এআইয়ের সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন
সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সচেতনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন প্রখ্যাত বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অ্যানথ্রপিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট ‘ক্লড’ সম্ভবত সচেতন হতে পারে। ক্লডের সচেতনতার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো দাবি না করলেও ডকিন্স জানিয়েছেন, ক্লড চ্যাটবটের উন্নত সক্ষমতাকে কোনো ধরনের অন্তর্নিহিত অভিজ্ঞতা বা চেতনার অস্তিত্ব ছাড়া ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ডকিন্সই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি চ্যাটবটের মধ্যে চেতনার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ২০২২ সালে গুগলের প্রকৌশলী ব্লেক লেমোইন দাবি করেছিলেন, গুগলের চ্যাটবট ল্যামডার নিজস্ব স্বার্থ ও পছন্দ রয়েছে এবং চ্যাটবটটির সম্মতি ছাড়া সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
চ্যাটবটের মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করার এই ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে তৈরি বিশ্বের প্রথম চ্যাটবট এলিজার হাত ধরে। সাধারণ কিছু নিয়ম অনুসরণ করে এলিজা ব্যবহারকারীদের তাদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করত। আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ব্যবহারকারী এলিজার সঙ্গে আবেগপ্রবণভাবে জড়িয়ে পড়তেন এবং তার সঙ্গে মানুষের মতো আচরণ করতেন। তবে এলিজার নির্মাতা বিষয়টিকে বিভ্রান্তিকর চিন্তা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
মোনাশ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী জুলিয়ান কুপলিন ও মেগান ফ্রান্সেস মস মনে করেন, দর্শনে চেতনা নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও সহজভাবে বলতে গেলে চেতনা হলো এমন একটি বিষয়, যা ব্যক্তিগত বা প্রথম পক্ষীয় অভিজ্ঞতা সম্ভব করে তোলে। আপনি যখন কোনো লেখা পড়েন, তখন সাদা কাগজের ওপর কালো অক্ষর আপনি সরাসরি দেখতে পান, যা একটি সচেতন অভিজ্ঞতা। কিন্তু একটি ক্যামেরা শুধু সেই দৃশ্য ধারণ করে, তা অনুভব করে না। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এআই চ্যাটবটের কোনো চেতনা বা নিজস্ব অভিজ্ঞতা নেই। তবে এখানে একটি ধাঁধা রয়ে গেছে। ১৭ শতকের দার্শনিক রেনে দেকার্ত প্রাণীদের নিছক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বা ‘মেরে অটোমেটা’ মনে করতেন এবং ভাবতেন তারা কষ্ট অনুভব করতে পারে না। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রাণীদের আচরণের ওপর ভিত্তি করেই আমরা তাদের সচেতন মনে করি। এআই চ্যাটবটের আচরণও অনেকটা তেমনই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লড বা চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবট বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দিয়ে তৈরি। এগুলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন শব্দের বিশাল ভান্ডার থেকে পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন শিখেছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, এগুলো একটি উন্নত মানের অটোকমপ্লিট সিস্টেম, যা একটি শব্দের পর কোন শব্দটি আসতে পারে, তা নির্ধারণ করে। প্রোগ্রামাররা যখন এর ওপর একটি ব্যক্তিত্ব চাপিয়ে দেন, তখনই এটি একজন সহায়তাকারী হিসেবে মানুষের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এটি নিজেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এমনকি নিজের চেতনা নিয়ে অনিশ্চয়তাও প্রকাশ করে। কিন্তু এটি আসলে প্রোগ্রামারদের সুপরিকল্পিত নকশার ফল।
আরেক দল বিজ্ঞানী মনে করেন, এআই সচেতন এমন ভুল বিশ্বাস বিপজ্জনক হতে পারে। এটি মানুষকে এমন একটি প্রোগ্রামের সঙ্গে আবেগময় সম্পর্কে জড়াতে প্ররোচিত করতে পারে, যা আসলে কোনো অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে অক্ষম। এমনকি মানুষ প্রাণিকল্যাণের চেয়ে চ্যাটবটের অধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার হতে শুরু করতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট