গ্রামীণফোনের উদ্যোগ
দ্রুতগতির ইন্টারনেট পেলেন মধুপুর বনের ফ্রিল্যান্সাররা
গারো তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাঁদের কাজ ব্যাহত হচ্ছিল উচ্চগতির ইন্টারনেটের অভাবে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বনাঞ্চলের গায়রা গ্রাম। গতকাল শনিবার সকাল সাতটা থেকেই সেখানে দেখা গেল সাজসাজ রব। গায়রা সেন্ট ফ্রান্সিস গির্জার মাঠে গাছাবাড়ি, ইদিলপুরসহ আশপাশের ৩০টি গ্রাম থেকে ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছেন গারো জনগোষ্ঠীর মানুষ। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকেও এসেছেন অনেক গারো তরুণ। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা শিশু–কিশোরদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ।
মধুপুরের বনাঞ্চলে গারো জনগোষ্ঠীর তরুণ সুবীর নকরেকের হাত ধরে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিংয়ের কাজে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অনেক গারো তরুণ। কিন্তু বনাঞ্চলে মুঠোফোনের দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেটের গতি কম থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হতো উদ্যমী এসব তরুণের। তাঁদের সেই দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে এসেছে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন।
এই তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও দুর্বল ইন্টারনেট সেবা নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা নজরে পড়েছিল গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমানের। এরপর তাঁর উদ্যোগে মধুপুরের গায়রা গ্রামে গ্রামীণফোন অস্থায়ী একটি টাওয়ার (বিটিএস বা বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন) স্থাপন করেছে। ফলে অনেকটা এলাকাজুড়েই পাওয়া যাচ্ছে গ্রামীণফোনের ফোর-জি গতির ইন্টারনেট। আর গ্রামবাসী তাঁদের মাটির ঘরের মধ্যেও পাচ্ছেন নেটওয়ার্ক, যা আগে শুধু ঘরের বাইরে পাওয়া যেত। আর গতকাল ছিল দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়ার আনন্দের উদ্যাপন।
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পৌঁছান গায়রা গ্রামে। সুবীর নকরেক যে উঠানে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করেছিলেন, গারো শিশু–কিশোরেরা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করে তাঁকে ও অন্য অতিথিদের নিয়ে যায় সেখানে। সুবীরের সঙ্গে উঠান বৈঠক করেন ইয়াসির আজমান। এরপর নকরেক প্রতিষ্ঠিত নকরেক আইটি ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন অতিথিরা।
দুপুরের দিকে আবারও গারোদের ঐতিহ্যবাহী রীতিতে অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয় গির্জার মাঠের মূল মঞ্চে। সেখানে তখন তরুণ ফ্রিল্যান্সারসহ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময় গ্রামীণফোনের সিইওসহ অতিথিদের মাথায় গারো জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ মুকুট ‘কুতুব’ পরিয়ে দেন গারোদের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা।
ইয়াসির আজমান বলেন, ‘গ্রামীণফোন প্রথমে কথা বলার সুযোগ করে দিত। এখন আমাদের লক্ষ্য মানুষের সামাজিক ক্ষমতায়ন করা। আট কোটির বেশি গ্রাহক রয়েছে গ্রামীণফোনের। মধুপুর বনাঞ্চলে নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিয়ে সামাজিক ক্ষমতায়ন কতটুকু অর্থপূর্ণ হয়েছে, তা দেখে আমি গর্বিত ও আপ্লুত।’
তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে বাপ্পু মৃ, হিমালয় হেনরি নকরেক, পরিতোষসহ বেশ কয়েকজন গ্রামীণফোনের সিইওকে জানান, এই এলাকার নেটওয়ার্ক এতই দুর্বল যে ঘরে বসে তো দূরের কথা, গাছের নিচে গেলেও তা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে রাতে খোলা মাঠে বসে বিদেশে গ্রাহকের কাছে ফাইল পাঠাতে হয়। তাঁরা এলাকাটির মোবাইল টাওয়ারের আওতা বাড়িয়ে এবং নতুন টাওয়ার বসিয়ে দুর্ভোগ লাঘবের অনুরোধ করেন।
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান তাঁদের জানান, পুরো এলাকা নিয়ে কাজ করা হবে। ২৩টি গ্রাম পরিদর্শন করা হয়েছে। এ অঞ্চলে টাওয়ার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত গায়রা গ্রামে গ্রামীণফোনের অস্থায়ী টাওয়ার বসানো হয়েছে। তিনি বলেন, এটি যেহেতু বনাঞ্চল, তাই এখানে স্থায়ী বিটিএস বসাতে বন বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। প্রশাসনের সহায়তা পেলে গ্রামীণফোন এখানে প্রয়োজনীয় বিটিএস স্থাপন করবে, যাতে তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে পারেন।
সমাবেশে সুবীর নকরেক জানান, তিনি ২০১৭ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করেন। প্রথম কাজে পেয়েছিলেন ৭৫ ডলার। এরপর তা বাড়তে থাকে। একার পক্ষে সেসব সামলানো যাচ্ছিল না। তাই নিজ জনগোষ্ঠীর তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কয়েকজনকে প্রস্তুত করেন। চালু করেন নকরেক আইটি ইনস্টিটিউট। এখন গায়রা গ্রামসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও জামালপুরে এ প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি শাখা রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
সুবীর নকরেক আরও বলেন, মধুপুর বনে ফ্রিল্যান্সিং ও ইন্টারনেটের দুর্বলতা নিয়ে প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকেই বিষয়টি জানতে পারে। এরপর গ্রামীণফোন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে।
সমাবেশে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিং নকরেক, লেখক রাহিতুল ইসলাম বক্তব্য দেন। সমাবেশে বিজ্ঞাপনী সংস্থা গ্রে ঢাকার ম্যানেজিং পার্টনার ও কান্ট্রি হেড গাউসুল আলম শাওন, গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস খায়রুল বাশার, প্রথম আলোর হেড অব ডিজিটাল বিজনেস জাবেদ সুলতান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ শেষে প্রথমা প্রকাশন প্রকাশিত রাহিতুল ইসলামের লেখা কল সেন্টারের অপরাজিতা বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করা হয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘গ্রামে বসে সুবীরের ডলার আয়’ এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো অনলাইনে ‘ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়েই ফ্রিল্যান্সিং করেন গারো তরুণেরা’ শিরোনামের দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।