এখনো সক্রিয় ৭৩ বছর বয়সী দেশের প্রথম নারী প্রোগ্রামার শাহেদা মুস্তাফিজ

নিজের কাজের জায়গায় দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার শাহেদা মুস্তাফিজপ্রথম আলাে

প্রায় ৪৬ বছর আগের কথা। সে সময় দেশে হাতে গোনা কয়েকটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ছিল, যেগুলো বিদেশে সফটওয়্যার রপ্তানি করত। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ছিলেন সব পুরুষ। কারণ, সে সময় কোনো নারী তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন না। সুযোগও ছিল না। দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কম্পিউটারবিজ্ঞান পড়ানো হতো না। তবে দমে থাকেননি শাহেদা মুস্তাফিজ।

অর্থনীতিতে পড়াশোনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের এনসিআর করপোরেশনে সফটওয়্যার আর্কিটেকচার নিয়ে এক বছরের প্রশিক্ষণ নেন শাহেদা মুস্তাফিজ। এরপর ১৯৭৬ সালে সে প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ শাখায় সিস্টেমস ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে বাংলাদেশে এনসিআরের বাংলাদেশ অংশ কিনে নেয় লিডস করপোরেশন। শাহেদাও লিডসের কাজ শুরু করেন, অগ্রণী ভূমিকা রাখেন দেশের ব্যাংক অটোমেশন বা ব্যাংকিং সফটওয়্যার তৈরিতে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম নারী কম্পিউটার প্রোগ্রামার শাহেদা মুস্তাফিজের শুরু কথা।

শাহেদা মুস্তাফিজ
সংগৃহীত

১৯৪৯ সালে জন্ম শাহেদা মুস্তাফিজের। সেই হিসাবে এখন তাঁর বয়স ৭৩ বছর। এখনো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সক্রিয় তিনি। ছেলে রিদওয়ান মুস্তাফিজের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান রাইট সলিউশনের সফটওয়্যার বিভাগের দেখভাল করেন শাহেদা মুস্তাফিজ। কাজ করছেন বেশ কিছু সফটওয়্যার নিয়ে। গতকাল সোমবার সকালে প্রথম আলোকে তিনি জানালেন, এরই মধ্যে তাঁদের তৈরি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা এবং হিসাব ব্যবস্থানার সফটওয়ার ব্যবহৃত হচ্ছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে। তিনি বললেন, ‘হাসপাতাল অটোমেশন সফটওয়্যারের কাজ নিয়ে এখন আবার সময় ভালোই কাটছে।

শাহেদা মুস্তাফিজ জানালেন, এনসিআর ও লিডসে ২২ বছর কাজ করে ১৯৯৮ সালে ইস্তফা দেন। এরপর কাজ শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান প্রবিতি সিস্টেমসে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। বিদেশে সফটওয়্যার রপ্তানিতে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি কানাডার টোয়েন্টি-টোয়েন্টি টেকনোলজিস ইনকরপোরেটেডের বাংলাদেশ শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ই-টেকলজিকস ইনকরপোরেটেডের বাংলাদেশ শাখায় নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজের বাইরে তিনি শিশুদের জন্য এবং বিশেষ করে নারীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করেছেন। শাহেদা মুস্তাফিজ চার মেয়ে ও এক ছেলের মা। তাঁর স্বামী প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন একজন ব্যাংকার।

পুরোনো দিনের কথা ধরে শাহেদা মুস্তাফিজ বলেন, ‘সত্তরেরে দশকে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কোনো নারী কাজ করতেন না। সে সময় আমি এক মেয়েকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কাজের জন্য নিয়ে এলাম, চাকরি দিলাম। তখন পুরুষ কর্মীরা বলতে লাগলেন, “ম্যাডাম, এই মেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির কাজ কী পারবে?” তখন আমি বললাম, সেটা আমি বুঝব। কিছুদিন পর সেই ছেলেরাই আমার কাছে এসে বলল, “ম্যাডাম, আরও কিছু মেয়ে নিয়োগ দিলে ভালো হতো। কারণ, কাজ খুব ভালো হচ্ছে।” বর্তমানে আমার দলে অনেক নারী কর্মী কাজ করেছেন। তাঁরা চমৎকার কাজ করেন।’

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বর্তমানে নারীদের অবস্থান কেমন? শাহেদা মুস্তাফিজ বললেন, ‘আমার এখন খুব ভালো লাগে, নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবদান রাখছেন। তবে এখনো সন্তান-সংসারের পুরো দায়িত্ব নারীর একার। আমাদের কর্মজীবন আর পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য করে চলতে হয়। কিন্তু কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় প্রোগ্রামিং নিয়েই কাটাতে হয়। আমাদের সমাজে এটা সব সময় সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রোগ্রামিংয়ে নারীরা কম আসেন ঠিকই, তবে যাঁরা আসেন, তাঁরা কিন্তু খুব ভালো কাজ করেন।’