জেমিনাইয়ের পরামর্শে পাহাড়ে গিয়ে বিপদে তিন তরুণ, রাত কাটাতে হলো গিরিখাতে
গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট জেমিনাইয়ের পরামর্শ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট শাস্তায় পর্বতারোহণে গিয়েছিলেন তিন তরুণ। আট ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও জেমিনাইয়ের দেওয়া পরামর্শের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁদের রাত কাটাতে হয়েছে দুর্গম একটি গিরিখাতে। পথ হারিয়ে একজন আহতও হন। পরে উদ্ধারকর্মীরা তিনজনকেই নিরাপদে উদ্ধার করেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার রোজভিলের বাসিন্দা ওই তিন তরুণই ছিলেন অনভিজ্ঞ পর্বতারোহী।
অভিযানের প্রস্তুতি নিতে তাঁরা ইউটিউব ও অলট্রেইলস অ্যাপের পাশাপাশি গুগলের এআই চ্যাটবট জেমিনাইয়ের সহায়তা নেন। কোন পথে চূড়ায় উঠবেন, কত সময় লাগতে পারে এবং সঙ্গে কতটা খাবার ও পানি নেওয়া প্রয়োজন, এসব বিষয়েও তাঁরা জেমিনাইয়ের পরামর্শ নিয়েছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট (শনিবার) ৮ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় তাঁরা বেজক্যাম্প স্থাপন করেন। পরদিন রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ হাজার ১৭৯ ফুট উঁচু চূড়ায় উঠে আবার বেজক্যাম্পে ফিরে আসা।
তবে মাউন্ট শাস্তায় পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তানীতি তাঁরা অনুসরণ করেননি। স্থানীয় লোকজন পরামর্শ দেন, দুপুর ১২টার মধ্যে চূড়ায় পৌঁছাতে না পারলে ফিরে আসতে হবে। এতে দিনের আলো থাকতে পাহাড় থেকে নিরাপদে নেমে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু ওই তিন তরুণ জেমিনাইয়ের পরামর্শ মেনে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাঁরা চূড়ায় পৌঁছান। নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত ঘণ্টা পর চূড়ায় পৌঁছানোর কারণে ফেরার পুরো পথ তাঁদের অন্ধকারে পাড়ি দিতে হয়েছে।
চূড়া থেকে নামার প্রায় এক ঘণ্টা পর তিন তরুণ এক পর্যায়ে মূল পথ থেকে সরে গিয়ে মাড ক্রিক ক্যানিয়নে ঢুকে পড়েন। তাঁদের যে পথে নামার কথা ছিল, তার তুলনায় এলাকাটি ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। প্রায় ১১ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় তাঁদের একজন পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পান। পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়লে রাত ১২টার দিকে তাঁরা গিরিখাতেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পাহাড়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রাত কাটানোর মতো প্রস্তুতি তাঁদের ছিল না। সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছিল না। ছিল না প্রয়োজনীয় গরম পোশাক বা আশ্রয়ের ব্যবস্থাও। পরদিন সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করেন।
পাহাড়ের ওপর দুর্গম স্থানে থাকায় হেলিকপ্টারে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে হেঁটেই নিচে নামতে হয় তিন তরুণকে। বেলা তিনটার দিকে তাঁরা বেজক্যাম্পে পৌঁছান। এরপর সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দলের সহায়তায় ট্রেইলহেডের দিকে রওনা হন। শেষ পর্যন্ত তিনজনই নিরাপদে পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসেন।
উদ্ধারের পর নিজেদের ভুল স্বীকার করেন ওই তিন তরুণ। তাঁরা জানান, নিজেদের বিচার-বুদ্ধির পরিবর্তে তাঁরা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন। সিসকিয়ু কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, খাবার ও পানির পরিমাণ নির্ধারণে এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া ছিল তাঁদের অন্যতম বড় ভুল। আট ঘণ্টার অভিযানের হিসাব ধরে তাঁরা খাবার ও পানি সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযান পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলায় সেই পরিমাণ যথেষ্ট হয়নি। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, শুধু জেমিনাইয়ের ভুল পরামর্শের কারণেই তিন তরুণ বিপদে পড়েননি। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া, অন্ধকারে পাহাড় থেকে নামা, পথ নির্দেশের প্রধান ব্যবস্থা হারিয়ে ফেলা, মূল পথ থেকে সরে যাওয়া এবং পাহাড়ে রাত কাটানোর মতো প্রস্তুতি না থাকা সবকিছু মিলেই তাঁদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের প্রধান পর্বতারোহণবিষয়ক উদ্ধারকর্মী এবং মাউন্ট শাস্তা অ্যাভালাঞ্চ সেন্টারের পরিচালক নিক মেয়ার্স বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছর মাউন্ট শাস্তায় এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করে অভিযানের পরিকল্পনা করার পর একাধিক পর্বতারোহী ও ক্যাম্পার পথ হারিয়েছেন বা বিভ্রান্ত হয়েছেন। শুধু এআই চ্যাটবটের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
সূত্র: নিউজ১৮