। ভালোবাসা থেকেই তাঁদের ক্রিকেট খেলা। মাঠেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। একেকটি আউট, ক্যাচ বা সতীর্থের চার-ছক্কায় দলের উদ্‌যাপন চোখে পড়ার মতো। সেদিন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে কাইল কোয়েটজার আউট হতে না হতেই থার্ড ম্যান, ফাইন লেগ, লং অন, লং অফ থেকে মুহূর্তেই ফিল্ডাররা দৌড়ে এসেই হইচই শুরু করে দেন। দেখে মনে হচ্ছিল পরিবারের একজন সদস্যের সাফল্যে যেন পুরো পরিবারেই ঈদের খুশি লেগেছে।

দলটা নতুন। কিন্তু ক্রিকেটের পুরোনো ঐতিহ্যের ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক টেস্ট খেলুড়ে দেশ থেকেও পাপুয়া নিউগিনি এগিয়ে। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশটির ক্রিকেটাররা যে ক্যাপ পরে খেলছেন, সেটি কিন্তু একেবারেই টি-টোয়েন্টিসুলভ নয়। তাঁরা খেলেন টেস্ট ক্রিকেটের মতো নরম কাপড়ের ক্যাপ পরে। পুরোনো দিনের ক্রিকেটাররা যেমন পরতেন।

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশটির ক্রিকেটাররা যে ক্যাপ পরে খেলছেন, সেটি কিন্তু একেবারেই টি-টোয়েন্টিসুলভ নয়
ছবি: এএফপি

দলটির সবচেয়ে বড় তারকাও চার্লস আমিনিই। তাঁর আগে ‘আমিনি’ পরিবারের দুই ছেলে ক্রিস আমিনি ও কলিন আমিনি পিএনজির হয়ে খেলেছেন। এর আগে খেলেছেন তাঁদের বাবা সিনিয়র চার্লস। মা কুনে ও দাদা ব্রায়ানও ক্রিকেট খেলেছেন পাপুয়া নিউগিনির হয়ে। ব্রায়ানের বাবাও নাকি ক্রিকেট খেলেছেন। দেশটির ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামও রাখা হয়েছে ‘আমিনি’ পরিবারের নামে। তাদের ডিএনএতে যে ক্রিকেট বহমান, সেটি আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।

চার্লস অবশ্য বাকিদের তুলনায় ভাগ্যবান। সমৃদ্ধ ক্রিকেট পরিবারের মধ্যে তিনি প্রথম বিশ্বকাপ খেললেন। গত রোববার ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটা দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ২৪তম দল হিসেবে অভিষেক হয়েছে পাপুয়া নিউগিনিরও। মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের পাশাপাশি চার্লস একজন দারুণ লেগ স্পিনারও। খুব বেশি টার্ন পান না, কিন্তু লাইন-লেংথে যথেষ্ট ধারাবাহিক চার্লসের কাছ থেকে নিয়মিত ৪ ওভার পায় পাপুয়া নিউগিনি।

চার্লস আমিনির মা কুনে। কদিন আগে মারা গেছেন তিনি।
ছবি: টুইটার

ওমানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের সময় অবশ্য ব্যাটিং, বোলিংয়ের চেয়ে বেশি চোখে পড়েছে তাঁর ফিল্ডিং। চিতার মতো দৌড়, দ্রুত বল তুলতে এবং ছাড়তে পারেন। এসবই চার্লসকে রবীন্দ্র জাদেজা, ফ্যাবিয়েন অ্যালেন, হেইডেন ওয়ালশ জুনিয়রদের মতো সময়ের সেরা ফিল্ডারদের কাতারে নিয়ে এসেছে।

শুধু চার্লস নন, পুরো পাপুয়া নিউগিনি দলই দুর্দান্ত ফিল্ডারে ভরা। প্রত্যেকেই যেন দারুণ অ্যাথলেট। আইসিসির সহযোগী সদস্যদেশগুলোর মধ্যে পাপুয়া নিউগিনির ফিল্ডিংয়ের সুনাম আছে। গতকাল মরুর প্রচণ্ডে গরমে তাঁদের ফিল্ডিং অনুশীলনেও সেটার কিছু নমুনা দেখা গেল। প্রায় ৭-৮ জন ক্রিকেটার এক হয়ে অনুশীলন করছিলেন। সেখানে প্রত্যেকেই বল ছুড়ে মিনিটে ২-৩ বার করে স্টাম্প ভাঙছিলেন ২৫-৩০ মিটার দূর থেকে। দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। পাপুয়া নিউগিনির ব্যাটিং লাইনআপ খুব গভীর নয়, বোলিংও তেমন ভালো না। কিন্তু গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে দলটার জুড়ি নেই।

পোর্ট মোসবির আমিনি পার্ক। এই পোর্ট মোসবিরই অংশ হানুয়াবাদা গ্রাম।
ছবি: টুইটার

দলের ক্রিকেটারদের একে অন্যের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া এর একটা কারণ। দলটা পরিবারের মতো বলেই সবার মধ্যে এত দারুণ রসায়ন।

পাপুয়া নিউগিনি ক্রিকেট দলের প্রত্যেকেই এসেছেন হানুয়াবাদা নামের এক গ্রাম থেকে। হানুয়াবাদা শব্দের অর্থ বড় গ্রাম। সাগরে মাছ ধরে এই গ্রামের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। শুধু এই ক্রিকেট-পাগল গ্রামের কারণেই পাপুয়া নিউগিনি পেয়েছে তাদের জাতীয় ক্রিকেট দল। আর বিশ্ব ক্রিকেট উপহার হিসেবে পেয়েছে পাপুয়া নিউগিনিকে।

আজ সেই পাপুয়া নিউগিনির ক্রিকেট ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ দলের নামও। বাংলাদেশই হতে যাচ্ছে পাপুয়া নিউগিনির প্রথম টেস্ট খেলুড়ে প্রতিপক্ষ। সেই ম্যাচের কথা ভেবে রোমাঞ্চটা গতকাল বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল চার্লসের চোখে মুখে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের ফল যাই হোক, বিশ্বকাপে একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে তাঁরা খেলছেন, এটাই বা কম কী!