সাক্ষাৎকার

আসুসের ১৬ হাজার কর্মীর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজারই প্রকৌশলী—পিটার চ্যাং

রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গত বুধবার আসুস বাংলাদেশ আয়োজন করেছিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ‘এআই পিসি’ উন্মোচন অনুষ্ঠান। সেই আয়োজনের পর গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকার দেন আসুস এশিয়া প্যাসিফিকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পিটার চ্যাং। আসুসের সাফল্যের রহস্য, বাংলাদেশের বাজারের সম্ভাবনা এবং এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সঙ্গে হওয়া আলাপচারিতার মূল অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সোহানুর রহমান

প্রথম আলো:

আসুস আজ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। অনেক বড় বড় ব্র্যান্ডের ভিড়ে আসুসের এই সাফল্যের নেপথ্যের কারণ আসলে কী?

পিটার চ্যাং: আসুসের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো আমাদের পণ্য। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ১৬ হাজার কর্মীর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ জনই প্রকৌশলী। আমরা এখনো ইন-হাউস গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। অনেক ব্র্যান্ডই এখন নকশা বা গবেষণার কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করিয়ে নেয়, কিন্তু আসুস প্রতিটি পণ্যের নকশা নিজেই করে। এতে আমরা সরাসরি ব্যবহারকারীদের চাহিদার খুব কাছাকাছি পৌঁছাতে পারি এবং দ্রুততম সময়ে নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনতে পারি। এটাই আমাদের প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।

প্রথম আলো:

বর্তমানে প্রযুক্তিবিশ্বে ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার। আসুস কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে?

পিটার চ্যাং: আমরা দুটি ধাপে কাজ করছি। প্রথমত, ইনটেল, এএমডি বা কোয়ালকমের মতো প্রসেসর নির্মাতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুততম সময়ে বাজারে এআই পিসি নিয়ে আসা। আমাদের নিজস্ব প্রকৌশলী দল থাকায় আমরা অন্যদের চেয়ে দ্রুত এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে যন্ত্র তৈরি করতে পারছি। দ্বিতীয়ত, আমরা শুধু যন্ত্র বিক্রি করছি না, বরং ব্যবহারকারী কেন এআই ব্যবহার করবেন, সেই প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করছি। যেমন প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো বা ল্যাপটপের ব্যাটারি লাইফ উন্নত করা। আমাদের বিশ্বাস, এআই পিসির যাত্রা কেবল শুরু হলো, ভবিষ্যতে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

প্রথম আলো:

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাজার দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে এখানকার বাজারকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?

পিটার চ্যাং: বাংলাদেশে আমাদের উপস্থিতির বয়স ২৯ বছর। বর্তমান বাজার বছরে প্রায় ৩ লাখ ইউনিটের হলেও ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে পিসি ব্যবহারের হার এখনো বেশ কম। এখানকার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী যখন পড়াশোনা ও কাজের জন্য ল্যাপটপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে, তখন এই বাজার ১০ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ১ নম্বর ব্র্যান্ড হওয়া এবং এ বছরের মধ্যেই ৩০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার অর্জন করা।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশের মতো বাজারগুলোতে মূল্যের সংবেদনশীলতা বা সাপ্লাই চেইনের মতো চ্যালেঞ্জগুলো আপনারা কীভাবে মোকাবিলা করেন?

পিটার চ্যাং: বাংলাদেশের গ্রাহকেরা ল্যাপটপ কেনার সময় দামের ব্যাপারে বেশ সচেতন। ডলারের দাম বৃদ্ধি বা যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার ফলে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে আমরা ব্যবহারকারীদের এটি বোঝানোর চেষ্টা করছি যে সঠিক ও টেকসই পণ্য কেনা কেন জরুরি। লজিস্টিক বা পণ্য সরবরাহে সময় বেশি লাগা আমাদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রাহকদের সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছাতে আমরা সাপ্লাই চেইন আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।

প্রথম আলো:

ছাত্রদের জন্য ওএলইডি পর্দা বা এনপিইউ-এর মতো ফিচারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনাদের আছে কি?

পিটার চ্যাং: ওএলইডি পর্দাকে সাধারণ গ্রাহকদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে আসুসই প্রথম কাজ শুরু করেছিল। সে কারণেই আজ ওএলইডি ল্যাপটপের বাজারের ৮০ শতাংশ আমাদের দখলে। আমরা সব সময় চেষ্টা করি এআই পিসি বা নতুন প্রযুক্তিগুলো যেন শুধু দামি যন্ত্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে। এনপিইউ বা এআই সক্ষমতাও আমরা ধীরে ধীরে এন্ট্রি-লেভেল ল্যাপটপে নিয়ে আসছি।

পিটার চ্যাং
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

বাংলাদেশের যাঁরা প্রযুক্তিতে পেশা গড়তে চান, সেই তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

পিটার চ্যাং: আমি বলব, নতুন কিছু জানার আগ্রহ বা কৌতূহল থাকতে হবে। আপনার হাতে থাকা ফোন বা কম্পিউটার কীভাবে কাজ করছে, কেন এটি দ্রুত বা ধীর হচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো করুন। এই কৌতূহল থেকেই জ্ঞান তৈরি হয়। সেই সঙ্গে পরিশ্রমী ও সক্রিয় হতে হবে। সুযোগ আপনার দরজায় কড়া নাড়বে, কিন্তু সেটি গ্রহণ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।

প্রথম আলো:

আচ্ছা, ব্যক্তিগত একটি প্রশ্ন করি। কাজের বাইরে কোন ধরনের প্রযুক্তি আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানে?

পিটার চ্যাং: আমি এখনো গেমিং প্রযুক্তি নিয়ে খুব রোমাঞ্চিত বোধ করি। ছাত্র অবস্থায় আমি প্রচুর গেমস খেলতাম। এখনো আসুসের হ্যান্ডহেল্ড গেমিং যন্ত্রগুলোতে আমি নিয়মিত গেম খেলি।

প্রথম আলো:

যদি আপনি প্রযুক্তিজগতে না আসতেন, তবে কোন পেশা বেছে নিতেন?

পিটার চ্যাং: আমি আসলে সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবসা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। তাই সম্ভবত আমি অন্য কোনো ধরনের ব্যবসায় যুক্ত থাকতাম। তবে প্রযুক্তি ছাড়া জীবন ভাবা এখন কঠিন।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশের গ্রাহক এবং আসুস ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চান?

পিটার চ্যাং: যাঁরা আসুসের ওপর আস্থা রেখেছেন, তাঁদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমরা চাই, বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রযুক্তিকে আপন করে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাক। আসুস বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে তাদের পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। খুব শিগগির আপনারা বাংলাদেশের দোকানগুলোতে আরও বৈচিত্র্যময় পণ্য ও আন্তর্জাতিক মানের তথ্যসেবা দেখতে পাবেন।

প্রথম আলো:

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

পিটার চ্যাং: আপনাকেও ধন্যবাদ। শুভকামনা।