জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রজাপতির অভিবাসন বদলে যাচ্ছে
প্রতিবছর হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোর পর্বতমালায় উড়ে আসে মোনার্ক প্রজাপতি। এই যাত্রা দেখতে যতটা সাবলীল ও সুন্দর, এর নেপথ্যের ভারসাম্য ততটাই জটিল। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মোনার্ক প্রজাপতির এই ঐতিহাসিক ও ছন্দময় অভিবাসন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ুর প্রভাব পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতিসহ ডিম ও লার্ভার (ক্যাটারপিলার) অস্তিত্বকেও বিপন্ন করে তুলছে।
মোনার্ক প্রজাপতির জীবনের প্রাথমিক ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ডিম ফোটা ও গুটিপোকাদের বেড়ে ওঠা পুরোপুরি নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং সঠিক উদ্ভিদের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই প্রাথমিক ধাপগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি শরৎকালে মোনার্কদের একটি বিশেষ প্রজন্ম দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করে এবং মেক্সিকোর মোনার্ক বাটারফ্লাই বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শীত কাটায়। বসন্ত এলে তারা আবার উত্তরে ফিরতে শুরু করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে মেক্সিকোতে পৌঁছানো প্রজাপতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বনাঞ্চল উজাড় হওয়া এবং পরজীবী সংক্রমণের পাশাপাশি এখন অনিয়মিত আবহাওয়া তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোনার্ক প্রজাপতির বংশবৃদ্ধির জন্য মিল্কউইড জাতীয় উদ্ভিদ অপরিহার্য। স্ত্রী মোনার্ক কেবল এই গাছের পাতার নিচেই ডিম পাড়ে এবং ক্যাটারপিলাররা কেবল এই গাছের পাতা খেয়েই বড় হয়। এই গাছ থেকে তারা একধরনের রাসায়নিক সংগ্রহ করে, যা তাদের শরীরকে শিকারিদের কাছে বিস্বাদ করে তোলে। বিজ্ঞানীরা মেক্সিকোর অভিবাসনপথে জন্মানো ৪৬ প্রজাতির মিল্কউইড নিয়ে গবেষণা করেছেন। কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে দেখা গেছে, ২০৩০ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মেক্সিকোর ভেতরে প্রজাপতিদের বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত এলাকাগুলো ক্রমশ দক্ষিণ দিকে সরে যাবে।
গবেষণায় আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রজাতি হিসেবে হয়তো মোনার্ক বিলুপ্ত হবে না, কিন্তু তাদের বিখ্যাত অভিবাসন প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ২০৭০ সালের মধ্যে প্রজাপতিদের উপযুক্ত চারণভূমি বা বাসস্থান প্রায় ৮ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ মেক্সিকোর উত্তর সীমান্ত থেকে ক্রমশ আরও দক্ষিণের দিকে সরে যাবে। প্রজননক্ষেত্র দক্ষিণে সরে গেলে প্রজাপতিরা হয়তো আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উত্তরে ফিরবে না। তারা মেক্সিকোর মধ্যাঞ্চলেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করতে পারে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি না দেওয়ার ফলে বিবর্তনের ধারায় এই প্রজাপতিদের ডানা ছোট হয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে তাদের দীর্ঘ উড্ডয়নক্ষমতা কমিয়ে দেবে। মোনার্ক প্রজাপতির এ অভিবাসন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোকে একটি প্রাকৃতিক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো রাজনৈতিক সীমানা মানে না, ঠিক যেমন প্রজাপতিরাও মানে না। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ মোনার্কদের এই বিশ্বখ্যাত অভিবাসন হয়তো নতুন কোনো পথে পরিচালিত হবে বা পুরোপুরি থেমে গিয়ে কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবির অ্যালবামে বন্দী হয়ে থাকবে। এই মহাজাগতিক দৃশ্য রক্ষা করতে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশের মধ্যে সমন্বিত বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। গবেষণাটি পিএলওএস ক্লাইমেট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম