মাছ কাটার বঁটিতেই অভাব কেটেছে ফারজানা, রেনু ও রোকেয়াদের

ফারজানা রহমান, রোকেয়া বেগম ও রেনু বেগম (বাঁ থেকে)প্রথম আলো

রাজধানীর কোলাহল ছাপিয়ে কোথাও কোথাও রাত দুইটাতেও শোনা যায় বঁটির ধারালো শব্দ। সেই শব্দের প্রতিটি ছন্দে মিশে আছে টিকে থাকার লড়াই, আত্মসম্মান আর ভালোবাসার গল্প। ফারজানা, রেনু বেগম আর রোকেয়া বেগম—বয়স কিংবা জীবনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও আজ তাঁরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে। কেউ হারিয়েছেন সাজানো সংসার, কেউ লড়াই করেছন অসুস্থ স্বামীর নিশ্বাসটুকু সচল রাখতে, আবার কেউ আশি বছর বয়সে তিনটি অস্ত্রোপচার নিয়েও অন্যের কাছে হাত পাততে নারাজ।

অনলাইনে মাছ বিক্রির প্রতিষ্ঠান রিভার ফিশে মাছ কাটার শ্রমসাধ্য কাজই এখন তাঁদের কাছে আনন্দ আর পরম সম্মানের। কারণ, এই বঁটিই তাদের দিয়েছে মাথা উঁচু করে বাঁচার রসদ। সমাজ যাকে ‘ছোট কাজ’ বলে দূরে ঠেলে দিতে চায়, সেই কাজকেই জীবনের ঢাল বানিয়ে এই তিন নারী প্রমাণ করেছেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে শূন্য থেকেও নতুন এক পৃথিবী গড়া সম্ভব। গত শুক্রবার ঢাকার হাতিরঝিলের কাছে রিভার ফিশের কার্যালয়ে দেখা যায় এই তিনজন নারীসহ অনেকেই মাছ কাটছেন। শোনা যাক সেই তিন যোদ্ধার অদম্য জীবনযুদ্ধের গল্প।

ফারজানা রহমান: সন্তানদের ভবিষ্যৎই যাঁর মূলধন

রাজধানীর মেরুল বাড্ডার হাতিরঝিল–সংলগ্ন নিজেদের বাড়ি, সচ্ছল সংসার আর স্বামীর গানের সুর—সব মিলিয়ে ৩৮ বছরে বয়সী ফারজানা রহমানের জীবনটা ছিল ছবির মতো সাজানো। কিন্তু জীবন সব সময় সরলরেখায় চলে না। স্বামীর মাদকাসক্তি আর মানসিক অসুস্থতা হঠাৎ করেই কালবৈশাখী হয়ে হানা দেয় তার সাজানো সংসারে। সেই সুযোগ নেয় আপনজনেরা; কৌশলে কেড়ে নেয় মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও।

ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ফারজানা রহমান তখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। একদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে তিন সন্তানের দায়িত্ব। কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার পাত্রী নন। আভিজাত্যের মোহ কিংবা ‘লোকে কী বলবে’ এমন দুশ্চিন্তাকে তুচ্ছ করে তিনি বেছে নিলেন কঠিন পরিশ্রমের পথ। গত এক বছর ধরে ফারজানা রহমান রিভার ফিশে মাছ কাটার কাজ করছেন।

ফারজানা রহমান বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাজ করা আমার কাছে অসম্মানের মনে হতো, কিন্তু এই মাছ কাটার কাজে আমি সম্মান পাই। এটাকে আমি আমার চাকরি মনে করি এবং এই কাজ করে আমি আনন্দ পাই। আমার সন্তানদের মানুষ করছি এই উপার্জন দিয়েই এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।’ প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। এই সামান্য আয়েই বোনা হচ্ছে তাঁর সন্তানদের বড় হওয়ার স্বপ্ন। বড় মেয়ে একটি কলেজে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পড়ছেন, মেজ ছেলে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী আর ছোট ছেলে পড়ছে প্রথম শ্রেণিতে। ফারজানার কাছে হারানো সম্পদ কিংবা হাতছাড়া হওয়া জমি আজ আর আক্ষেপের বিষয় নয়। তার প্রকৃত সম্পদ এখন সন্তানদের শিক্ষা আর তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

