এআই ব্যবহারে কাজ কমছে না, বরং চাপ বাড়ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি কর্মজীবনকে সহজ করে তুলবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল অনেকের। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক কর্মীর ক্ষেত্রে এর প্রভাব উল্টো হচ্ছে। কাজ দ্রুত শেষ করার সুযোগ তৈরি হলেও অনেকের মতে, এতে কাজের চাপ কমার বদলে বেড়েই চলেছে।
যুক্তরাজ্যে দুই হাজার প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজন কর্মীর একজনের মতে চ্যাটজিপিটির মতো এআইভিত্তিক টুল ব্যবহারের ফলে তাঁদের কাজের চাপ বেড়েছে। অনেকের ধারণা, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশা বেড়েছে এবং কর্মীদের কাছ থেকে আগের তুলনায় বেশি কাজ আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিমা প্রতিষ্ঠান ইউলাইফের উদ্যোগে এবং জরিপ সংস্থা ইউগভের পরিচালনায় করা এ জরিপে দেখা গেছে, এআই ধীরে ধীরে হোয়াইট কলার কাজের ধরনে পরিবর্তন আনছে। তবে সেই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এক–তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের মধ্যে এআই প্রযুক্তির কারণে তাঁদের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তাঁদের রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, জরিপের ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
অন্যদিকে যাঁরা নিয়মিত এআই টুল ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে ২৩ শতাংশ জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তির কারণে তাঁদের কাজের পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে ২৬ শতাংশের মতে, এআই ব্যবহারের ফলে তাঁদের ওপর কাজের চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি তিনজনের একজন অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ মনে করেন, এই বাড়তি আয়ের সুফল কর্মীদের কল্যাণ বা দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীরা অনেক কাজ দ্রুত শেষ করতে পারছেন; কিন্তু এর ফলে কাজের গতি ও প্রত্যাশা দুটিই বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এতে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফাবিয়ান স্টেফানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ‘একধরনের বিদ্রূপাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এআইয়ের সহায়তায় আমরা দ্রুত কাজ শেষ করতে পারছি, কিন্তু সে কারণেই অনেক ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।’ অতিরিক্ত কাজের চাপে মানসিক অবসাদ বা ‘বার্নআউট’ সমস্যায় ভোগা কর্মীদের নিয়ে কাজ করা ক্যারিয়ার কোচ কেলি সুইংলারও একই প্রবণতার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, অনেকের ক্ষেত্রে এআই কাজ সহজ করার বদলে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভেবেছিলেন এআই তাঁদের কাজ সহজ করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে অনেকের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটছে। কর্মীদের কাছ থেকে এখন আরও বেশি কাজ, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং সব সময় প্রস্তুত থাকার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীদের কাজের ধরনে কী পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের কারণে অনেক কর্মীকেই আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় এবং আরও তীব্রভাবে কাজ করতে হচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, অনেক কাজ এখন তুলনামূলক দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে বা কিছু কাজ এআই দিয়ে করানো যাচ্ছে। ফলে কর্মীরা অবশিষ্ট সময় নতুন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন এবং আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত দায়িত্ব নিচ্ছেন। ইউলাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টাল গিলবার্ট বলেন, ‘আমরা কাজের ধরনে একধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এআই আমাদের কাজের পদ্ধতি বদলে দেওয়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
তবে গিলবার্টের মতে, এর সঙ্গে একটি ‘এআই উৎপাদনশীলতা বৈপরীত্য’ও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি সময় বাঁচানোর জন্য তৈরি, সেটিই কখনো কখনো কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র: ডেইলি মেইল