টাইমের ২০২৬ সালের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নায়কেরা

টাইমের ২০২৬ সালের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতের অনেকেই রয়েছেনকোলাজ ছবি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে একঝাঁক প্রতিভাবান ব্যক্তি স্থান পেয়েছেন। টাইমের তালিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবের অন্যতম কারিগর হিসেবে পরিচিত অ্যানথ্রোপিকের দারিও আমোদেই, ড্যানিয়েলা আমোদেই এবং গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাইসহ অনেকেই রয়েছেন। টাইমের ২০২৬ সালের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় থাকা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নায়কদের নাম জেনে নেওয়া যাক।

রিড ওয়াইজম্যান ও টনি টাইসন (বাঁ থেকে)

মহাকাশ ও বিজ্ঞানের নতুন দিগন্তে রিড ওয়াইজম্যান ও টনি টাইসন

মহাকাশ গবেষণায় ২০২৬ সাল একটি মাইলফলক। রিড ওয়াইজম্যান আর্টেমিস–২ মিশনের কমান্ডার হিসেবে ৫৪ বছর পর মানুষকে চাঁদের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। চারজনের এ দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ওরিয়ন মহাকাশযানটিকে পৃথিবী থেকে ৪ হাজার ৭০০ মাইল দূরে নিয়ে গেছেন, যা মানবের ইতিহাসে যেকোনো মানুষের পাড়ি দেওয়া দূরত্বের চেয়ে বেশি। রিড ওয়াইজম্যানের মতে, আর্টেমিস–২ হলো চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসবাস ও কাজের পূর্বপ্রস্তুতি। অন্যদিকে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণে বিপ্লব ঘটিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী টনি টাইসন। চিলির ভেরা সি রুবিন অবজারভেটরিতে তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩ হাজার ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার সাহায্যে তাঁরা মহাকাশের ১০ বছরের একটি ‘টাইম-ল্যাপস’ বা এলএসএসটি  শুরু করেছেন। টাইসনের এ উদ্ভাবন প্রতি রাতে লাখ লাখ নতুন মহাজাগতিক বস্তু উন্মোচন করবে, যা কৃষ্ণগহ্বর ও ডার্ক ইউনিভার্স সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দেবে।

সুন্দর পিচাই ও নীল মোহান (বাঁ থেকে)

প্রযুক্তির শীর্ষে সুন্দর পিচাই ও নীল মোহান

টাইম ২০২৬ তালিকায় রয়েছেন গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই। তিনি গত এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছেন। ২০২৬ সালে তাঁর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। চ্যাটজিপিটির উত্থানের পর পিচাই দ্রুত গুগল ব্রেইন ও ডিপমাইন্ডকে একীভূত করে জেমিনি তৈরি করেন। তাঁর নেতৃত্বে গুগল সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি ন্যানো বানানা ও অ্যান্টিগ্র্যাভিটির মতো বৈপ্লবিক এআই পণ্য দিয়ে প্রযুক্তিবিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। একইভাবে ইউটিউবের সিইও নীল মোহান প্ল্যাটফর্মটিকে কেবল ভিডিও শেয়ারিং সাইট থেকে টেলিভিশনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৫ সালে ইউটিউব আমেরিকার টেলিভিশন সেটে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও প্রোভাইডার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মোহনের বিশেষত্ব হলো, তিনি একদিকে যেমন জটিল সফটওয়্যার প্রকৌশল বোঝেন, তেমনি বিজ্ঞাপনদাতা ও আধেয় (কনটেন্ট) নির্মাতাদের সঙ্গেও চমৎকার সম্পর্ক বজায় রাখেন। তাঁর হাত ধরেই ইউটিউব আজ গ্লোবাল মিডিয়া জায়ান্টে পরিণত হয়েছে।

মারিয়াঞ্জেলা হুংরিয়া, কিরণ মুসুনুরু ও রেবেকা আরেনস (বাঁ থেকে)

টেকসই কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিপ্লবের নায়ক মারিয়াঞ্জেলা হুংরিয়া, কিরণ মুসুনুরু ও রেবেকা আরেনস

