১০৪টি দেশে বাংলাদেশের আইটি পণ্য ও সেবা রপ্তানি হচ্ছে
বাংলাদেশের বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিশ্বের ১০৪টির বেশি দেশে সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি করছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫০০টি বেসিস সদস্য প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে যুক্ত, যার মধ্যে প্রায় ৩০০টি নিয়মিতভাবে সক্রিয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০ হাজার উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান রপ্তানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট–২০২৬ আয়োজনে এ তথ্য জানা যায়।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি খাতের অগ্রযাত্রা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট–২০২৬। সরকারের বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের সহযোগিতায় ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে দেশের আইটি ও আইটিইএস সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক, শিল্পনেতারা ও বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য অংশগ্রহণ করেন। আয়োজনটির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতের দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলা, অর্জন, বৈশ্বিক বিস্তার ও ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরা।
বেসিসের এ আয়োজনে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শীর্ষ ১০টি আইটি ও আইটিইএস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বিআইজেআইটি লিমিটেড, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেড, উল্কাসেমি প্রাইভেট লিমিটেড, সেলিস ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মস, সেফালো বাংলাদেশ লিমিটেড, স্যামসাং আরঅ্যান্ডডি ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ লিমিটেড, এনোসিস সলিউশনস, থেরাপ (বিডি) লিমিটেড, রেডিয়েন্ট ডেটা সিস্টেমস লিমিটেড ও ডেটা পাথ লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও উন্নয়ন, ফিনটেক, হেলথটেক ও উচ্চ মূল্যের আইটি সেবায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরছে। উল্কাসেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ঢাকা অফিসে মাত্র এক প্রকৌশলী নিয়ে শুরু করেছিলাম, আজ আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন ৬০০ প্রকৌশলী। এখন আমরা ঢাকায় বসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য চিপ ডিজাইন করছি।’
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বেসিসের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে বিশ্বের ১০৪টির বেশি দেশে সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, হংকং, সিঙ্গাপুর ও কানাডা বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ আইটি রপ্তানি গন্তব্য।
অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণে তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ, সেলিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুলিয়ান আন্দ্রিন ওয়েবার, ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির, সেফালো বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস মাহমুদ ও জাইকা বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি মোরিকাওয়া ইউকো। আলোচকেরা আইটি রপ্তানি সম্প্রসারণে নীতিনির্ধারক, আর্থিক খাত ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য মুশফিকুর রহমান ও রাশেদ কামাল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের আইটি ও আইটিইএস খাত এখন দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও সরকারের সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তার ফলে এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। সরকার তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে নানামুখী নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে। ক্যাশ ইনসেনটিভ, কর অবকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সহজীকরণের মাধ্যমে আইটি রপ্তানি খাতের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে বেসিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য মোস্তফা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বেসিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে এবং দেশের আইটি–শিল্প বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট–২০২৬ কেবল একটি সম্মাননা অনুষ্ঠান নয়, এটি বেসিসের দীর্ঘ পথচলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে আমরা অতীত অর্জন স্মরণ করছি, বর্তমান বাস্তবতা অনুধাবন করছি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’
বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট–২০২৬–এর আহ্বায়ক ও বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য রওশন কামাল বলেন, বাংলাদেশের আইটি ও আইটিইএস খাত এখন শুধু সম্ভাবনার নয়; বরং বাস্তব সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট–২০২৬ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশের শীর্ষ আইটি রপ্তানিকারকদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা এবং তাঁদের সফলতার গল্প তুলে ধরে নতুন উদ্যোক্তা ও উদীয়মান প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুপ্রাণিত করা।
সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব ও বেসিস প্রশাসক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ্ খান বলেন, মাত্র ১৮টি সদস্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেসিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ২ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে। এই সংগঠনের সদস্যরাই বাংলাদেশের আইটি রপ্তানির মূল চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাত আগামী দিনে আরও টেকসই ও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি খাত ও শিল্প সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।