
ত্রিভুজের দুই কোনায় মেসি-নেইমার আগেই বসে গিয়েছিলেন। মঞ্চটা সাজানো ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য। তিনি আসবেন, শেষের বিন্দুটিতে বসবেন। রোনালদো আসন গ্রহণ করলেন, কিন্তু সেটা তাঁর মতো রাজকীয় হলো কই? বরং বসার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে যেতে হলো গ্লানি নিয়ে। ১ গোল করেও যে সিআর সেভেনকে দাঁড় হতে হচ্ছে আসামির কাঠগড়ায়!
কখনো কখনো দলকে জেতাতে মাত্র একটা গোল করলেই চলে। রোনালদো সেটির তৃপ্তিতেই বুঁদ হয়ে মাঠ ছাড়তে পারতেন। কিন্তু গোল ব্যবধানের জটিল সমীকরণে পর্তুগালকে পেতে হতো বড় জয়। সেটার জন্য অতিমানব হওয়ার দরকার ছিল না। রোনালদো শুধু তাঁর মতো খেললেই হতো। কিন্তু পরশু ম্যাচ দেখতে দেখতে অনেকের মনেই নিশ্চিতভাবে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেয়েছিল, এই কি সেই রোনালদো যিনি সুইডেনকে একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন? এই রোনালদোই কি মাত্র কিছুদিন আগে রিয়ালের হয়ে লা ডেসিমা জিতেছিলেন? অনায়াস সব সুযোগ হেলায় হারিয়ে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, দিনটা তাঁর নয়।
অথচ দিনটা তাঁর হতেই পারত।যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে জার্মানি তো অনেকটা পথ এগিয়েই দিয়েছিল পর্তুগালকে। মুনতারি, বোয়াটেংবিহীন ঘানাও নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে। রোনালদোর সুযোগ ছিল নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। অন্য যেকোনো দিনেই হয়তো সেটা কাজে লাগাতেন। আফসোস, পরশুর দিনটা যে রোনালদোর ছিল না!
এমন একটা ম্যাচের পর কী সান্ত্বনা দেবেন নিজেকে? হাঁটুর চোটের কারণে বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে সংশয় ছিল। সেই চোট সঙ্গে নিয়েই নেমে গেছেন মাঠে। বেশ কয়েক দিন যন্ত্রণা নিয়ে অনুশীলন ছাড়তে হলেও পরশুর জয়টা হতে পারত সেই যন্ত্রণা উপশমের সবচেয়ে ভালো উপায়। ম্যাচ শেষে রোনালদোর মুখে সেই আক্ষেপটা চাপা থাকেনি। স্বীকার করে নিলেন, ‘আমরা অনেক সুযোগ তৈরি করেছি। কিন্তু সেগুলো ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি।জানতাম, আমাদের কাজটা অনেক জটিল ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাপ্য সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে কাজটা আমাদের পক্ষে করা সম্ভব ছিল।’ তার পরও অবশ্য গর্বের সঙ্গে বলছেন, ‘এটাই ফুটবল। মাথা উঁচু রেখেই মাঠ ছাড়ছি আমরা। আমরা নিজেদের সেরাটা দিয়েছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি।’
প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়াটা একটু বেশিই অপ্রত্যাশিত, কিন্তু বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়া তো নিয়তিই ছিল। ব্যালন ডি’অর জিতেই তো এটা একরকম ঠিক করে রেখেছিলেন রোনালদো! হেঁয়ালির মতো লাগছে? সেই আলফ্রেডো ডি স্টেফানো থেকে শুরু। এরপর ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি, মার্কো ফন বাস্তেন, রোনালদো থেকে শুরু করে রোনালদিনহো বা লিওনেল মেসিকেই দেখুন। সেরার স্বীকৃতি তাঁদের অভিশাপের মতো তাড়া করে বেড়িয়েছে। ব্যালন ডি’অর জেতার পরের বিশ্বকাপটা তাঁরা কেউই জিততে পারেননি। রোনালদোর তো শাপমোচন হয়ইনি, উল্টো ‘অভিশাপ’টা আরও বেশি বেশি তাড়া করে বেিড়য়েছে বলেই মনে হলো। নইলে বিশ্বকাপে এলেই কেন এমন একটা দিন যাবে, যখন কিছুতেই কিছু হয় না! প্রথম পর্তুগিজ খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপে গোল, গোলে সবচেয়ে বেশি শট—এসব পরিসংখ্যান শুধু রোনালদোর হৃদয় খুঁড়ে বেদনাই জাগাবে। এএফপি।