টাইম ২০২৬ তালিকায় আছেন ব্রাজিলীয় কৃষিবিজ্ঞানী মারিয়াঞ্জেলা হুংরিয়া। তিনি কৃষি খাতে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছেন। রাসায়নিক সারের বদলে তিনি মাটির এমন এক অণুজীব উদ্ভাবন করেছেন যা প্রাকৃতিকভাবে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে। আজ ব্রাজিলের ৮৫ শতাংশ সয়াবিন এ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। এর ফলে কৃষকদের বছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে এবং ২৩০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় থাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশা জাগিয়েছেন কিরণ মুসুনুরু ও রেবেকা আরেনস-নিকলাস। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে ক্রিসপার জিন-এডিটিং প্রযুক্তি দিয়ে প্রাণঘাতী রোগ নিরাময় করা সম্ভব। ২০২৫ সালে তাঁরা বেবি কেজে নামক এক শিশুর বিরল মেটাবলিক রোগ মাত্র ছয় মাসে ব্যক্তিগত জিন থেরাপির মাধ্যমে সারিয়ে তুলেছেন। তাঁদের এ উদ্ভাবন হাজার হাজার অসুস্থ শিশুর জন্য ব্যক্তিগত জিনগত চিকিৎসার দরজা খুলে দিয়েছে।

জোশ ডি’অ্যামারো ও মিস্টার বিস্ট (বাঁ থেকে)

সৃজনশীলতায় জোশ ডি’অ্যামারো ও মিস্টার বিস্ট

তালিকায় থাকা ডিজনি কোম্পানির অষ্টম সিইও হিসেবে জোশ ডি’অ্যামারো সৃজনশীলতার এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। বব ইগারের উত্তরসূরি হিসেবে জোশ ডিজনি ভক্তদের আবেগ ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। গুণগত মান ও খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ ডিজনিকে বিশ্বজুড়ে আনন্দ ও সুখের প্রতীক হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, ইউটিউব সেনসেশন মিস্টার বিস্ট (জেমি ডোনাল্ডসন) দেখিয়েছেন, কীভাবে জনপ্রিয়তা ও অর্থকে সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবস্ক্রাইবার বেস ব্যবহার করে তিনি বড় বড় চ্যালেঞ্জ আর অসাধারণ উদারতার মাধ্যমে মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছেন। তাঁর কাজগুলো প্রমাণ করে যে একটি ভালো আইডিয়া ও মানুষের বিশ্বাস থাকলে পৃথিবীকে বদলে দেওয়া সম্ভব।

সুসান ডেল ও মাইকেল ডেল (বাঁ থেকে)

শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সুসান ডেল ও মাইকেল ডেল

প্রযুক্তি ও দানশীলতার সমন্বয়ে এক অনন্য উদাহরণ সুসান ও মাইকেল ডেল। তাঁদের সাম্প্রতিক উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে। তাঁরা আমেরিকার নিম্ন আয়ের পরিবারের ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৫০ ডলার করে দিচ্ছেন, যা একটি ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ করা থাকবে। করোনাকালে ল্যাপটপ বিতরণের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার পর এখন তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার পথে কাজ করছেন।

সি সি ওয়ে ও লিপ বু তান (বাঁ থেকে)

এআই বিপ্লবের নেপথ্য কারিগর সি সি ওয়ে ও লিপ বু তান

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলোর একটি হলো টিএসএমসি। আর এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন এক বিনয়ী ও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল মানুষ সি সি ওয়ে। গত দুই দশকে তিনি চিপ উৎপাদনশিল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ে আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সুপারকম্পিউটার—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। সি সি ওয়ের নেতৃত্বে টিএসএমসি সাধারণ চিপ নির্মাতা থেকে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে তালিকায় থাকা ইন্টেলের লিপ বু তানের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সাল লিপ-বু তানের জন্য ছিল একটি রোলারকোস্টার সফরের মতো। ভেনচার ক্যাপিটাল ফার্ম ওয়াল্ডেন ইন্টারন্যাশনালর প্রতিষ্ঠাতা লিপ-বু তান যখন ইন্টেলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

সূত্র: টাইম