কোন কোন পাম্পে তেল মিলবে, তার খোঁজ দিচ্ছে ‘তেল কই’ ওয়েবসাইট
জ্বালানি তেলের সংকট আর পাম্পে দীর্ঘ সারি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ঠিক এই সময়ে স্বস্তি দিতে হাজির হয়েছে নতুন একটি ডিজিটাল সমাধান। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের মজুতের সর্বশেষ তথ্য জানাতে চালু হয়েছে ‘তেল কই’ নামের ওয়েবসাইট।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সরবরাহ-সংকটের ভয়ে দেশের বড় শহরগুলোতে তেলের পাম্পে প্রচণ্ড ভিড় তৈরি হয়েছে। অনেক সময় চালকেরা এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরেও তেল পাচ্ছেন না। এতে সময় ও জ্বালানি দুই-ই নষ্ট হচ্ছে। তেল কই ওয়েবসাইটটি মূলত চালকদের এই হয়রানি থেকে মুক্তি দিচ্ছে। গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার আগেই চালকেরা দেখে নিতে পারছেন কোন পাম্পে তেল আছে আর কোথায় নেই। এটি তেলের জন্য অনিশ্চিত ঘোরাঘুরি কমিয়ে আনছে। বর্তমানে দেশে তেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং প্রাইভেট কারের জন্য ১০ লিটার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বড় যানবাহনের জন্য আলাদা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। এমন পরিস্থিতিতে তেল কই ওয়েবসাইটটি সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে
ওয়েবসাইটটি মূলত কমিউনিটিনির্ভর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ পাম্পে তেল আছে কি না, সেই তথ্য দেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা। ওয়েবসাইটটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত শত শত পাম্পের তালিকা রয়েছে। কোনো স্টেশনের নাম তালিকায় না থাকলে ব্যবহারকারীরা তা যুক্ত করতে পারেন।
লাইভ আপডেট ও তথ্যের সত্যতা
লাইভ আপডেট এই ওয়েবসাইটের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যবহারকারীরা সরাসরি পাম্প থেকে সর্বশেষ অবস্থা জানাতে পারেন। তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ে এখানে একটি চমৎকার ভোটব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ যদি কোনো স্টেশনে তেলের মজুত নিয়ে রিপোর্ট করেন, অন্য ব্যবহারকারীরা হ্যাঁ বা না ভোটের মাধ্যমে তার সত্যতা নিশ্চিত বা বাতিল করতে পারেন। যত বেশি মানুষ তথ্য দেন, ডেটা তত বেশি নিখুঁত হয়।
যেসব তথ্য জানা যাবে
ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাম্পের তালিকা দেখা যায়। নির্দিষ্ট পাম্পে পেট্রল, অকটেন বা ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা জানার পাশাপাশি লিটার প্রতি তেলের বর্তমান দামও দেখা যায়। পাম্পে গ্রাহকদের ভিড় কেমন বা দীর্ঘ লাইন আছে কি না, সেই তথ্যও ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন মন্তব্য থেকে বোঝা সম্ভব।
পেছনের গল্প
ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা সজিব খান প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ট্রাফিক গ্রুপে প্রতিদিন মানুষ জ্বালানি তেল নিয়ে নানা তথ্য শেয়ার করেন। তবে এসব তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। বিভিন্ন গ্রুপ বা পেজ ঘুরে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগের সমাধান করতে চাই আমি। সব তথ্য এক জায়গায় পাওয়ার কোনো সুযোগ তখন ছিল না। মূলত সেই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য থেকেই নিজের উদ্যোগে এই ওয়েবসাইটটি তৈরি করি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়েবসাইটটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। চালুর পর থেকেই এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এখন পর্যন্ত ২৬ লাখবারের বেশিবার ওয়েবসাইটটি দেখা হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই ১০ লাখের বেশি মানুষ সাইটটি দেখেছেন। বর্তমানে প্রতি মিনিটে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ব্যবহারকারী ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করছেন। একজন চালক বা সাধারণ ব্যবহারকারী খুব সহজেই ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করে বিভিন্ন পাম্পের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারেন। শুধু তথ্য জানাই নয়, ব্যবহারকারীরা সেখানে নিজেদের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করতে পারছেন। কোনো পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেলে বা দীর্ঘ লাইন থাকলে সেটি অন্যকে দ্রুত জানানোর সুযোগ রয়েছে। মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এ উদ্যোগটি এখন একটি জরুরি সেবায় পরিণত হয়েছে।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারিগর সজিব খান ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক। বর্তমানে তিনি পাঠাও কুরিয়ারে ডেটা অ্যানালিটিকস এবং এআই অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারসে লিড ডেটা ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।