সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ডিজিটাল সংযোগ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
জুলিয়ান গোরম্যান: আমি যখন মিয়ানমারে কাজ করতাম, তখন দেখেছি একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রথমবারের মতো নেটওয়ার্কের আওতায় আনলে তাদের জীবন কতটা বদলে যায়। বাংলাদেশে এখনো প্রায় অর্ধেক মানুষ মোবাইল ব্রডব্যান্ড বা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যখন আমরা সংযোগের আওতায় আনতে পারব, তখন কৃষকদের জীবন, শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আসবে। ডিজিটাল সংযোগ হলো সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় সহজে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তবে শুধু সংযোগ দিলেই হবে না, মূল রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন (ইনোভেশন), যা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার ডিজিটাল সমাধান তৈরি করবে।
গ্রামীণ ও কম আয়ের মানুষের কাছে ইন্টারনেট আরও সাশ্রয়ী করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
জুলিয়ান গোরম্যান: বাংলাদেশ সরকার বাজেটে সিম কার্ডের ওপর থেকে কর তুলে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এটি সংযোগ বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে এখনো স্মার্টফোনের অতিরিক্ত দাম একটি বড় অন্তরায়। ইন্টারনেট ও অবকাঠামো সাশ্রয়ী করতে আমাদের অবকাঠামো ভাগাভাগি (ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং) এবং স্পেকট্রামের (তরঙ্গ) মূল্যের দিকে নজর দিতে হবে। এ বছরের শেষে যে তরঙ্গ নবায়ন (স্পেকট্রাম রিনিউয়াল) প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে অপারেটরদের খরচ কমানোর সুযোগ দিলে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমবে এবং গুণগত মান বাড়বে। এর পাশাপাশি মানুষের ডিজিটাল দক্ষতাও বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মোবাইল সংযোগ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
জুলিয়ান গোরম্যান: বাংলাদেশের ৩৫ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ, যা এই দেশের অন্যতম বড় শক্তি। এই তরুণদের প্রযুক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। একবার ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারলে, উন্নত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো দক্ষতাসহ অসংখ্য শিক্ষণীয় বিষয় তাঁরা বিনা মূল্যে অনলাইনেই শিখতে পারবে। এটি তাঁদের ফ্রিল্যান্সিং বা গিগ ইকোনমির মাধ্যমে ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকারের ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আইসিটি খাতকে রপ্তানির প্রধান খাত হিসেবে গড়ে তুলতে এই তরুণদের দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই। মানসম্পন্ন সংযোগের ওপর ভিত্তি করে এই সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাত দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।
দেশে বিপুল পরিমাণ সিম কার্ডের ব্যবহার থাকলেও ইন্টারনেটের ব্যবহার এখনো অনেক কম। এই ব্যবধান কীভাবে কমানো সম্ভব?
জুলিয়ান গোরম্যান: বাংলাদেশে ফোর-জি নেটওয়ার্কের কাভারেজ প্রায় ৯৯ শতাংশ, যা চমৎকার। কিন্তু ব্যবহারের এই বড় ব্যবধান কমানোর জন্য প্রথমত যন্ত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বাস বা আস্থার সংকট দূর করতে হবে। অনেকেই অনলাইন জালিয়াতি বা স্ক্যামের ভয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে চান না। এখানে সরকারের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সরকার যখন তার সব নাগরিক সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তর করবে, তখন প্রত্যেক মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা বা কারণ তৈরি হবে। এটি দেশের সার্বিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করবে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি এবং জিএসএমএ এই বিষয়ে কী করছে?
জুলিয়ান গোরম্যান: নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা মোবাইলশিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বর্তমানে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল স্ক্যাম এবং জালিয়াতি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিএসএমএ বৈশ্বিকভাবে ‘ইউনাইটেড এগেইনস্ট স্ক্যামস’ উদ্যোগের মাধ্যমে এই জালিয়াতি প্রতিরোধে কাজ করছে। আমাদের ‘ওপেন গেটওয়ে’ কর্মসূচির আওতায় এমন কিছু প্রযুক্তি (এপিআই) নিয়ে আসা হচ্ছে, যা এসএমএস ওটিপি ছাড়াই ব্যাকগ্রাউন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইল নম্বর যাচাই করতে পারবে। এতে গ্রাহকের জালিয়াতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখাটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
জুলিয়ান গোরম্যান: আমি অত্যন্ত আশাবাদী। বাংলাদেশ সরকার আইসিটি খাতকে রূপান্তরের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং সিম কার্ডরে কর প্রত্যাহারের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং উদীয়মান বাজার। আমরা যদি ভিয়েতনাম বা ভারতের দিকে তাকাই, দেখব যে সঠিক নিয়ন্ত্রণনীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ কীভাবে একটি দেশের ডিজিটাল চিত্র বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের এই রূপান্তরের যাত্রায় জিএসএমএ সব সময় পাশে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানে সহায়তা করবে।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
জুলিয়ান গোরম্যান: আপনাকেও ধন্যবাদ।