রোমান্স স্ক্যাম কী, কীভাবে চিনবেন ও নিরাপদ থাকবেন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, নিয়মিত বার্তা বিনিময়, অল্প সময়েই গভীর আবেগের সম্পর্ক, তারপর হঠাৎ জরুরি প্রয়োজনে অর্থ চাওয়া। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতারণাই ‘রোমান্স স্ক্যাম’ বা প্রেমের ফাঁদে প্রতারণা নামে পরিচিত। অনলাইন যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বব’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বব নিজেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত এক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। কয়েক সপ্তাহের কথোপকথনে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে বব যুক্তরাষ্ট্রে এসে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর তিনি জানান, ব্যাংক কার্ডে সমস্যার কারণে বিমানের টিকিটের অর্থ তুলতে পারছেন না। ভ্রমণ ব্যয় ও অন্যান্য খরচের কথা বলে অর্থসহায়তা চান। বিশ্বাসের সম্পর্কের কারণে ভুক্তভোগী অর্থ পাঠান। কিন্তু এরপর একের পর এক নতুন অজুহাতে আরও অর্থ দাবি করা হতে থাকে। সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে এবং অর্থ পাঠানো বন্ধ হলে প্রতারকও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তখনই স্পষ্ট হয়, এটি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা সুরক্ষা সংস্থা ফেডারেল ট্রেড কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রোমান্স স্ক্যামের মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ এবং সীমান্ত পেরিয়ে অনলাইন যোগাযোগের সহজলভ্যতা প্রতারকদের কাজকে আরও সহজ করে তুলেছে।
২০২৫ সালে এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দুই মার্কিন সিনেটর অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান। বিশেষ করে ম্যাচ গ্রুপের প্রধান নির্বাহীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে একাধিক জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোমান্স স্ক্যাম মূলত আস্থা অর্জনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। প্রতারকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডেটিং অ্যাপে ভুয়া পরিচয়ে আকর্ষণীয় প্রোফাইল তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বার্তা আদান–প্রদানের মাধ্যমে তাঁরা আবেগগত নির্ভরতা তৈরি করেন। ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ককে গভীর করা হয়।
পরবর্তী ধাপে কোনো না কোনো জরুরি পরিস্থিতির কথা তুলে অর্থ দাবি করা হয়। কখনো চিকিৎসা ব্যয়, কখনো বিদেশে কর্মরত থাকার কারণে প্রশাসনিক জটিলতা, কখনো ভ্রমণ খরচ এমন নানা অজুহাত দেখানো হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ছবি বা ভিডিও আদান–প্রদানের পর সেগুলো প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটে।
রোমান্স স্ক্যামের মধ্যে মিলিটারি স্ক্যাম নামে পরিচিত একটি কৌশলে প্রতারকেরা নিজেদের সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। অয়েল রিগ স্ক্যামে তাঁরা বিদেশের অয়েল সেক্টরে কর্মরত বলে দাবি করেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রভাবশালী কারও ছদ্মবেশেও যোগাযোগ করা হয়। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রতারকেরা সরাসরি দেখা করা বা ভিডিও কলে কথা বলার অনুরোধ এড়িয়ে চলেন। দূরবর্তী অবস্থান, নিরাপত্তা বিধিনিষেধ বা প্রযুক্তিগত সমস্যার অজুহাতে তাঁরা মুখোমুখি যোগাযোগ থেকে সরে থাকেন। একাকী, বয়স্ক, সদ্য বিবাহবিচ্ছিন্ন বা জীবনসঙ্গী হারানো ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, অনলাইনে সক্রিয় যে কেউই এ ধরনের প্রতারণার শিকার হতে পারেন। আবেগগত চাহিদা পূরণ হলে অনেকেই সন্দেহজনক লক্ষণ উপেক্ষা করেন। ফলে আর্থিক ক্ষতি বড় আকার ধারণ না করা পর্যন্ত প্রতারণা ধরা পড়ে না।
প্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে পরিচিত কারও প্রতি দ্রুত আস্থা স্থাপন করা ঝুঁকিপূর্ণ। যাঁর সঙ্গে কখনো সরাসরি দেখা হয়নি, তাঁকে অর্থ পাঠানো উচিত নয়। ব্যাংক হিসাব নম্বর, ক্রেডিট কার্ড তথ্য বা জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারসহ কিছু প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারী ভেরিফিকেশনের সুবিধা রয়েছে। তবে ভেরিফিকেশনের সুবিধা থাকলেও সতর্ক থাকা জরুরি। সন্দেহ হলে প্রোফাইল ছবির রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা যেতে পারে, ছবিটি অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয়েছে কি না। কেউ যদি ভিডিও কলে কথা বলতে অনীহা দেখান, সরাসরি দেখা করার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান বা বারবার জরুরি অর্থের অনুরোধ জানান, তাহলে সেটিকে সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কেউ সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বলে দাবি করলে তাঁর দায়িত্ব, ইউনিট বা অন্যান্য নির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়া যেতে পারে। একইভাবে পরিচিত কারও পরিচয়ে সন্দেহজনক বার্তা পেলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ। ইতিমধ্যে অর্থ পাঠানো হয়ে থাকলে দ্রুত ব্যাংক ও কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
সূত্র: ম্যাশেবল