অনলাইনে মাছ বিক্রির প্রতিষ্ঠান রিভার ফিশে মাছ কাটছেন কর্মীরা
প্রথম আলো

রেনু বেগম: যেখানে ক্ষুধা হার মানে ভালোবাসার কাছে

রাত যখন নিঝুম হয়ে আসে, তখন রেনু বেগমের (৪৫) দিন যেন নতুন করে শুরু হয়। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই, অথচ রেনুর হাতে ধারালো বঁটি আর রুপালি আঁশের মাছের পাহাড়। চারপাশ নিস্তব্ধ হলেও তাঁর মনের ভেতর এক অদৃশ্য যুদ্ধের দামামা বাজে। গত দশ বছর ধরে এই যুদ্ধই তাঁর নিত্যসঙ্গী।

সকালে যখন তাঁর সহকর্মীরা মিলে টিফিন ভাগ করে খান, হাসি গল্পে মেতে ওঠেন, রেনু তখন আড়ালে সরে যান। কেউ নাশতা সাধলে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলেন, ‘পেটটা আজ ভার হয়ে আছে, থাক না।’ অথচ সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কঠিন সংকল্প। নিজের দুপুরের খাবারের টাকাটা বাঁচলে তবেই বিকেলের প্রেসারের ওষুধটা কেনা হবে; বিকেলে না খেয়ে থাকলে তবেই রাতে স্বামীর ইনসুলিনটা নিশ্চিত করা যাবে।

রেনুর কাছে ক্ষুধার জ্বালা বড় নয়, বড় হলো তাঁর অসুস্থ স্বামীর কষ্টের নিশ্বাস। গত মাসে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যখন ২৮ হাজার টাকার বেশি আয় করলেন, তখন সহকর্মীরা ভেবেছিল রেনু হয়তো এবার নিজের জন্য একটা ভালো শাড়ি কিনবেন। কিন্তু মাস শেষে সেই টাকার প্রতিটি পয়সা চলে গেল ওষুধের নীল-সাদা প্যাকেটে। দুই ছেলে বড় হয়েছে, তারাও চেষ্টা করছে, কিন্তু রেনু নিজের কাঁধ থেকে স্বামীর দায়িত্ব এক চুলও নামতে দেননি।

রেনু বেগম বলেন, ‘এই চাকরিটা আছে বলেই আমি আমার স্বামীর জন্য কিছু করতে পারছি। আমার নিজের ক্ষিদে বড় না গো, ওনার নিশ্বাসটুকু সচল রাখাই আমার আসল সার্থকতা।’ ভোলায় বাড়ি রেনু বেগমের। তিনি এক নীরব যোদ্ধা, যাঁর কাছে ভালোবাসার মানে হলো নিজের শেষ সম্বলটুকু বিসর্জন দিয়ে স্বামী বাঁচিয়ে রাখা।

রোকেয়া বেগম: তিন প্রজন্মের বঁটি ও বেঁচে থাকার লড়াই

শীতের সকালের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। রিভার ফিশের এক কোণে বঁটি হাতে বসে পড়েছেন আশি ছুঁইছুঁই রোকেয়া। শরীরটা জরাজীর্ণ, কিন্তু হাতের ধারালো বঁটি যখন মাছের আঁশ ছাড়ে, তখন বোঝার উপায় নেই যে এই বৃদ্ধার শরীরে তিন-তিনবার বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছে।

রোকেয়ার মাথায় টিউমার বাসা বেঁধেছিল। সেই মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের সবটুকু সঞ্চয় খরচ হয়ে গেছে হাসপাতালে। মানুষ এই বয়সে এসে একটু আশ্রয়ের খোঁজ করে, অন্যের করুণার পাত্র হয়। কিন্তু রোকেয়া অন্য ধাতুতে গড়া। মাথায় এখনো অস্ত্রোপচারের দাগ টাটকা, কিন্তু মনে কোনো দৈন্য নেই। গত ৫-৬ বছর ধরে তিনি মাছ কেটেই নিজের ওষুধের টাকা জোগাড় করছেন।

রোকেয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্তানদের নিজেদেরই চলে না বাবা, আমাকে কী দেবে? হাত পাতার চেয়ে এই বঁটি চালানো অনেক সম্মানের। নিজেরটা নিজেই করছি, এতেই শান্তি।’

রোকেয়ার এই জেদ কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর জীবনের সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্য হলো একই জায়গায় মাছ কাটছেন তাঁর মেয়ে এবং নাতনিও। অভাব আর ভাগ্যের ফেরে তিন প্রজন্মের নারীরা মিলে এক অনন্য যুদ্ধে নেমেছেন।
রিভার ফিশের প্রতিষ্ঠাতা ফারজানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন তাঁদের দেখি, তখন তাঁরা কেবল শ্রমিক নন, তাঁরা একেকজন যোদ্ধা। শারীরিক অসুস্থতা আর সামাজিক রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ফারজানা, রেনু আর রোকেয়ারা আজ এক অনন্য উদাহরণ।’